default-image

বিমা খাতের মধ্যে রাষ্ট্রীয় বিমাকারী ও পুনর্বিমাকারী একমাত্র সংস্থা হচ্ছে সাধারণ বীমা করপোরেশন (এসবিসি)। আর বেসরকারি নন-লাইফ বা সাধারণ বিমা কোম্পানি রয়েছে ৪৬টি। কেন জীবনবিমার (৩৩টি) চেয়ে দেশে সাধারণ বিমা কোম্পানি এত বেশি, এর কারণ বোঝা কঠিন কিছু নয়। এসব কোম্পানির বেশির ভাগকেই রাজনৈতিক বিবেচনায় অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

এসবিসি প্রতিবছর সরকারি সম্পত্তির বিমা করে যে আয় করছে, কোনো কাজ করা ছাড়াই তার অর্ধেক দিয়ে দেওয়া হচ্ছে বেসরকারি সাধারণ কোম্পানিগুলোকে। ৩০ বছর ধরে এ কাণ্ড চলছে এবং কোম্পানিগুলোর স্বার্থে সরকার নিজেই এমন সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। এসবিসি সূত্রে জানা গেছে, গত ২০ বছরে সরকারি সম্পত্তির বিমা করে প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা প্রিমিয়াম আয় করেছে সংস্থাটি। এ থেকে প্রায় অর্ধেকের কাছাকাছি টাকা নিয়ে গেছে ৪৫টি বেসরকারি সাধারণ বিমা কোম্পানি।

বিজ্ঞাপন

ইনস্যুরেন্স করপোরেশন অ্যাক্ট-১৯৭৩ সংশোধন করে ১৯৯০ সালে সরকারি আয় ভাগাভাগির এ পদ্ধতি দেশে প্রথম চালু করা হয়। এরপর সমঝোতা চুক্তির মাধ্যমে বেসরকারি কোম্পানিগুলোকে তা দিয়ে আসছে এসবিসি। ৩০ বছরে কত কোটি টাকা বেসরকারি কোম্পানিগুলোকে দিয়ে দিতে হয়েছে, তার পুরো চিত্র এসবিসি কর্তৃপক্ষ জানাতে পারেনি। তবে সংস্থাটির ২০ বছরের প্রিমিয়াম আয়ের চিত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, সরকারি সম্পত্তির বিমা করে সংস্থাটি কোনো বছর ৩০০ কোটি, কোনো বছর ৪০০ কোটি টাকাও আয় করেছে।

২০০৮ সালের নভেম্বরের আগপর্যন্ত বিমা খাত ছিল বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে। বর্তমানে এ খাত দেখভাল করছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। ১৯৯০ সালের ২১ এপ্রিল এসবিসির উদ্দেশে তখনকার বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এক আদেশে জানায়, সরকারি খাতের ব্যবসার (পিএসবি) মোট মুনাফার ৫০ শতাংশ প্রতিবছর সমহারে বেসরকারি বিমা কোম্পানিগুলোকে দিতে হবে। তখন পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবস্থাটি চালু করা হয়েছিল। কয়েক বছর পর ওই আদেশ তুলে নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিল বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। কিন্তু বাস্তবে তা আর হয়নি। তাই ৩০ বছর ধরে মুনাফা দেওয়া হচ্ছে ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে। এ জন্য একটি কমিটি রয়েছে, যার সভাপতি এসবিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি)।

এসবিসির এমডি সৈয়দ শাহরিয়ার আহসান প্রথম আলোকে বলেন, আইনে আছে। তাই বেসরকারি বিমা কোম্পানিগুলোকে মুনাফা দিতে হচ্ছে। এসবিসি থেকে এ মুনাফা নিয়েই কিছু বিমা কোম্পানি কর্মচারীদের বেতন দেয়।

জানা গেছে, আড়াই যুগে পাঁচবার আইনটি সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েও সরকার পিছিয়ে এসেছে বিমা কোম্পানির মালিকদের হস্তক্ষেপে। বরাবরের মতো প্রতিবারই বাদ সেধেছে বাংলাদেশ ইনস্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশন (বিআইএ)।

এসবিসি ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সূত্রগুলো জানায়, বেসরকারি বিমা কোম্পানিকে মুনাফা দেওয়ার বিষয়ে নিজেরা নিজেরা কথা বললেও আনুষ্ঠানিকভাবে মন্ত্রণালয়কে কিছু জানানো হয় না। এর নেপথ্যেও রয়েছে বিআইএর চাপ।

বিজ্ঞাপন

এ বিষয়ে বিআইএর সভাপতি শেখ কবির হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, যা নিয়ম আছে, সেটাই ভালো। নইলে সরকারি সম্পত্তির বিমা সবার জন্য উন্মুক্ত করে দিতে হবে। বিমা খাতের এখনকার বাস্তবতায় তা করা ঠিক হবে না।

সরাসরি সরকারের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয় বলে বিমা কোম্পানির নিয়ন্ত্রক সংস্থা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষও (আইডিআরএ) এ বিষয়ে চুপ রয়েছে। আইডিআরএর শীর্ষ পর্যায়ের এক কর্মকর্তা জানান, আগে সুযোগটি দেওয়া হলেও ৩০ বছর যেহেতু পার হয়ে গেছে, এখন তা পুনর্বিবেচনা করা উচিত।

সাধারণ বিমা খাতের বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশে যে ৪৫টি নন-লাইফ বিমা কোম্পানির জন্ম হলো, তারও নেপথ্যে কাজ করছে এই মুনাফার ভাগাভাগি। সুবিধাটি তুলে নেওয়া হলে কিছু কোম্পানি দেউলিয়া হয়ে যাবে। এই কোম্পানিগুলোকে দেউলিয়া হতে দেওয়াই উচিত। এতে স্বচ্ছতা আসবে এবং পুরো বিমা খাতের ভাবমূর্তি বাড়বে।

এসবিসি সূত্রগুলো জানায়, সরকারি সম্পত্তির বিমা করার ক্ষেত্রে উন্নত সব দেশই রক্ষণশীল। কারণ, সরকারি সম্পত্তির ক্ষতি হলে ক্ষতির পরিমাণ বড় হয়, যা বহনের সক্ষমতা বেসরকারি কোম্পানিগুলোর থাকে না। ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার সরকারি সম্পত্তির বিমা ওই সব দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত বিমা করপোরেশনই করে থাকে। তবে ওই সব দেশ কেন, বিশ্বের কোনো দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত বিমা করপোরেশনও বেসরকারি কোম্পানিকে বিনা কারণে মুনাফা দেয় না।

প্র বাণিজ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন