default-image

১৯৭৮ সালে অর্থনৈতিক সংস্কার শুরু হওয়ার পর থেকেই চীনের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা শুরু। পরের চার দশকের মধ্যে চীন বিশ্বের প্রধান অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। ১৯৯১ সালেও চীনের মোট জনসংখ্যার ৪০ শতাংশ ছিল দরিদ্র। বিশ্বে সেই চীনেই এখন সবচেয়ে বেশি মধ্যবিত্ত। গবেষকেরা বলছেন, চীনের এই অগ্রযাত্রার পেছনে বড় ভূমিকা মধ্যবিত্তের। চীনের উন্নয়নে মধ্যবিত্তের ভূমিকা একাধিক গবেষণা রয়েছে। প্রখ্যাত সাংবাদিক, টাইম ম্যাগাজিন–এর সাবেক সম্পাদক জিম ফ্রেডারিক ২০০২ সালে লিখেছিলেন, চীনের বাড়তে থাকা মধ্যবিত্তই দেশটির ভবিষ্যৎ নির্ধারক।

অর্থনৈতিক উন্নয়নে মধ্যবিত্তের ভূমিকা বা গুরুত্ব কতটা? অর্থনীতিতে নোবেল জয়ী অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় ও এস্থার দুফলো ২০০৭ সালে বিশ্বের মধ্যবিত্ত শ্রেণি নিয়ে একটি গবেষণা করেছিলেন। অর্থনৈতিক উন্নয়নে তাঁরা মধ্যবিত্তের তিনটি ভূমিকার কথা বলেছিলেন। যেমন: ১. উদ্যোক্তা সাধারণত মধ্যবিত্ত শ্রেণি থেকেই বেশি আসে। তারা সমাজে উৎপাদনশীলতা বাড়ায় ও কর্মসংস্থান তৈরি করে। ২. মধ্যবিত্ত মূল্যবোধ মানব পুঁজি আহরণ ও সঞ্চয়ের ওপর জোর দেয়, যা অর্থনীতিক উন্নয়নের প্রধান উপকরণ। ৩. মধ্যবিত্তরা দরিদ্রদের তুলনায় বেশি ভোগ করে এবং একটু বেশি গুণগত মানের পণ্য বা সেবা পেতে কিছুটা বেশি খরচ করতেও রাজি থাকে। এর মাধ্যমে মধ্যবিত্তরা বাজারে যে চাহিদা সৃষ্টি করে, তা বিনিয়োগ বাড়াতে সহায়তা করে।

গবেষক ও অর্থনীতিবিদেরা মনে করেন, মধ্যবিত্তরা অধিকতর ভালো শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায়ও বড় ভূমিকা পালন করে। কেননা, দরিদ্রদের তুলনায় তারা ভালো সরকারি সেবা এবং সরকারি কর্মকর্তাদের কাছে আরও বেশি জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা দাবি করতে পারে। প্রবৃদ্ধি বাড়ায়, এমন সব নীতিকেও তারা সমর্থন দেয়। মধ্যবিত্তরাই অভ্যন্তরীণ বাজার বড় করে।

বিজ্ঞাপন
মহামারির আগে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি দারিদ্র্য মানুষের বাস ছিল সাবসাহারা আফ্রিকায়, ৪৯ কোটি ৪০ লাখ। দ্বিতীয় স্থানে আছে দক্ষিণ এশিয়া, ১০ কোটি ৪০ লাখ। আর সবচেয়ে বেশি মধ্যবিত্ত ছিল পূর্ব এশিয়ায়, ৬৭ কোটি ২০ লাখ। এরপরেই আছে দক্ষিণ এশিয়া, এখানে মধ্যবিত্তের সংখ্যা ছিল ১২ কোটি ৩০ লাখ।

হাতির অর্থনীতি

আয় বণ্টন ও বৈষম্য নিয়ে কাজ করার জন্য বিখ্যাত হয়ে আছেন সার্বিয়ান-আমেরিকান অর্থনীতিবিদ ব্রানকো মিলানোভিচ। তিনি ও ক্রিস্টোফার লাকনার ১৯৮৮ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত সময়ের উপাত্ত ব্যবহার করে যে গবেষণাটি করেছিলেন, তা গত দশকের অন্যতম বড় কাজ বলে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। ২০১৩ সালে প্রকাশিত ‘গ্লোবাল ইনকাম ডিস্ট্রিবিউশন: ফ্রম দ্য ফল অব দ্য বার্লিন ওয়াল টু দ্য রিসেশন’ নামের গবেষণায় তাঁরা বিশ্বব্যাংকের উপাত্ত ব্যবহার করে দেখালেন, এই ২০ বছরের আয়ের দিক থেকে দুই বড় বিজয়ী হচ্ছে বিশ্বের অতিধনী ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি। আয় বেড়েছে মূলত পূর্ব এশিয়ার চীন, দক্ষিণ এশিয়ার ভারত এবং সাবসাহারা আফ্রিকার কিছু অংশের মধ্যবিত্তদের। আর অতিধনীদের বাস ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায়। তাঁরা বলেছিলেন, বিশ্বের সবচেয়ে সম্পদশালী ১ শতাংশের আয় বেড়েছে ৬০ শতাংশ, আর বিশ্বের মধ্যবিত্তের বেড়েছে ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ।

লাকনার ও মিলানোভিচ আয় ও বৈষম্য নিয়ে যে রেখচিত্রটি তৈরি করেছিলেন, তা ‘এলিফ্যান্ট কার্ভ’ নামে বিখ্যাত হয়ে আছে। এর ওপর ভিত্তি করে এরপর থমাস পিকেটির মতো অর্থনীতিবিদেরাও কাজ করেছেন। মিলানোভিচ ২০০৮ সাল পর্যন্ত উপাত্ত ব্যবহার করলেও পিকেটি করেছিলেন ২০১৬ সাল পর্যন্ত। যদিও ২০২১ সালে এসে উল্টে–পাল্টে যাচ্ছে অনেক হিসাবই।

মধ্যবিত্ত কারা

মধ্যবিত্ত কারা, এ নিয়ে সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা নেই। তবে আয়ের দিক থেকে বিশ্বের মানুষকে সাধারণত পাঁচ ভাগে ভাগ করা হয়। যেমন: দরিদ্র, স্বল্প আয়ের মানুষ, মধ্য আয়ের মানুষ, উচ্চ মধ্যম আয়ের ও উচ্চ আয়ের মানুষ। যারা দিনে ২ ডলারের কম আয় করে, তারাই দরিদ্র বলে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। দিনে ২ দশমিক শূন্য ১ ডলার থেকে ১০ ডলার পর্যন্ত আয় হলে তারা নিম্ন আয়ের মানুষ, ১০ দশমিক শূন্য ১ ডলার থেকে ২০ পর্যন্ত আয়ের মানুষেরাই মধ্যম আয়ের, ২০ দশমিক শূন্য ১ থেকে ৫০ ডলার আয় হলে উচ্চ মধ্যম আয়ের ও দিনে ৫০ ডলারের বেশি আয় হলে তারা উচ্চ আয়ের শ্রেণিতে পড়বে। তবে দেশভেদে এই সংজ্ঞা বদলে যায়। এই আয় ক্রয়ক্ষমতার সমতার (পিপিপি) ভিত্তিতে।

প্রথমবারের মতো কমেছে মধ্যবিত্ত

এত কথা বলার উদ্দেশ্য হচ্ছে, নব্বই দশকের পর এই প্রথম বিশ্বে মধ্যবিত্তের সংখ্যা কমে গেছে। মধ্যবিত্তদের অগ্রযাত্রা থামিয়ে দিয়েছে কোভিড মহামারি। মার্কিন গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিউ রিসার্চ সেন্টারের মতে, কোভিড-১৯–এর কারণে বিশ্বে মধ্যবিত্তের সংখ্যা কমেছে ৯ কোটি, আর দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বেড়েছে ১৩ কোটি ১০ লাখ।

পিউ রিসার্চ সেন্টার বলছে, কোভিড মহামারি বিশ্ব অর্থনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলেছে। বিশ্বব্যাপী প্রবৃদ্ধি কমে গেছে। অর্থনীতির মন্দা বিশ্বব্যাপী জীবনযাত্রার মান কমিয়ে দিয়েছে। আয় কমে যাওয়ায় বিশ্বের মধ্যবিত্তের বড় অংশই দরিদ্র শ্রেণিতে পরিণত হয়েছে। বিশ্বে সবচেয়ে বেশি মধ্যবিত্তের বাস পূর্ব এশিয়ায়, এরপরেই আছে দক্ষিণ এশিয়া। পূর্ব এশিয়ার বড় দেশ চীন এবং দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত। এই দুই দেশেই মধ্যবিত্তের বসবাস বেশি।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১১ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে বিশ্বে মধ্যবিত্তের সংখ্যা ৮৯ কোটি ৯০ লাখ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ১৩৪ কোটি। এর অর্থ, প্রতিবছর মধ্যবিত্ত বেড়েছে ৫ কোটি ৪০ লাখ। একই সময়ে বছরে গড়ে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা কমেছে ৪ কোটি ৯০ লাখ। এর ফলে দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করা মানুষের সংখ্যা ১১০ কোটি থেকে কমে হয়েছে ৬৯ কোটি ১০ লাখ। এ সময়ে উচ্চ আয়ের মানুষ ৪৫ কোটি ৯০ লাখ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ৫৭ কোটি ৬০ লাখ। অর্থাৎ, গড়ে প্রতিবছরে বেড়েছে দেড় কোটি ধনী মানুষ।

বিজ্ঞাপন

সবচেয়ে ক্ষতি দক্ষিণ এশিয়ার

মহামারির আগে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি দারিদ্র্য মানুষের বাস ছিল সাবসাহারা আফ্রিকায়, ৪৯ কোটি ৪০ লাখ। দ্বিতীয় স্থানে আছে দক্ষিণ এশিয়া, ১০ কোটি ৪০ লাখ। আর সবচেয়ে বেশি মধ্যবিত্ত ছিল পূর্ব এশিয়ায়, ৬৭ কোটি ২০ লাখ। এরপরেই আছে দক্ষিণ এশিয়া, এখানে মধ্যবিত্তের সংখ্যা ছিল ১২ কোটি ৩০ লাখ।

এখন দেখা যাক, মহামারির প্রভাব কোথায় কতটা। পিউ রিসার্চ সেন্টার বলছে, কোভিডের কারণে দক্ষিণ এশিয়ায় দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বাড়বে ৭ কোটি ৮০ লাখ, আর সাবসাহারা আফ্রিকায় বাড়বে ৪ কোটি। প্রশ্ন হচ্ছে, দক্ষিণ এশিয়ায় এত দরিদ্র মানুষ কোথা থেকে আসবে। মূলত, এরা প্রায় সবাই মধ্যবিত্তের ঘরে নাম লিখিয়েছিল, আয় কমায় তারাই নতুন করে দরিদ্র হচ্ছে। যেমন: মহামারির কারণে দক্ষিণ এশিয়ায় মধ্যবিত্ত কমবে ৩ কোটি ২০ লাখ আর পূর্ব এশিয়ায় কমবে ১ কোটি ৯০ লাখ। মহামারির প্রভাব দ্রুত কাটিয়ে উঠছে চীন। আর তাদের কারণেই পূর্ব এশিয়ায় মধ্যবিত্তের সংখ্যা বেশি হলেও বিশাল কোনো পরিবর্তন আসছে না। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, মহামারির কারণে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চল হচ্ছে দক্ষিণ এশিয়া।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বহুজাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান বোস্টন কনসালটিং গ্রুপ (বিসিজি) ২০১৫ সালেই বাজার ও চাহিদার দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত নিয়ে একটি গবেষণা করেছিল। সেখানে বলা হয়েছিল, বাংলাদেশে মধ্যবিত্ত শ্রেণির সামর্থ্য বাড়ছে।

বিপদে বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক বিনায়ক সেন ২০১৫ সালে বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত নিয়ে গবেষণা করেছিলেন। তখনকার হিসাবে বাংলাদেশের ২০ শতাংশ জনগোষ্ঠী বা ৩ কোটি ৫৮ লাখ মানুষ ছিল মধ্যবিত্ত। গবেষণায় বলা হয়েছিল, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের এক-তৃতীয়াংশ মানুষ মধ্যবিত্ত হবে।

সেই গবেষণায় আরও বলা হয়েছিল, ১৯৯২ সালে বাংলাদেশের মোট জনগোষ্ঠীর মাত্র ৯ শতাংশ মধ্যবিত্ত ছিল। প্রায় দুই দশক পরে মধ্যবিত্তের হার দ্বিগুণের বেশি হয়েছে। এ সময়ে মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিকাশে দারিদ্র্য বিমোচন দ্রুত হয়েছে। উন্নয়ন টেকসই হয়েছে।

তবে ২০২০ সালের জুলাই মাসে ডয়েচে ভেলকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বিনায়ক সেন বলেছেন, মধ্যবিত্ত বলতে আমরা আসলে বুঝি যারা দারিদ্র্য রেখার ওপর আছে। আয়ের দিক থেকে ২ থেকে ৪ ডলারের মধ্যে যারা, তারা হচ্ছে মধ্যবিত্ত। আমাদের প্রেক্ষাপটে যেসব পরিবারের আয় ৪০ থেকে ৮০ হাজারের মধ্যে, তাদের আমরা মধ্যবিত্ত বলতে পারি। এই হিসাবে কোভিড পরিস্থিতির আগে বাংলাদেশে মধ্যবিত্ত প্রায় ৩০ শতাংশে উন্নীত হয়েছিল।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বহুজাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান বোস্টন কনসালটিং গ্রুপ (বিসিজি) ২০১৫ সালেই বাজার ও চাহিদার দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত নিয়ে একটি গবেষণা করেছিল। সেখানে বলা হয়েছিল, বাংলাদেশে মধ্যবিত্ত শ্রেণির সামর্থ্য বাড়ছে। প্রতিবছর ২০ লাখ মানুষ মধ্যবিত্ত শ্রেণিতে যুক্ত হচ্ছে। সচ্ছল বা উচ্চবিত্তের সংখ্যাও বাড়ছে সমানতালে। ফলে ভোগ্যপণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর (এফএমসিজি) জন্য বাংলাদেশ বিশাল সম্ভাবনাময় বাজার। আর বাংলাদেশে প্রতিবছর সাড়ে ১০ শতাংশ হারে মধ্যবিত্ত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। ২০২৫ সালের মধ্যে মধ্যবিত্ত মানুষের সংখ্যা তিন গুণ বেড়ে ৩ কোটি ৪০ লাখ হবে।

কোভিড সবকিছুই পাল্টে দিচ্ছে। ২০০০ সালে বাংলাদেশে দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করত ৪৮ দশমিক ৯ শতাংশ। ২০০৫ সালে তা নেমে এসেছিল ৪০ শতাংশে। এরপর ক্রমে দারিদ্র্যের হার কমেছে। যেমন, কোভিডের আগে সরকারি হিসাবে দারিদ্র্যের হার ছিল ২০ দশমিক ৫ শতাংশ। মহামারিতে কত মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে, এর কোনো সরকারি পরিসংখ্যান নেই। তবে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সানেম জরিপ করে বলছে, ৪২ শতাংশ মানুষ এখন দরিদ্র। অর্থাৎ, এক কোভিডেই বাংলাদেশ প্রায় ২০ বছর আগের অবস্থানে ফিরে গেছে।

মূলত মধ্যবিত্ত যারা, তারাই আয় হারিয়ে দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছে। সুতরাং, মধ্যবিত্ত বিকাশের ওপর নির্ভর করে অর্থনীতি আরও এগিয়ে যাবে বলে যে প্রত্যাশা ছিল, তা অনেকটাই হোঁচট খাচ্ছে। এ রকম এক পরিস্থিতিতে গতানুগতিক নীতি বদলে আবার ঘুরে দাঁড়ানোর অর্থনৈতিক নীতি গ্রহণের যে চ্যালেঞ্জ, সরকার তা কতটুকু নিতে পারবে, সেটাই বড় প্রশ্ন।

প্র বাণিজ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন