default-image

যেখানে ঝুঁকি যত বেশি, সেখানে লাভও তত বেশি। এটি যেমন সত্যি, তেমনি একটু খোঁজখবর নিয়ে জেনেবুঝে বিনিয়োগ করলে ঝুঁকি কমিয়ে অধিক লাভের সুযোগ আছে শেয়ারবাজারে। যদিও শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকে সব সময় ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগ হিসেবে ধরা হয়। সেই বিবেচনায় শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ মানেই ঝুঁকি। বেশি মুনাফা চাইলে ঝুঁকি তো একটু নিতেই হবে। আপনি শেয়ারবাজারে কোন শেয়ারে বিনিয়োগ করছেন, তার ওপরও অনেকাংশে নির্ভর করে ঝুঁকির মাত্রা। যদি ভালো শেয়ারে, দীর্ঘ মেয়াদে বিনিয়োগ করেন, তাহলে ঝুঁকি কম। বাজার খারাপ হলে সাময়িকভাবে দাম হয়তো কমতে পারে, কিন্তু তাতে বিচলিত না হয়ে ধৈর্য ধরুন। ভালো কোম্পানিতে টাকা খাটিয়ে বছর শেষে আপনার ঠকার আশঙ্কা কম।

শেয়ারবাজারে নতুন বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগের জন্য বিও (বেনিফিশারি ওনার্স) হিসাব খোলার কাজটি করে ব্রোকারেজ হাউস। দেশের বেশ কিছু ব্রোকারেজ হাউসের শীর্ষ ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ব্যাংকের সুদহার কমে যাওয়া এবং করোনায় ব্যবসা–বাণিজ্যের মন্দাভাবের কারণে অনেকে ব্যাংকের আমানত তুলে শেয়ারবাজারে লগ্নি করছেন। আর সেই কারণে কয়েক মাস ধরে শেয়ারবাজারে কিছুটা চাঙাভাব দেখা যাচ্ছে। তবে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে যে ভুল করেন, তা হলো হয় খারাপ শেয়ারে বিনিয়োগ করে লোকসান দেন, না হয় ভালো শেয়ার বেশি দামে কেনেন। তা না হলে খুব দ্রুত লাভের আশায় দ্রুত এক শেয়ার থেকে অন্য শেয়ারের দিকে ঝোঁকেন। কিন্তু শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের সাধারণ নিয়মই হলো ভালো শেয়ারে দীর্ঘ মেয়াদে বিনিয়োগ করা। বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগগুরু হিসেবে পরিচিত ওয়ারেন বাফেটের মতে, শেয়ারে লাভ করতে হয় কেনার সময়। তাই দাম যখন পড়তে থাকে, তখন কেনার ভালো সময় বলে ধরা হয়।

বিজ্ঞাপন
default-image

ভালো শেয়ারে দীর্ঘ মেয়াদে বিনিয়োগ করে যে ভালো লাভ করা যায়, তার কয়েকটি উদাহরণ দেওয়া যাক। মার্চেন্ট ব্যাংক আইডিএলসি ইনভেস্টমেন্টসের এক গবেষণায় দেখানো হয়েছে, শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত স্কয়ার ফার্মা, রেনেটা, ম্যারিকো, রেকিট বেনকাইজার, বার্জার পেইন্টস, ব্র্যাক ব্যাংক, ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বা বিএটিবিসি ও অলিম্পিক ইন্ডাস্ট্রিজের মতো শেয়ারে সাত বছরের বেশি সময়ের জন্য যাঁরা বিনিয়োগ করেছেন, তাঁদের সবাই বছর শেষে গড়ে ১৫ শতাংশের বেশি মুনাফা পেয়েছেন। গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত ঘোষিত লভ্যাংশ ও মূলধনি মুনাফার ওপর ভিত্তি করে আইডিএলসি ইনভেস্টমেন্টস এ তথ্য পেয়েছে। গত জুন শেষে কোম্পানিগুলো যে মুনাফা দিয়েছে এবং এ সময় বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ারের দামের যে উত্থান হয়েছে, সেটি বিবেচনায় নিলে মুনাফার হার বাড়বে বৈ কমবে না।

আইডিএলসি ইনভেস্টমেন্টসের গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, সাত বছরের বেশি সময় বিনিয়োগ ধরে রেখে একজন বিনিয়োগকারী সবচেয়ে বেশি মুনাফা পেয়েছেন ম্যারিকোর শেয়ারে, বছরপ্রতি এ হার প্রায় ৩৬ শতাংশ। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মুনাফা মিলেছে বার্জারের শেয়ার থেকে, এ হার ২৯ শতাংশের বেশি। এরপর রেকিট বেনকাইজারের শেয়ারে বিনিয়োগ করে মিলেছে প্রায় ২৮ শতাংশ মুনাফা। এ ছাড়া ব্র্যাক ব্যাংকের শেয়ারে বিনিয়োগ করে ২৬ শতাংশ, রেনেটার শেয়ার থেকে ২৫ শতাংশ, অলিম্পিকের শেয়ার থেকে প্রায় ২৫ শতাংশ, বিএটিবিসির শেয়ার থেকে ২২ শতাংশ, স্কয়ার ফার্মার শেয়ারে বিনিয়োগ থেকে সাড়ে ১৫ শতাংশের বেশি হারে মুনাফা মিলেছে।

বিশ্বের অন্যান্য দেশে মিউচুয়াল ফান্ডকে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে গণ্য করা হয়। কারণ, একদল পেশাদার ও দক্ষ ব্যক্তি এসব ফান্ড পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত থাকেন।

এখন আপনিই হিসাব করুন, দীর্ঘ মেয়াদে শেয়ারে টাকা খাটানো বেশি লাভ, নাকি ব্যাংকে টাকা রেখে লাভ বেশি। আবার ভালো শেয়ারের একটু বেশি সময়ের জন্য বিনিয়োগ করে লাভ করবেন, নাকি দ্রুত লাভের আশায় খারাপ শেয়ারে বিনিয়োগ করে ঠকবেন—সিদ্ধান্ত আপনার। আপনার লাভের ভাগ যেমন আপনার, তেমনি ক্ষতির দায়ও আপনাকেই নিতে হবে।

বিশ্বের অন্যান্য দেশে মিউচুয়াল ফান্ডকে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে গণ্য করা হয়। কারণ, একদল পেশাদার ও দক্ষ ব্যক্তি এসব ফান্ড পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত থাকেন। এ কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবসর ভাতাভোগী থেকে শুরু করে গৃহিণী, সবাই অর্থ তুলে দেন মিউচুয়াল ফান্ডের সম্পদ ব্যবস্থাপকদের হাতে। এসব সম্পদ ব্যবস্থাপক সাধারণের টাকা বিভিন্ন আর্থিক পণ্যে বিনিয়োগ করে সর্বোচ্চ মুনাফা তুলে আনেন। সেই মুনাফা থেকে বছর বছর নির্দিষ্ট হারে লভ্যাংশ বিতরণ করা হয়; কিন্তু আমাদের দেশে মিউচুয়াল ফান্ডের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা একেবারে তলানিতে। তার যৌক্তিক কারণও অবশ্য রয়েছে। এ দেশের মিউচুয়াল ফান্ডের পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত বেশির ভাগ সম্পদ ব্যবস্থাপক সাধারণ মানুষের অর্থের অপব্যবহার করেছেন। বিনিয়োগকে ফেলেছেন চরম ঝুঁকিতে। ফলে মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগ করে কাঙ্ক্ষিত মুনাফা পাননি অর্থলগ্নিকারীরা। ফলে তাঁরা এ খাত থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

ভালো শেয়ারেই আস্থা

ভালো শেয়ার যে বাজারে নতুন নতুন বিনিয়োগকারী নিয়ে আসে, তার বড় প্রমাণ মুঠোফোন অপারেটর রবি আজিয়াটা। দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম এ মুঠোফোন অপারেটরের প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিও শেয়ারে বিনিয়োগের জন্য কয়েক লাখ বিনিয়োগকারী নতুন করে বিও অ্যাকাউন্ট খুলেছেন। আশা, তাঁদের রবি আইপিওর শেয়ার পাওয়া। ২০০৯ সালে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত গ্রামীণফোনের বেলায়ও এমনটি দেখা গিয়েছিল। ২০০৯ সালে আইপিওতে ৭০ টাকায় বিক্রি হওয়া গ্রামীণফোনের শেয়ারের বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৩২৯ টাকা। এর মধ্যে প্রতিবছরই কোম্পানিটি নিয়মিত লভ্যাংশ দিয়ে গেছে উল্লেখযোগ্য হারে।

ধরা যাক, ২০০৯ সালে একজন বিনিয়োগকারী আইপিওতে গ্রামীণফোনের ২০০ শেয়ার পেয়েছিলেন। সে জন্য তাঁকে বিনিয়োগ করতে হয়েছিল মাত্র ১৪ হাজার টাকা। সেই ১৪ হাজার টাকা দামের শেয়ারের বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৬৬ হাজার টাকা। ২০০৯ সালের অক্টোবর মাসে গ্রামীণফোনের আইপিওর চাঁদা গ্রহণ করা হয়েছিল। সেই হিসাবে কোম্পানিটির আইপিও শেয়ার যাঁরা পেয়েছিলেন, তাঁদের টাকা ১০ বছরে ৫ গুণ হয়ে গেছে। আর বছর বছর মুনাফাও মিলেছে প্রচলিত ব্যাংক সুদের হারের চেয়ে বেশি। তাই এ কথা বলাই যায়, ভালো শেয়ারে বিনিয়োগ করলে ঝুঁকি যেমন কম, তেমনি মুনাফাও বেশি।

মন্তব্য করুন