default-image

শীত শেষে এখন বসন্তকাল। এ সময়টায় শিশুর শ্বাসকষ্টের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায় ব্রঙ্কিউলাইটিস। দেশের শিশুদের ব্রঙ্কিউলাইটিস রোগটির অনেকটা আকস্মিক বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। কয়েক বছর পরপর ব্রঙ্কিউলাইটিস রোগের ব্যাপক প্রাদুর্ভাব ঘটে। ২০০০ ও ২০০১ সালে প্রাদুর্ভাব ঘটায় বাংলাদেশে ব্রঙ্কিউলাইটিস রোগটি সম্পর্কে প্রথম সচেতনতা তৈরি হয়। এর আগে শিশুদের সব শ্বাসকষ্টকে নিউমোনিয়া বলেই ধরে নেওয়া হতো।

অধিকাংশ ক্ষেত্রে শিশুদের জ্বর-শ্বাসকষ্ট হলে নিউমোনিয়া হয়েছে ধরে নিয়ে অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে চিকিৎসা করা হয়, যা অপ্রয়োজনীয়। এই প্রবণতা বাংলাদেশে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিসট্যান্স বিকাশ লাভে বিশেষভাবে সহায়তা করেছে।

ব্রঙ্কিউলাইটিস রোগটি সঠিকভাবে নির্ণয় করে সুচিকিৎসা দিতে পারলে দেশে অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার ও অতিব্যবহার অনেকাংশে রোধ করা সম্ভব।

ব্রঙ্কিউলাইটিস

আমাদের বুকের দুই পাশে দুটি ফুসফুস আছে, যার কাজ হলো শরীরের দূষিত কার্বন ডাই-অক্সাইড বের করে দিয়ে পরিবেশ থেকে প্রয়োজনীয় অক্সিজেন সরবরাহ করা। ফুসফুসগুলো দেখতে ওল্টানো গাছের মতো। গাছ শাখা-প্রশাখায় বিভক্ত হয়ে যেমন পাতায় শেষ হয়, তেমনি ফুসফুসের পাতাগুলো আমাদের শরীরে এলভিওলাই হিসেবে পরিচিত। এলভিওলাইতে ব্যাকটেরিয়াজনিত প্রদাহ হলে আমরা ধরে নিই নিউমোনিয়া হয়েছে এবং পাতার বোঁটায় বা ব্রঙ্কিউলে যদি ভাইরাসের কারণে প্রদাহ হয়, তাকে বলে ব্রঙ্কিউলাইটিস। তাই এ দুইয়ের মধ্যে তফাত রয়েছে। রেসপিরেটরি সিনসাইটিয়াল ভাইরাস ব্রঙ্কিউলাইটিসের প্রধান কারণ।

রেসপিরেটরি সিনসাইটিয়াল ভাইরাস শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে শিশুদের শরীরে প্রবেশ করে এবং শ্বাসনালির ব্রঙ্কিউলসে প্রদাহ করে। তিনটি কারণে শ্বাসনালি সরু হয়ে যায়। ১. শ্বাসনালির দেয়ালে প্রদাহজনিত পানি জমা, ২. শ্বাসনালিতে অনেক শ্লেষ্মা উৎপাদন এবং ৩. প্রদাহের কারণে শ্বাসনালির মৃত কোষ ঝরে পড়া। শিশুর ফুসফুসে বাতাস আটকে যায় এবং শ্বাস-প্রশ্বাসে সমস্যা হয়।

বিজ্ঞাপন

কোন শিশুদের হয়ে থাকে

এক বছরের কম, বিশেষ করে দুই থেকে ছয় মাস বয়সের শিশুরাই প্রধানত আক্রান্ত হয়। যেসব শিশু বুকের দুধ খেতে পারেনি, স্বল্প ওজন নিয়ে জন্মগ্রহণকারী শিশুরা, ধূমপানকারী পরিবারের শিশুরা, জন্মগত হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত শিশুরা ব্রঙ্কিউলাইটিসে আক্রান্ত হলে অসুখটি দীর্ঘস্থায়ী হয়।

উপসর্গ ও লক্ষণ

সামান্য জ্বর, নাক দিয়ে পানি পড়া, অস্থিরতা, কিছু খেতে না পারা, অবিরাম কান্না, গলা বসে যাওয়া, শিশুর হাসি থেমে যাওয়া, ঘন ঘন শ্বাস নেওয়া, শ্বাসকষ্ট হওয়া ইত্যাদি ব্রঙ্কিউলাইটিসের উপসর্গ।

শারীরিক পরীক্ষা করলে দ্রুত শ্বাস হার ৬০ থেকে ৭০ প্রতি মিনিটে বা এর বেশি পাওয়া যায়। বুকের পাঁজরের নিচের অংশ দেবে যায়। ঠোঁট বা হাত-পা নীল হয়ে যাওয়া, শিশুর নাকের কাছে কান পাতলে শ্বাস ফেলার সময় বাঁশির মতো আওয়াজ এর লক্ষণ। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বুকে বাঁশির মতো শব্দ এবং অনেক সময় চুলের ঘর্ষণের শব্দ শোনা যায়।

এই শিশুরা তিন থেকে চার দিনের মধ্যেই সুস্থ হতে থাকে এবং শ্বাসকষ্ট সত্ত্বেও কাশতে থাকে এবং হাসতে থাকে।

রোগনির্ণয়

ব্রঙ্কিউলাইটিস রোগ নির্ণয়ের জন্য রক্ত পরীক্ষা বা বুকের এক্স–রে করার প্রয়োজন নেই। তবে পরীক্ষা করলে বুকের এক্স-রেতে ফুসফুসে বাতাস আটকে থাকার আলামত পাওয়া যায়। ফুসফুস বেশ বড় এবং বেশি কালো দেখায়। তবে ফুসফুসে নিউমোনিয়া হওয়ার লক্ষণ যেমন কোনো অংশ সাদা হয়ে যাওয়ার কোনো চিহ্ন থাকে না। তুলার মতো সাদা সাদা অংশ থাকতে পারে, যা ভাইরাসজনিত নিউমোনিয়ার কারণে হতে পারে। রক্ত পরীক্ষায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে শ্বেতকণিকার মাত্রা স্বাভাবিক থাকে এবং ইএসআর, সিআরপি খুব বেশি বাড়ে না।

চিকিৎসা

শিশু স্বাভাবিক থাকলে, খেতে পারলে, জ্বর বেশি না হলে এবং শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা না কমে গেলে বাড়িতে রেখে চিকিৎসা করতে হবে। মাথা উঁচু করে রাখতে হবে, বুকের দুধ বা অন্য স্বাভাবিক খাবার দিতে হবে এবং পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে। যদি খেতে সমস্যা হয়, শ্বাসকষ্ট বেড়ে যায়, জ্বর বেড়ে যায়, তাহলে হাসপাতালে নিতে হবে।

হাসপাতালে চিকিৎসা

  • পালস অক্সিমিটার যন্ত্রের সাহায্যে রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা নিরূপণ করা যায়। রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা ৯০ থেকে ৯২ শতাংশের নিচে হলে শিশুকে অক্সিজেন দিতে হবে। রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা ৯৫ শতাংশের ওপরে রাখতে হবে।

  • খেতে না পারলে নাকে নল দিয়ে খাওয়াতে হবে অথবা শিরায় স্যালাইন দিতে হবে।

  • নেবুলাইজেশন দিয়ে চিকিৎসা করা বহুদিনের প্রচলিত চিকিৎসা। সলবিউটামল দিয়ে নেবুলাইজ করলে কিছুসংখ্যক শিশুর উপকার হয়, কিছুসংখ্যক শিশুর কোনো উপকার হয় না এবং কিছুসংখ্যক শিশুর জন্য ক্ষতিকারক। তবে উচ্চমাত্রার স্যালাইন দিয়ে নেবুলাইজ করলে বুকের শ্লেষ্মা তরল হয় এবং শিশুর শ্বাসকষ্ট কমাতে সাহায্য করে।

  • এসব চিকিৎসা সত্ত্বেও যদি শিশুর অবস্থা আরও খারাপ হয়ে যায়, তবে তাকে শিশু আইসিইউতে ভর্তি করাতে হবে।

বিজ্ঞাপন

অ্যান্টিবায়োটিকের প্রয়োজন নেই

ব্রঙ্কিউলাইটিস একটি ভাইরাসজনিত রোগ। তাই অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের কোনো দরকার নেই। তবে শিশু যদি বেশি অসুস্থ হয়, জ্বর বেশি থাকে, কম বয়সে (২ মাসের মধ্যে) বেশি ঝুঁকি থাকে, তবে চিকিৎসক অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়ার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

শিশু যদি খেতে পারে, শ্বাসকষ্ট কমে যায়, অক্সিজেনের প্রয়োজন না হয়, জ্বর না থাকে, শিশুকে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া যেতে পারে। তিন থেকে পাঁচ দিনের মধ্যেই অনেক শিশু বাড়ি যেতে পারে।

যেসব শিশুর ঝুঁকি বেশি, যেমন বুকের দুধ খায়নি, সময়ের আগে জন্মগ্রহণ করেছে, রক্তস্বল্পতা থাকলে, জন্মগত হার্টে সমস্যা থাকলে সুস্থ হতে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে।

অভিভাবকের জন্য বার্তা

  • ব্রঙ্কিউলাইটিস ছোট্ট শিশুদের ফুসফুসের ভাইরাসজনিত অসুখ, এটি নিউমোনিয়া নয়। আক্রান্ত শিশুরা তিন থেকে পাঁচ দিনের মধ্যে দ্রুত সুস্থ হয়, যদি ঝুঁকি না থাকে। কিন্তু কাশি থাকতে পারে ২১ দিন পর্যন্ত।

  • শ্বাসকষ্ট কমে গেলে ও অক্সিজেনের প্রয়োজন না হলে, খেতে পারলে হাসপাতালে থাকার দরকার নেই।

  • পরবর্তী সময়ে শিশুটি আবারও ব্রঙ্কিউলাইটিসে আক্রান্ত হতে পারে, এমনকি কিছুসংখ্যক শিশুর হাঁপানিও হতে পারে। বারবার শ্বাসকষ্ট হওয়া মানে নিউমোনিয়া নয়।

নিউমোনিয়া ও ব্রঙ্কিউলাইটিসের পার্থক্য

  • উপসর্গ ও লক্ষণে কিছু মিল থাকলেও ব্রঙ্কিউলাইটিস ও নিউমোনিয়ার দুটি রোগের চিকিৎসা ও গতি–প্রকৃতি সম্পূর্ণ আলাদা।

  • নিউমোনিয়া যেকোনো বয়সে হতে পারে, কিন্তু ব্রঙ্কিউলাইটিস দুই বছর বয়সের পরে আর হয় না।

  • নিউমোনিয়া হলে শিশুর জ্বর বেশি হয়, শিশুকে বেশি অসুস্থ মনে হয়, ঘন ঘন দম নেওয়া, বুক দেবে যাওয়া এবং চিকিৎসাযন্ত্র দিয়ে পরীক্ষা করে নিশ্চিত হওয়া যায়। রক্ত পরীক্ষা করলে শ্বেতকণিকার মাত্রা বেড়ে যায়, ইএসআর এবং সিআরপিঅনেক বেশি হয়। বুকের এক্স-রে করলে বিভিন্ন স্থানে সুনির্দিষ্ট সাদা সাদা দাগ বা ফুসফুসের একটি অংশ একেবারে সাদা হয়ে যায়।

  • নিউমোনিয়া হলে অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে চিকিৎসা করতে হবে। অক্সিজেন দেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে এবং শিরায় স্যালাইন দেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।

প্র স্বাস্থ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন