বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

বাবার তিন মেয়ের মধ্যে বড় লিজার জন্ম নোয়াখালীতে। তবে বেড়ে ওঠা ঢাকায়। এসএসসি পরীক্ষার পর তিন মাসের ছুটি। তখন ভাবলেন, কিছু একটা করা যেতে পারে। এসএসসি অধ্যয়নরত ছাত্রছাত্রীদের কেউ টিউশনি দেয় না। খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, অনেক এজেন্সি তাঁদের মতো শিক্ষার্থীদের ব্র্যান্ড প্রমোটার হিসেবে খণ্ডকালীন কাজ দেয়। খবর পেয়ে হাজির হন মার্কেট অ্যাকসেস নামের একটি প্রতিষ্ঠানে। ইউনিলিভারের একটি ব্র্যান্ডের প্রমোটার হিসেবে কাজ পাওয়ার মধ্য দিয়েই শুরুটা হয়। এরপর একে একে জনসন অ্যান্ড জনসন, এইচআরসি, টেলিটকসহ অনেক ব্র্যান্ডের প্রজেক্টে লিড দেন। কাজটা হলো মার্কেটে ও সুপারস্টোরে কিংবা কখনো কখনো বাসাবাড়িতে পণ্যের মার্কেটিং তথা বিপণন। দিন হিসেবে আয়। তা–ও মন্দ না।

এরই মধ্যে এসএসসির রেজাল্ট হয়ে গেছে। লিজা ভর্তি হলেন কলেজে। এ সময় শ্রীলঙ্কান একটি কোম্পানির কাজ পান। কাজের প্রতি তাঁর দরদ, নিষ্ঠা ও প্রবল আগ্রহ দেখে এই প্রতিষ্ঠানের প্রধান তাঁকে স্থায়ী কর্মী হিসেবে নিয়োগ দেন। এ নিয়ে লিজা বলেন, ‘সে সময় বুঝলাম আমার থিওরিটিক্যাল (তাত্ত্বিক) বিষয়ও জানা দরকার। তাই ঢাকার নীলক্ষেতে গিয়ে মার্কেটিং তথা বিপণন ও ব্র্যান্ডিং–সংক্রান্ত বই সার্চ করতাম। এভাবেই একদিন বিশ্বখ্যাত ফিলিপ কটলারের নাম জেনে যাই। নীলক্ষেতে থেকে আমি ফিলিপ কটলারের বই কিনে পড়তাম।’

নিজের অফিসে বসে লিজা বলে যান, ‘তখন আমার নিজের কোনো কম্পিউটার ছিল না। সে জন্য মাঝেমধ্যে সাইবার ক্যাফেতে গিয়ে কাজের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ইন্টারনেটে ঘাঁটাঘাঁটি করতাম। এভাবে নিজে নিজেই মার্কেটিংয়ের কিছু বিষয় জেনে ফেলি। তাতে কাজেও উন্নতি হতে থাকে।’

এইচএসসি মানে উচ্চমাধ্যমিকের পর রাজধানীর ইডেন কলেজে ভর্তি হন লিজা। তাঁর ভাষায়, ‘এর মাঝে কাজের এক্সপেরিয়েন্স হয়ে গেছে। তারপর আরও দুইটা জব শিফট করি। তখন দেখলাম, পড়াশোনা কিসে করি, সেটা তো ম্যাটার না। যদিও এখন বুঝি পড়াশোনাটা ম্যাটার। কিন্তু তখন কাজের মোহে রেজাল্ট খারাপ হয়েছে, পরীক্ষাটাও ঠিকঠাক দিতে পারিনি।’ তাই নতুনদের কাজের পাশপাশি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা অর্জনেও জোর দিতে পরামর্শ দিলেন লিজা।

অনার্স শেষ হওয়ার আগেই দেশের প্রতিষ্ঠিত এবং নামকরা বিউটি ও লাইফস্টাইল প্রতিষ্ঠান পারসোনার মার্কেটিং বিভাগ দেখাশোনার দায়িত্ব পান লিজা। সেখানে তিনি বিভিন্ন এজেন্সিকে দিয়ে মার্কেটিং ও ব্র্যান্ডিংয়ের কাজ করাতেন। সেটি করতে করতেই তাঁর মনে হয়েছে, এজেন্সির কাজটা ‘ক্রিয়েটিভ, সৃষ্টিশীল ও আনন্দময়’। তা ছাড়া চাকরিতে অনেক সময় নিজের ‘ক্রিয়েটিভ আইডিয়ার ৫০ শতাংশও বাস্তবায়ন করা যায় না’। সে জন্য চাকরি ছেড়ে দিয়ে নিজেই কিছু একটা করার কথা ভাবলেন।

লিজা বলেন, ‘একবার মনে হয়েছে “এই যে আমি মাসে মাসে স্যালারি পাচ্ছি, এটা তো আমি পাব না। তখন একই সময়ে আমার অনেক মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে অফার আসছে। বেশ হ্যান্ডসাম স্যালারিতেই চাকরির অফারগুলো আসছে। তা–ও জব ছাড়লাম।’ তিনি বলেন, ‘আমি তিনজন নিয়ে শুরু করেছি। জুন মাসের ১ তারিখে শুরু। আমার বাবা মারা গেছেন ১৫ তারিখে। আমি পরিবারের বড়। আমার বিয়ের এক বছর তখন। আমার ছোট দুই বোন আর মা আছেন। বাবা অনেক দিন অসুস্থ ছিলেন। তখনো আমি বাসাতে কন্ট্রিবিউট করতাম। বাবার অনেক লোন ছিল, সেটাও দেখি। আগে আমার যা ছিল প্যাশন, তখন সেটা হয়ে গেল প্যাশন, প্রফেশন, আর্জেন্সি সবকিছু।’

শুরু হলো লিজার নতুন জীবন। দিনের পর দিন রাজধানীর পল্টন ও ফকিরেরপুল এলাকা ঘুরে ঘুরে কাগজের জিএসএম, মেশিন কী, কোন মেশিনে কী প্রিন্ট হয়—এসব জানা থেকে শুরু করে ডিজাইনের খুঁটিনাটি, প্রোডাকশন কোয়ালিটি তথা সেবার মান সম্পর্কে শিখতে থাকেন। পাশাপাশি শুরু হয় কাস্টমার খোঁজা। কিন্তু কে তাঁকে কাজ দেবে। পুরোনো সেই সব দিন সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘শুরুর দিকে অনেক স্ট্রাগল করতে হয়েছে। কারণ, সবাই দেখে একটা বাচ্চা মেয়ে, আর হয়তো ভাবে ও আর কী বোঝে? কিন্তু আমি হাল ছাড়িনি। সবার দ্বারে দ্বারে গিয়েছি, কথা বলেছি। জোর দিয়েই বলেছি, হ্যাঁ আমি সেরাটা দিতে পারব। অরিয়ন ফুটওয়্যার আমাকে প্রথম কাজ দেয়। তারপর মালয়েশিয়ান একটা কোম্পানি। যখন দু–তিনজন রেসপন্স করেন, তখন নিজের প্রোফাইলে তাঁদের রেফারেন্স অ্যাড করতে শুরু করি। ফলে অন্যরাও তখন আমার ব্যাপারে ভেবেছেন।’

লিজা তাঁর স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলছেন। নিজের আয় জমা রাখছেন কোম্পানিতে। মুনাফার টাকাও আবার লগ্নি করছেন সেখানে। এভাবে তাঁর তিনজনের কোম্পানিটি বড় হয়েছে। এখন এতে প্রজেক্টভিত্তিক কর্মীসহ ৭০ জন কাজ করেন।

বর্তমানে লিজার তিনটি কোম্পানি। ব্র্যান্ডিলেন ছাড়া বাকি দুটির একটি হলো—ডিজিটাল কমিউনিকেশন প্রতিষ্ঠান ডিজিটেন কমিউনিকেশন। অন্যটি ট্রেডিং কোম্পানি, যেটি সম্প্রতি শুরু করেছে। সেটির কাজ গোছানোর জন্য এখন সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই) রয়েছেন লিজা। নতুন উদ্যোগটি সম্পর্কে লিজা বলেন, ‘করোনার সময় টের পেয়েছি মার্কেটিং এজেন্সির কাজের ওঠানামা প্রবল। এ জন্য আরও কিছু করা দরকার, যা আমার ও কর্মীদের ভবিষ্যৎকে নিরাপদ করবে।’

স্বামী কবির হোসেন ও কন্যা ইনায়াকে নিয়েই লিজার সংসার। তাঁর অফিস ও বাসা—দুটোই মিরপুর ডিওএইচএস এলাকায়। দেশের ব্র্যান্ড মার্কেটিংয়ের জগতে নারীর পদচারণ বাড়াতে চান লিজা। এ জন্য তিনি কাজ করে যেতে চান বলে জানান।

প্র বাণিজ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন