default-image

চূড়ান্ত স্বাধীনতা বলতে সম্ভবত কিছু নেই। এই পৃথিবীতে কোনোকালে কেউ–বা কোনো প্রতিষ্ঠান চূড়ান্ত অর্থে স্বাধীন ছিল না। সে জন্য নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ জোসেফ স্টিগলিৎস মনে করেন, কেন্দ্রীয় স্বাধীনতার প্রসঙ্গটি সব সময় বাড়িয়ে বলা হয়। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংককেও কারও না কারও কাছে জবাবদিহি করতে হয়। গভর্নরকেও তা করতে হয়। তবে প্রশ্ন হচ্ছে, এই জবাবদিহি কার কাছে।

বিশ্বব্যাপী কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা সাধারণত দুভাবে মূল্যায়ন করা হয়—নীতি গ্রহণের স্বাধীনতা ও পরিচালনার স্বাধীনতা। অর্থাৎ কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্বাধীনভাবে মুদ্রানীতি তৈরি করতে পারে কি না এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে ব্যাংক খাত তদারক করতে পারে কি না, তার ভিত্তিতে। ১৯৯৪ সালে আইএমএফের এক গবেষণায় দেখা যায়, কেন্দ্রীয় ব্যাংক যত বেশি স্বাধীন, মূল্যস্ফীতির চাপ কমাতে তার সফলতাও তত বেশি।
যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ অবশ্য এর সঙ্গে বাড়তি আরেকটি লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে। আর সেটি হলো কর্মসংস্থান বৃদ্ধি। মূলত মূল্যস্তর স্থিতিশীল রাখা এবং বিনিয়োগের মাধ্যমে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করা গেলে সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি স্বস্তিতে থাকে বলে অর্থনীতিবিদেরা মনে করেন। এ কারণেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো এ লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে।

এদিকে স্বাধীনতার প্রসঙ্গে জোসেফ স্টিগলিৎস চীনের উদাহরণ টানেন। বিভিন্ন সময় তিনি বলেছেন, চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক মোটেও স্বাধীন নয়। সে তুলনায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপের কেন্দ্রীয় ব্যাংক অনেকটাই স্বাধীন। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, চীনা কেন্দ্রীয় ব্যাংক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দিক থেকে এদের তুলনায় অনেক সফল। এমনকি মহামারির মধ্যে গত বছর বড় অর্থনীতিগুলোর মধ্যে চীনই কেবল প্রবৃদ্ধির মুখ দেখেছে।

বিজ্ঞাপন

মহামারির বছর বাদ দিলেও সামগ্রিকভাবে চীনা কেন্দ্রীয় ব্যাংক ৩০ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর তুলনায় অনেক সফল। তবে এখান থেকে এই সিদ্ধান্তেও পৌঁছানো যাবে না যে স্বাধীনতা কম থাকাটাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য ভালো।
রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার সাবেক গভর্নর ড. চক্রবর্তী রঙ্গরাজন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতার প্রসঙ্গে ঢাকায় এক বক্তৃতায় বলেছিলেন, প্রায় সব দেশেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরকারের নিয়ন্ত্রণে কাজ করে। তবে অধিকাংশ সরকারই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতামতে গুরুত্ব দেয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতার পক্ষে জোরালো যুক্তি হলো আর্থিক স্থিতিশীলতা, যা আধুনিক দক্ষ অর্থনৈতিক ব্যবস্থার জন্য অত্যাবশ্যক। সেটা কেবল কিছু দক্ষ কেন্দ্রীয় ব্যাংকারদের দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি মুদ্রানীতি তৈরি ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে সম্ভব। তবে মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতি একমুখী না হলে ব্যাপারটা অর্থনীতির জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। তাই একটা অর্থনীতি কার্যকর রাখার জন্য সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মধ্যে গভীর সংলাপ ও সমন্বয় থাকা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।

জোসেফ স্টিগলিৎস সে জন্য বলেন, সমস্যাটা শেষ বিচারে যত না অর্থনৈতিক, তার চেয়ে বেশি রাজনৈতিক। বাংলাদেশের উদাহরণ দিয়েই বোঝা যাক, দেশে খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধারে সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকার শক্তিশালী না হওয়ায় এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সেই স্বাধীনতা না থাকায় পরিস্থিতির বিশেষ উন্নতি হয় না। তবে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর সরাসরি সরকারের অবস্থানের বিরুদ্ধাচরণ করেছেন বা তার বিপক্ষে দাঁড়িয়েছেন, তেমন নজির দেখা যায় না।

রঘুরাম রাজন মনে করেন, এটা রাজনীতির মানের ওপর নির্ভর করে। উন্নত দেশ ও উন্নয়নশীল দেশের মধ্যে এ ক্ষেত্রে ফারাক অনেক বেশি। এমনকি ভারতেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক গভর্নর সরকারের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ার পর দৃষ্টিকটুভাবে তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, তেমন নজির এখনো নেই। রঘুরাম রাজনের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। তিনি কংগ্রেস সমর্থক হিসেবে পরিচিত হওয়া সত্ত্বেও মেয়াদ শেষ হওয়া পর্যন্ত মোদি সরকার অপেক্ষা করেছে। আবার তার চেয়ে বড় উদাহরণ হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। সেখানে প্রতিষ্ঠান এত শক্তিশালী যে ট্রাম্পের জমানার শেষ দিকে ফেডের চেয়ারম্যান প্রকোশ্যে ট্রাম্পের নীতির সমালোচনা করার পাশাপাশি ট্রাম্পের নির্দেশনা অগ্রাহ্য করে গেছেন, কিন্তু তাতে ফেড চেয়ারম্যানকে পদ ছাড়তে হয়নি।

এদিকে প্রেসিডেন্টের মতের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করায় সম্প্রতি তুরস্কের কেন্দ্রীয় ব্যাংক গভর্নরকে বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে রঘুরাম রাজনের কথা মিলে যায়, রাজনীতির মান ও প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতার ওপর ব্যাপারটা নির্ভর করে।

ক্রিকেট খেলায় অধিনায়কত্ব করাটা নাকি ৯০ ভাগ ভাগ্যের ব্যাপার, বাকি ১০ ভাগ ব্যক্তিগত কৃতিত্ব। তবে ওই ১০ ভাগ না থাকলে ওই কাজটা করার চেষ্টা না করাই নাকি ভালো। এর সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর পদের শতভাগ তুলনা করা ঠিক হবে না। তবে এটা ঠিক, এ ধরনের পদে যাঁরা থাকবেন, তাঁদের মেরুদণ্ড যথেষ্ট শক্ত হওয়া দরকার, তা সে রাজনীতি ও প্রতিষ্ঠানের মান যা-ই হোক না কেন।

বিজ্ঞাপন
প্র বাণিজ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন