default-image

যুদ্ধবিধ্বস্ত ভঙ্গুর অর্থনীতির দেশ থেকে আজকের স্বনির্ভর বাংলাদেশ, যেখানে রয়েছে এক বন্ধুর পথ পাড়ি দেওয়ার ইতিহাস। স্বাধীনতার পর সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে উল্লেখ করার মতো একমাত্র শিল্প ছিল পাটশিল্প। এরপর পর্যায়ক্রমে গড়ে উঠতে শুরু করে তৈরি পোশাক, কৃষিভিত্তিক শিল্প, হালকা প্রকৌশল, ওষুধ, চামড়া, জাহাজভাঙা ও জাহাজ নির্মাণশিল্পসহ বহু শিল্প।

কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্প দেশের অর্থনীতিতে এরই মধ্যে শক্ত একটি জায়গা তৈরি করে ফেলেছে। এ ছাড়া দেশের হয়ে রপ্তানির অন্যতম খাত হয়ে ওঠা এই শিল্প বিশ্বদরবারেও ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছে। এই খাতে নেতৃত্ব দিচ্ছে বাংলাদেশের ‘প্রাণ’। বাংলাদেশের প্রাণ এখন বিশ্বের ১৪৫টি দেশে পৌঁছে গেছে। বিশ্বের এমন কিছু দেশ আছে, যেখানে বাংলাদেশের দূতাবাস নেই, কিন্তু প্রাণ সেখানে বাংলাদেশের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করছে। রপ্তানিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখায় প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ সরকারের কাছ থেকে পরপর ১৬ বার জাতীয় রপ্তানি ট্রফি পেয়েছে।

চার দশকের পথচলায় প্রাণ-আরএফএল পরিবার আজ বেশ সমৃদ্ধ। খাদ্যপণ্য, হাউসওয়্যার, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্য, ইলেকট্রিক অ্যান্ড ইলেকট্রনিকস হোম অ্যাপ্লায়েন্স, ফার্নিচার, বাইসাইকেল, লিফট, টেক্সটাইল, টয়লেট্রিজ ও ফ্লেক্সিবল প্যাকেজিংসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাত করছে প্রাণ-আরএফএল। দেশের ১৮টি স্থানে প্রাণ-আরএফএল এর কারখানা রয়েছে, যেখানে এর পণ্যসমূহ উৎপাদিত হয়ে পৌঁছে যাচ্ছে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্বদরবারে। আমরা আমাদের কারখানাগুলো করেছি দেশের প্রত্যন্ত এলাকায়, যাতে স্থানীয় মানুষ বেশি করে কর্মসংস্থানের সুযোগ পায়।

বিজ্ঞাপন
আমাদের পথচলা শুরু হয় ১৯৮১ সালে, টিউবওয়েল ও কৃষিসহায়ক যন্ত্রপাতি তৈরির মাধ্যমে। এরপর কৃষিপণ্য উৎপাদনে আগ্রহী হই আমরা। ১৯৮৫ সালে নরসিংদীতে স্বল্প পরিসরে কলা, পেঁপে, আনারস, রজনীগন্ধা ইত্যাদি চাষ করা শুরু করি। আর এর মাধ্যমেই যাত্রা শুরু অ্যাগ্রিকালচারাল মার্কেটিং কোম্পানি লিমিটেড, তথা প্রাণের।

প্রাণ-আরএফএল পরিবারের একজন সদস্য হিসেবে গর্ব হয় যখন দেখি বাংলাদেশের প্রাণ পণ্য আফ্রিকার বাহামাসের প্রত্যন্ত অঞ্চলের একজন ব্যক্তির বাজারের ব্যাগে বা ওশেনিয়া দ্বীপপুঞ্জের দেশ ফিজি, ভানুয়াতু বা সলোমন দ্বীপপুঞ্জে কোনো ব্যক্তির হাতে। ভালো লাগে যখন দেখি প্রাণের পণ্য বিভিন্ন দেশের নামীদামি ব্র্যান্ডের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে বিশ্বের বিখ্যাত সব চেইন শপে। এসব চেইন শপে ক্রেতার বাজারের ট্রলিতে যখন আর ৮-১০টা পণ্যের মধ্যে প্রাণ ফ্রুটো কিংবা আরএফএলের কনটেইনার স্থান পায়, তখন মনে হয় বাবার দেখানো পথে ব্যবসায় জীবনে আমার প্রবেশ অনেকটা সার্থক।

আমাদের পথচলা শুরু হয় ১৯৮১ সালে, টিউবওয়েল ও কৃষিসহায়ক যন্ত্রপাতি তৈরির মাধ্যমে। এরপর কৃষিপণ্য উৎপাদনে আগ্রহী হই আমরা। ১৯৮৫ সালে নরসিংদীতে স্বল্প পরিসরে কলা, পেঁপে, আনারস, রজনীগন্ধা ইত্যাদি চাষ করা শুরু করি। আর এর মাধ্যমেই যাত্রা শুরু অ্যাগ্রিকালচারাল মার্কেটিং কোম্পানি লিমিটেড, তথা প্রাণের।
কৃষিপণ্য উৎপাদন করতে গিয়ে দেখি, দেশে অনেক পণ্য উৎপন্ন হলেও মৌসুমের সময় পণ্যের দাম কমে যায় এবং ন্যায্যমূল্য থেকে কৃষক বঞ্চিত হন। এ ছাড়া সংরক্ষণের অভাবে প্রচুর ফসল নষ্ট হয়ে যায়। তাই কৃষিপণ্য উৎপাদনের চেয়ে বরং প্রক্রিয়াজাতকরণে উদ্যোগী হই। ১৯৯৩ সালে নরসিংদীতে কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাত করার জন্য একটি কারখানা স্থাপন করি।

কৃষকদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল সংগ্রহ করতে গিয়ে আমরা তাঁদের মধ্যে দক্ষতার ঘাটতি ও প্রয়োজনীয় উপকরণের অভাব লক্ষ করলাম। আমরা চুক্তিভিত্তিক চাষ শুরু করলাম। বর্তমানে প্রাণের এক লাখ চুক্তিভিত্তিক কৃষক রয়েছেন, যাঁদের কাছ থেকে নিয়মিতভাবে আম, টমেটো, বাদাম, চাল, ডাল, আনারস, পেয়ারা, হলুদ, মরিচসহ বিভিন্ন পণ্য সংগ্রহ করছি।

একসময় দেশের মানুষের পুষ্টির চাহিদা মেটাতে প্রচুর পরিমাণ গুঁড়ো দুধ বিদেশ থেকে আমদানি করা হতো। আমরা দুগ্ধ খাতের উন্নয়নের কথা চিন্তা করে উত্তরাঞ্চলে প্রথম ডেইরি হাব পদ্ধতি চালু করলাম। বর্তমানে প্রাণ ডেইরির পাঁচটি হাবের অধীনে ১২ হাজার নিবন্ধিত খামারি রয়েছেন। এই ডেইরি হাব থেকে খামারিদের পরিচর্যা ও প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।

হালকা প্রকৌশল শিল্প হতে পারে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি খাত। আমরা এরই মধ্যে আমাদের উৎপাদিত দুরন্ত বাইসাইকেল বিশ্বের ১০টি দেশে রপ্তানি করছি। একটা সময় আমাদের ইলেকট্রনিকস ও ইলেকট্রিক পণ্য সম্পূর্ণ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হতো। এখন পরিস্থিতি পরিবর্তিত হচ্ছে।

গ্রুপে এখন ১ লাখ ১০ হাজার লোকবল সরাসরি কাজ করছেন, যা বেসরকারি পর্যায়ে সর্বোচ্চ। বর্তমানে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে গ্রুপের নির্ভরশীল প্রায় ১৫ লাখ মানুষ। কর্মসংস্থান তৈরির পাশাপাশি সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে আমরা হাসপাতাল ও স্কুল পরিচালনা করছি। তা ছাড়া বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অর্থ সহায়তা, রাস্তাঘাট নির্মাণ, দুর্যোগ মানুষের পাশে থাকাসহ বিভিন্ন ধরনের কার্যক্রমও পরিচালনা করে আসছি।

আমাদের ৪০ বছরের এই যাত্রায় সরকার, আর্থিক প্রতিষ্ঠানসহ সংশ্লিষ্ট সবার সহায়তা এবং দেশ-বিদেশের অগণিত ভোক্তা আমাদের ওপর আস্থা রাখায় আমরা এই পর্যায়ে পৌঁছাতে পেরেছি। তবে আমরা এখানেই থেমে যেতে চাই না। এখন আমাদের লক্ষ্য ৫০-এ পা দেওয়ার আগেই বিশ্বের সর্বত্র পৌঁছানো এবং বিশ্বের শীর্ষ কয়েকটি ব্র্যান্ডের একটিতে পরিণত হওয়া।

বিজ্ঞাপন
প্র বাণিজ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন