default-image

মোটরসাইকেল বানাতে ইঞ্জিনের পাশাপাশি চাকা, সিট, ব্রেক শো, ক্লাচ, হ্যান্ডেল, লুকিং গ্লাস, চেইন, লাইট—কত কিছু লাগে। সবকিছুই মোটরসাইকেলের নির্মাতা বানায়, তা নয়। ছোট ছোট কারখানার কাছে এসব সহযোগী শিল্প যন্ত্রাংশ কিনে থাকে ভারত, ভিয়েতনাম, চীনসহ বিভিন্ন দেশের মোটরসাইকেলের নির্মাতা প্রতিষ্ঠান।

গত কয়েক বছরে বাংলাদেশেও মোটরসাইকেল শিল্পটির বিকাশ ঘটেছে। কিন্তু মোটরসাইকেল শিল্পের খুচরা যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ বানানোর পর্যাপ্ত দেশীয় কারখানা তেমন একটা নেই। বিচ্ছিন্নভাবে কয়েকটি কারখানা গড়ে উঠলেও প্রয়োজনের তুলনায় কম। সুসংহত সহযোগী বা সহযোগী শিল্প না থাকায় বিদেশ থেকে কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি আমদানি করে দেশে মোটরসাইকেল বানাতে হচ্ছে। স্থানীয় বাজার থেকে কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা সম্ভব হলে মোটরসাইকেলের দাম আরও কমানো সম্ভব হবে বলে মনে করছেন এই শিল্পের সংশ্লিষ্টরা। বর্তমানে দেশে উৎপাদিত একটি মোটরসাইকেল বানাতে কমবেশি ৩০ শতাংশ দেশি যন্ত্রাংশ ব্যবহার করা হয়।

দেশের মোটরসাইকেল উৎপাদকেরা চান, এ দেশে এই শিল্পের সহযোগী শিল্প গড়ে উঠুক। এতে উৎপাদন খরচও কমবে। কর্মসংস্থান বাড়বে। বর্তমানে টায়ার, মোটরসাইকেলের সিট, চেইনসহ বিভিন্ন ধরনের যন্ত্রাংশ স্থানীয় উৎস থেকে সংগ্রহ করে কয়েকটি উৎপাদক প্রতিষ্ঠান। এ দেশের এমন কিছু সহযোগী শিল্পও সীমিত পরিসরে গড়ে উঠেছে। যেমন, দিনাজপুরে একটি কারখানায় মোটরসাইকেলের চেইন বানানো হয়। এই চেইন বড় কারখানার পাশাপাশি খুচরা পর্যায়েও বিক্রি হয়।

যাঁরা মোটরসাইকেল শিল্পের জন্য যন্ত্রপাতি বানান, তাঁদের ‘ভেন্ডর’ বলা হয়। এসব প্রতিষ্ঠান হলো মোটরসাইকেল শিল্পের সহযোগী প্রতিষ্ঠান। বিদ্যমান করনীতির কারণে সহযোগী শিল্পের এই ছোট ছোট কারখানার মালিকদের কর বৈষম্যের মধ্যে পড়তে হয়েছে। বর্তমানে মোটরসাইকেলের বেশ কিছু কাঁচামাল ও খুচরা যন্ত্রাংশ আমদানিতে ৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক আরোপ আছে।
বিজ্ঞাপন

ফরিদপুরের অবস্থিত আরেক কারখানায় মোটরসাইকেলের সিট বানানো হয়। একটি নামজাদা মোটরসাইকেলের নির্মাতা কারখানা তাদের কাছ থেকে সিট কিনে সংযোজন করে। এ ছাড়া কয়েকটি প্রতিষ্ঠান টায়ারও বানায়, যা বড় কারখানা ও খুচরা বাজারে বিক্রি হয়।

ভেন্ডর বা সহযোগী শিল্পকারখানা উন্নয়নে মোটরসাইকেল উৎপাদকদের মধ্যে সমন্বয় নেই। আমরা সহযোগী শিল্প উন্নয়ন করছি, কিন্তু অনেক উৎপাদক তাঁদের সহায়তা করছে না।
বিজয় কুমার মণ্ডল, প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা, এইচএমসিএল নিলয় বাংলাদেশ লিমিটেড

যাঁরা মোটরসাইকেল শিল্পের জন্য যন্ত্রপাতি বানান, তাঁদের ‘ভেন্ডর’ বলা হয়। এসব প্রতিষ্ঠান হলো মোটরসাইকেল শিল্পের সহযোগী প্রতিষ্ঠান। বিদ্যমান করনীতির কারণে সহযোগী শিল্পের এই ছোট ছোট কারখানার মালিকদের কর বৈষম্যের মধ্যে পড়তে হয়েছে। বর্তমানে মোটরসাইকেলের বেশ কিছু কাঁচামাল ও খুচরা যন্ত্রাংশ আমদানিতে ৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক আরোপ আছে। ফলে সহযোগী শিল্পমালিক ও উৎপাদন প্রতিষ্ঠানকে একই হারে কর দিয়ে এসব পণ্য আমদানি করতে হয়। ফলে কর বৈষম্যের শিকার হন সহযোগী শিল্পের মালিকেরা। উৎপাদকেরা ভেন্ডরদের কাছে পণ্য নিতে নিরুৎসাহিত হন। অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাবে ভেন্ডরদের জন্য কাঁচামাল ও খুচরা যন্ত্রাংশ আমদানিতে ৫ শতাংশের পরিবর্তে ১ শতাংশ শুল্ক নির্ধারণের সুপারিশ করেছে বাংলাদেশ মোটরসাইকেল অ্যাসেম্বলার অ্যান্ড ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএএমএ) ও মোটরসাইকেল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (এমএমইএবি)।

এইচএমসিএল নিলয় বাংলাদেশ লিমিটেডের প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা বিজয় কুমার মণ্ডল এ নিয়ে প্রথম আলোকে বলেন, ‘ভেন্ডর বা সহযোগী শিল্পকারখানা উন্নয়নে মোটরসাইকেল উৎপাদকদের মধ্যে সমন্বয় নেই। আমরা সহযোগী শিল্প উন্নয়ন করছি, কিন্তু অনেক উৎপাদক তাঁদের সহায়তা করছে না। ভারতে একই ভেন্ডরের কাছ থেকে হিরো, বাজাজ ও হোন্ডার প্রতিষ্ঠান নিজেদের যন্ত্রপাতি কিনে থাকে। চাহিদা বাড়লে সহযোগী শিল্পকারখানার মালিকের উৎপাদন বাড়বে। এতে ওই মালিকের খরচ কমবে, টিকে থাকতে পারবেন।’

চীন, ভিয়েতনামের মতো দেশ সহযোগী শিল্প গঠন করে শিল্পোন্নয়ন টেকসই করছে। মোটরসাইকেল শিল্পের জন্য বিচ্ছিন্নভাবে সহযোগী কলকারখানা করে খুব বেশি লাভ হবে না।
আবদুর রাজ্জাক, সভাপতি, হালকা প্রকৌশল শিল্প মালিক সমিতি

এবার আসি কারা মোটরসাইকেল শিল্পের সহযোগী হতে পারেন। দেশের হালকা প্রকৌশল খাতের উদ্যোক্তারাই মোটরসাইকেলে শিল্পের সহযোগী হতে পারেন। হালকা প্রকৌশল শিল্পমালিক সমিতির পক্ষ থেকে মোটরসাইকেল শিল্পের সহযোগী শিল্পের জন্য ৫০০ একর জমির বিশেষ শিল্পপার্ক গঠনের দাবি জানানো হয়েছে। ইতিমধ্যে এই প্রস্তাব শিল্প, বাণিজ্য ও অর্থ মন্ত্রণালয়ে দেওয়া হয়েছে। সমিতির প্রস্তাব অনুযায়ী, মোটরসাইকেল সহযোগী শিল্পপার্ক করা হলে চাকা, টায়ার, ব্রেক শো, ক্লাচ, হ্যান্ডেল, মিরর—এসব ছোট যন্ত্রাংশ বানিয়ে বড় উৎপাদকদের সরবরাহ করা যাবে। এই জন্য সহযোগী শিল্পোদ্যোক্তাদের জন্য ঋণ ও কর সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়।

হালকা প্রকৌশল শিল্প মালিক সমিতির সভাপতি আবদুর রাজ্জাক প্রথম আলোকে বলেন, চীন, ভিয়েতনামের মতো দেশ সহযোগী শিল্প গঠন করে শিল্পোন্নয়ন টেকসই করছে। মোটরসাইকেল শিল্পের জন্য বিচ্ছিন্নভাবে সহযোগী কলকারখানা করে খুব বেশি লাভ হবে না। শিল্পপার্ক হলে এক জায়গা থেকেই উৎপাদকেরা সবকিছু পাবেন। তাঁর মতে, এসব ছোট হালকা প্রকৌশল কারখানা করতে কমবেশি ২০-২৫ কোটি টাকা লাগে। ঋণসুবিধা পেলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পোদ্যোক্তারাই এসব খাতে বিনিয়োগ করতে পারেন।

বিজ্ঞাপন
প্র বাণিজ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন