default-image

দেশে করোনাভাইরাসের টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছে। কারা এই টিকা পাবেন, কাদের নেওয়া উচিত আর কাদের এই টিকা নেওয়া উচিত নয়?

অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ: খুবই খুশির খবর যে বাংলাদেশ অন্যান্য দেশের প্রায় কাছাকাছি সময়েই টিকাদান কর্মসূচি শুরু করতে পারল। করোনার টিকা অবশ্যই সম্মুখসারির যোদ্ধাদের সবার আগে পাওয়া উচিত, সারা বিশ্বে এই নীতিই অনুসরণ করা হচ্ছে। তাই বাংলাদেশেও সবার আগে স্বাস্থ্যকর্মীদের পাওয়ার কথা। কারণ, তাঁরা ও তাঁদের পরিবার সবচেয়ে ঝুঁকির মধ্যে। এখানে চিকিৎসক, নার্সসহ সব স্বাস্থ্যকর্মীর কথা বলা হচ্ছে, মানে হাসপাতালে ও ল্যাবরেটরিতে কাজ করেন বা রোগীর সংস্পর্শে আসেন—এমন সবাই। যেমন মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, অ্যাম্বুলেন্সের চালক, আয়া—সবাই। এরপর যারা ষাটোর্ধ্ব ব্যক্তি ও ডায়াবেটিস, হৃদ্‌রোগ, কিডনি জটিলতা, উচ্চ রক্তচাপসহ নানা ধরনের কোমরবিডিটি আছে, যা করোনা সংক্রমণের জটিলতাকে বাড়িয়ে দেয়, তাঁরা এই টিকার দাবিদার। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা, প্রশাসন ও মাঠপর্যায়ে কাজ করেন—এমন কর্মকর্তা-কর্মচারী, গণমাধ্যমকর্মী, পরিবহনকর্মী, শিক্ষক, ব্যাংকার, বিক্রয়কর্মী—অর্থাৎ যাঁদের বহু মানুষের সংস্পর্শে আসতে হয়, তাঁদের সবাইকে টিকার আওতায় আনতে হবে।

এখন স্পষ্ট করা যাক কাদের এই টিকা নেওয়া উচিত নয়। প্রথমত, অন্তঃসত্ত্বা ও স্তন্যদানকারী নারী এবং ১৮ বছরের নিচে বয়সীরা টিকা নেবে না। কারণ তাদের ওপর এখন পর্যন্ত টিকার পরীক্ষামূলক প্রয়োগ হয়নি। তবে ভবিষ্যতে তারাও নেবে কি না, সে সম্পর্কে নতুন নির্দেশনা আসতে পারে। যাঁরা ইমিউনিটি সাপ্রেসড, মানে গুরুতর ক্যানসার রোগী, কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি নিচ্ছেন—এমন ব্যক্তিরাও এই টিকা নেবেন না। যাঁদের অন্যান্য ওষুধ ও ইনজেকশনে মারাত্মক অ্যালার্জির ইতিহাস আছে, তাঁদেরও এই মুহূর্তে টিকা নেওয়ার দরকার নেই। এর বাইরে যত বেশি মানুষকে টিকার আওতায় আনা যায়, ততই মঙ্গল।

default-image
বিজ্ঞাপন

এই টিকা কত দিন পর্যন্ত কোভিড-১৯ থেকে নিরাপত্তা দিতে পারবে? কতখানি নিরাপদ?

এ বি এম আবদুল্লাহ: যেসব টিকা এখন ব্যবহৃত হচ্ছে, ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে সেসবের কার্যকারিতা (ইফেকটিভনেস) ও নিরাপত্তা (সেফটি) প্রমাণিত হওয়ার পরই এফডিএর অনুমোদন পেয়েছে। ট্রায়ালের প্রতিবেদন অনুযায়ী ফাইজারের টিকা ৯৪.৫ শতাংশ কার্যকর, মডার্নার টিকা ৯৪.১ শতাংশ আর অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা ৬২–৯০ শতাংশ কার্যকর হিসেবে প্রমাণিত। এটি মানুষের শরীরে ব্যবহার করার পর ঠিক কত দিন সুরক্ষা দেবে, টিকা কার্যক্রম বেশ খানিকটা চলার পর তা বোঝা যাবে। তবে বিশ্বজুড়ে বৃহৎসংখ্যক মানুষকে টিকার আওতায় আনতে পারলে ‘হার্ড (herd) ইমিউনিটি’ গড়ে তোলার মাধ্যমে এই মহামারিকে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। টিকাদানের সেটাই মূল উদ্দেশ্য। এই পদ্ধতিতেই পৃথিবী থেকে পোলিও বা গুটি বসন্ত নির্মূলের চেষ্টা করে সফলতা এসেছে। টিকা ছাড়া মহামারি নিয়ন্ত্রণ ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার কোনো পথও খোলা নেই।

কতটুকু নিরাপদ, সেই প্রসঙ্গে বলি, সব ওষুধ, ইনজেকশন বা টিকার কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকেই। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তা মৃদু। যেমন টিকার স্থানে মৃদু ব্যথা, হালকা জ্বর, মেজমেজ ভাব, শরীর ব্যথা, বমি ভাব ইত্যাদি। এগুলো যেকোনো টিকার ক্ষেত্রেই হয়। গণমাধ্যমের কল্যাণে অনেকেই হয়তো জেনেছেন যে নরওয়েতে কিছুসংখ্যক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে নরওয়ে সরকার জানিয়েছে যে এই মৃত্যুর সঙ্গে টিকার সরাসরি কোনো সম্পর্ক পাওয়া যায়নি, তাঁরা সবাই ছিলেন বয়োবৃদ্ধ (৮০ বছরের ওপর) আর নানা ধরনের জটিল রোগে আক্রান্ত। ভারত থেকেও যেসব সংবাদ এসেছে, সেগুলোও মৃদু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার খবর, আর সরাসরি টিকার সঙ্গে সম্পর্কিত কি না, তা নিশ্চিত নয়। বরং উল্টো দিক দিয়ে দেখলে আজ (২৩ জানুয়ারি) পর্যন্ত বিশ্বের অন্তত ৬ কোটি মানুষকে টিকা দেওয়া হয়েছে। এই বিপুলসংখ্যক মানুষের বেশির ভাগেরই কোনো প্রতিক্রিয়া হয়নি। তাই এখনো এই ভয় অমূলক বলেই মনে হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের একটি বড় ভূমিকা আছে মনে করি। স্বচ্ছ, সত্য ও বিজ্ঞানভিত্তিক খবর প্রচারে গুরুত্ব দিতে হবে, মনগড়া কথা প্রচার করা ঠিক নয়।

বাংলাদেশে এসেছে কোভিশিল্ড টিকা। অনেক দেশে আবার ফাইজারের টিকাও ব্যবহৃত হচ্ছে। এ দুটি টিকার কথা যদি একটু বলেন...

এ বি এম আবদুল্লাহ: কোভিশিল্ড ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটে উৎপাদিত হলেও এটা ভারতের টিকা নয়। এটি অক্সফোর্ড অ্যাস্ট্রাজেনেকার তৈরি। এই টিকার নিরাপত্তা ও কার্যকারিতার বিশদ ল্যানসেট জার্নালে গত ডিসেম্বরে প্রকাশিত হয়। সেই নিবন্ধে বলা হয় যে প্রথম ডোজ এবং তারপর ৪ থেকে ১২ সপ্তাহের মধ্যে দ্বিতীয় ডোজ নেওয়ার পর ৭০-৯০% কার্যকারিতা দেখা গেছে।

ফাইজারের টিকা ৯৪ শতাংশ কার্যকর হলেও এটি সংরক্ষণ করতে হয় মাইনাস ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায়। যেটি সংরক্ষণ ও পরিবহনের সক্ষমতা শুধু বাংলাদেশ কেন পৃথিবীর অনেক দেশেরই নেই। তা ছাড়া এর পরিবহন ব্যয় ও দাম অনেক বেশি। অন্যদিকে কোভিশিল্ড মাইনাস ২ থেকে মাইনাস ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করা সম্ভব। দেশের প্রত্যন্ত এলাকাতেও সহজে পরিবহন করা সম্ভব।

এখন পর্যন্ত ফাইজার বা কোভিশিল্ড কোনো টিকারই বড় ধরনের কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। যেসব মৃত্যুর সংবাদ রটেছে, সেগুলোর সঙ্গে টিকার সরাসরি সংশ্লিষ্টতাও প্রমাণিত হয়নি।

বিজ্ঞাপন

টিকা গ্রহণের আগে বন্ড বা অনুমতিপত্রে সই নেওয়ার কথা শুনে অনেকেই চিন্তিত...

এ বি এম আবদুল্লাহ: যাঁরা চিকিৎসাবিজ্ঞানের সঙ্গে জড়িত, তাঁরা সবাই জানেন, এ রকম বন্ডে সই অহরহ নেওয়া হয়ে থাকে। যেমন একটি অস্ত্রোপচারের আগে বা কোনো রোগীর প্রসিডিউর করতে হলে, আইসিইউতে (নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র) নিলে বা না নিলে—হাসপাতালগুলোতে সব সময়ই নানা বিষয়ে লিখিত অনুমতিপত্রে সই করতে হয়। এটা নতুন কিছু নয়। আর এর মানে এই নয় যে এর মাধ্যমে আপনার ওপর গবেষণা বা ট্রায়াল চালানো হচ্ছে। এই টিকাগুলো এরই মধ্যে ট্রায়ালের সব পর্ব সম্পন্ন করে এসেছে, তাই ট্রায়ালের আর দরকার নেই।

টিকা নেওয়ার পরও কি কারও কোভিড-১৯ হতে পারে?

এ বি এম আবদুল্লাহ: আগেই বলেছি কোন টিকা কতখানি কার্যকর। কোনো টিকাই শতভাগ কার্যকর নয়, অন্য রোগের টিকাও নয়। যদি অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা ৭০ শতাংশ কার্যকর দাবি করা হয়, তবে ৩০ শতাংশের তো ঝুঁকি আছেই। সেই দলে আমি বা আপনি পড়ব না, তা–ও নিশ্চিত নয়। মানবদেহের ইমিউন রেসপন্স একেকজনের একেক রকম, তা যেমন কোভিড হওয়ার পর, তেমনি টিকার ক্ষেত্রেও তা প্রযোজ্য। তাই টিকা নেওয়ার পরও যত দিন এই মহামারি শেষ না হয়, তত দিন স্বাস্থ্যবিধি আগের মতোই মেনে চলতে হবে। মুখে মাস্ক পরা, বারবার হাত ধোয়া, হাঁচি-কাশি শিষ্টাচার মেনে চলা, সামাজিক দূরত্ব মেনে চলার মতো স্বাস্থ্যবিধি আরও অনেক রোগ থেকেই সুরক্ষা দেবে।

টিকা নেওয়ার পর কারও সমস্যা হলে কী করবেন?

এ বি এম আবদুল্লাহ: সরকার এ বিষয়ে এরই মধ্যে প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। টিকা গ্রহণের পর প্রত্যেককে একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত পর্যবেক্ষণের আওতায় আনা হবে। টেলিমেডিসিনের ব্যবস্থাও করা হবে। কারও টিকা নেওয়ার পর যেকোনো ধরনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিলে দ্রুত সে বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

টিকা নেওয়ার পর কারও করোনার উপসর্গ দেখা দিলে কী করা উচিত?

এ বি এম আবদুল্লাহ: আমরা এখনো জানি না এই টিকা দেওয়ার পর কত দিন পর্যন্ত সুরক্ষা পাব বা শতভাগ করোনা থেকে সুরক্ষা পাব কি না। তাই টিকা পাওয়ার পরও জ্বর, কাশি, স্বাদ-গন্ধহীনতার মতো উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। চিকিৎসক যদি মনে করেন, তবে তিনি কোভিড-১৯ পরীক্ষাও করাতে পারেন। আরেকটি ব্যাপার, টিকার প্রথম ডোজ পাওয়ার পরই পুরোপুরি আশানুরূপ সুরক্ষা মিলবে না। তাই প্রথম ডোজের পর আরেকটি ডোজ না পাওয়া পর্যন্ত একটু বেশি সতর্ক থাকতে হবে।

কারও কোভিড হলেও কি তাঁরা টিকা নেবেন? কত দিন পর নেওয়া উচিত?

এ বি এম আবদুল্লাহ: কোভিড-১৯–এ আক্রান্ত হওয়ার পর প্রাকৃতিক সুরক্ষা বা ন্যাচারাল ইমিউনিটি কতটা বা কত দিন থাকে, তা নিয়ে সংশয় আছে। তাই কারও আগে কোভিড হয়ে থাকলেও তাঁকে টিকা নিতে হবে। তবে করোনা নেগেটিভ হওয়ার ২৮ দিন পর টিকা নিতে পারবেন। খুব সাম্প্রতিক কালে কোভিড হয়ে থাকলে অন্যদের সুযোগ দিতে আক্রান্ত ব্যক্তিদের কিছুদিন পর দিলেও চলে।

সবশেষে বলতে চাই, বিজ্ঞানের ওপর ভরসা রাখুন। সামনের দিকে তাকান। টিকা বিষয়ে অহেতুক সন্দেহ ও অমূলক আশঙ্কায় আক্রান্ত না হয়ে সবাই টিকা নিন।

মন্তব্য করুন