default-image

বলা যায় রাশিয়ান ধনকুবের সের্গেও পুগাচেভের প্রেমে পড়ে দেউলিয়া হয়েছেন ইংরেজ অভিজাত নারী আলেকজান্দ্রা টলস্টয়। যেন পুরো গল্পটায় একটা রূপকথা। রুশ সাহিত্যের কিংবদন্তি লিও তলস্তয়ের বংশধর আলেকজান্দ্রা। একটি অভিজাত বোর্ডিং স্কুলে পড়াশোনা শেষে লন্ডন শহরে ব্রোকারের চাকরি শুরু করেন। তবে কিছুদিনের মধ্যে চাকরি ছেড়ে ভ্রমণ ব্যবসায় নামেন আলেকজান্দ্রা। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন, তুর্কমেনিস্তান এবং কিরগিজস্তান যেতেন তিনি। এ এসময়ই একজন কস্যাক ঘোড়সওয়ারকে বিয়ে করেন। তবে বিয়েটা বেশি দিন টেকেনি।

তাঁরা যখন বিচ্ছেদের জন্য লড়ছেন তখনই আলেজান্দ্রার হৃদয়ে ঝড় তুলে এসেছিলেন সের্গেই। প্রথম দিনের সেই দেখার কথা জীবনেও ভুলবেন না আলেকজান্দ্রা। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, সের্গেইকে প্রথমে দেখেই যেন এক শিহরণ বয়ে গিয়েছিল তাঁর হৃদয়ে। এর আগে জীবনে কখনোই কারও জন্য এমন অনুভব হয়নি। অন্যদিকে আলেকজান্দ্রার কাছে ইংরেজি শিখতে এসে সের্গেই তাঁর প্রেমে পড়েন।

শুরু আলেকজান্দ্রার নতুন জীবন

সের্গেইর সঙ্গে আক্ষরিকভাবেই শুরুর সময়টা অসম্ভব সুখে কাটে আলেকজান্দ্রার। কী ছিল না তাদের? ব্যাটেরসিতে ১ কোটি ২০ লাখ পাউন্ডের বাড়ি, হার্টফোর্ডশায়ারে ২০০ একর জায়গার ওপর বাড়ি, ক্যারিবীয় অঞ্চলে সৈকতের সামনে ৪ কোটি পাউন্ডের ভিলা। যখন যা ইচ্ছা হতো তাই কিনতেন আলেকজান্দ্রা। সের্গেই ক্রেডিড কার্ড দিয়েই রেখেছিলেন তাঁকে। নিজস্ব জেট ছিল। কেবল ব্যাগ গুছিয়ে নিয়েই চলে যেতেন যেখানে মন চায়। সন্তানদের নিয়ে সুখের জীবন। তবে কথায় আছে না ভালো সময় যেন দ্রুত কেটে যায়। হঠাৎ করেই জীবনে কালো ছায়া নেমে আসে। গল্পের এ পর্যায়ে নতুন চরিত্রের আবির্ভাব ঘটে। তিনি হলেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন।

বিজ্ঞাপন
default-image

বন্ধু পুতিন যখন শত্রু

সম্পদের পাহাড় ছিল সের্গেইর কাছে। তাঁর হাতে একটি কয়লা খনি, শিপইয়ার্ডস, ডিজাইনার ব্র্যান্ড এবং রাশিয়ার অন্যতম বৃহত্তম বেসরকারি ব্যাংক মেঝপ্রমব্যাংকের মালিকানা ছিল। পুতিনের খুব কাছের লোক ছিলেন সের্গেই। এমনকি সব ছুটিতে পুতিনের সঙ্গে সঙ্গে থাকতেন তিনি। প্রয়োজনে সরকারকে ঋণ দিতেন। এ কারণে ‘পুতিনের ব্যাংকার’ নাম হয়ে যায় তাঁর। তবে বন্ধু পুতিন আলেকজান্দ্রার সঙ্গে সের্গেইয়ের সম্পর্কটা ঠিক পছন্দ করতে পারেননি। সের্গেইকে তিনি বলেন, ‘কেন? সে ইংরেজ। খুব অদ্ভুত। রাশিয়ায় ১৪ কোটি মানুষ রয়েছে। এটা পাগলের মতো কাজ হলো।’

২০০৬ সালে রাশিয়ায় একটি আইন পাস হয়। বিদেশে রাষ্ট্রের শত্রুদের হত্যার লাইসেন্স দেওয়া হয় রাশিয়ার গোয়েন্দাদের। তত দিনে রাশিয়ার দৃষ্টি সের্গেই পুগাচেভের সম্পদের দিকে পড়ে গেছে। এর মধ্যে ২০০৮ সালে আর্থিক সংকট আসতেই বিপদে পড়তে শুরু করেন সের্গেই পুগাচেভ৷

‘মস্কো টাইমস’ এক প্রতিবেদনে জানায়, মেঝপ্রমব্যাংকে দেওয়া সরকারি অর্থ সের্গেই অন্যত্র সরিয়ে ফেলায়, ব্যাংকটিতে ২০০ কোটি ডলারের ঘাটতি সৃষ্টি হয়েছে৷ ২০১০ সালে এই ব্যাংকের লাইসেন্স বাতিল হয় এবং সেটিকে দেউলিয়া ঘোষণা করা হয়৷ সের্গেই পুগাচেভ দাবি করেন, বছর কয়েক আগেই তিনি ব্যাংকটি বিক্রি করে দিয়েছেন, তবে রাশিয়া তাতে দ্বিমত পোষণ করে। আদালতে, সের্গেইকে ব্যাংকের ক্ষতির জন্য দায়বদ্ধ বলে প্রমাণিত করা হয়। তাৎক্ষণিকভাবে রাশিয়া থেকে পালিয়ে যান সের্গেই। লন্ডনে আশ্রয় নেন৷

২০১৪ সালের নভেম্বরে তিনি ইন্টারপোলের ‘ওয়ান্টেড’ তালিকাভুক্ত হন৷ রুশ প্রশাসনও তাঁকে এখন দেশে ফিরিয়ে এনে কাঠগড়ায় তুলতে বদ্ধপরিকর৷ গণমাধ্যমে একবার সের্গেই দাবি করেন, তাঁকে রাশিয়ার আমানত বীমা সংস্থা (ডিআইএ) দ্বারা হুমকি দেওয়া হয়েছিল। ডিআইএর বিলিয়ন ডলারের ব্যাংক লোন পরিশোধ করতে বলা হয়। পরে ডিআইএ সের্গেইকে একটি রেস্তোরাঁয় আমন্ত্রণ জানিয়ে বলে, ‘হয় আপনি ২৫ কোটি পাউন্ড দেবেন অথবা আমরা আপনাকে অথবা আপনার পরিবারের সদস্যদের হত্যা করব। আপনি চাইলে আমরা আপনার ছেলের আঙুল কেটে পাঠাতে পারি।’ ডিআইএ এই ঘটনাটি কখনো অস্বীকার করেছিল।

মোটামুটিভাবে ২০১৫ সালে রাশিয়া ফেরার সব পথ বন্ধ হয়ে যায় সের্গেইয়ের জন্য। সের্গেইকে পেতে ব্রিটিশ আদালতের শরণাপন্ন হয় রাশিয়া। বিশ্বব্যাপী সের্গেইয়ের সব সম্পতিই বাজেয়াপ্ত হয়। এমনকি পাসপোর্টও। বর্তমানে ফ্রান্সে পালিয়ে আছেন সের্গেই। অবশ্য রাশিয়ায় তাঁর হারানো সম্পদ ফিরে পেতে আইনি লড়াই চালিয়ে যেতে চান তিনি।

আলেকজান্দ্রার কোটিপতি জীবনের কষ্ট

জীবনটা এখন ভয়াবহ রকম অনিরাপদ বোধ করেন আলেকজান্দ্রা। সঙ্গী সের্গেইকে স্থায়ীভাবে পালিয়ে থাকতে হচ্ছে। সেই সঙ্গে সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়ে সব সময় একটা শঙ্কা। সব সময় অনুভব করেন কেউ যেন অনুসরণ করছেন তাঁদের। এমনকি যাঁর জন্য এই পরিস্থিতিতে পড়েছেন তাঁর সঙ্গেও সম্পর্ক ভালো নেই। ২০১৬ সালে সন্তানদের নিয়ে আলেকজান্দ্রাকে স্থায়ীভাবে ফ্রান্সে থাকার কথা বলেন সের্গেই। তবে তাতে রাজি হননি আলেকজান্দ্রা। তাঁদের সম্পর্কের চরম অবনতি হয়। ফ্রান্সে সের্গেইয়ের বাসা থেকে সন্তানদের নিয়ে চলে আসেন আলেকজান্দ্রা। তবে এমন জীবন চান না আলেকজান্দ্রা। তিনি বোঝেন পরিবারের সবার সঙ্গে মিলেমিশে নিরাপদে সুখে কাটানোর চেয়ে শান্তির আর কিছুই হতে পারে না। তাঁর এখনকার জীবনে নিশ্বাস নিতেও ভয় হয়।

বিজ্ঞাপন
default-image
সবকিছু হারিয়ে কেমন আছেন ধনকুবের সের্গেই। অবশ্য হাতি মরলেও লাখ টাকা। সের্গেইয়ের অবস্থা অনেকটা এ রকম।

কেমন আছেন সের্গেই

সবকিছু হারিয়ে কেমন আছেন ধনকুবের সের্গেই। অবশ্য হাতি মরলেও লাখ টাকা। সের্গেইয়ের অবস্থা অনেকটা এ রকম। ফ্রান্সের নিস শহরে নিজের দুর্গের মতো বাড়িতে এখন একা থাকেন সের্গেই। যদিও তিনি দাবি করেন, তাঁর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে এখন মাত্র ৭০ হাজার ২০০ ডলার আছে। যার জন্য মামলায় উকিল নিতে পারছেন না তিনি। তবে অনেকেই বলেন এখনো বহু দেশেই ছড়িয়ে–ছিটিয়ে আছে সের্গেইয়ের সম্পত্তি।
—বিবিসি অবলম্বনে

মন্তব্য করুন