বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশে প্রথম কোভিড রোগী শনাক্ত হয় গত বছরের ১৯ মার্চ। রাজধানীর টোলারবাগের সেই রোগীকে প্রথম নিজের প্রাইভেট চেম্বারে দেখেছিলেন বিশিষ্ট হৃদ্‌রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আবদুল ওয়াদুদ চৌধুরী। রোগীকে দেখার দুদিন পর তাঁর নিজের জ্বর এলে তিনি ১৪ দিনের আইসোলেশনে চলে যান। ঘরে আবদ্ধ থেকেই একটি ব্যক্তিগত অনুভূতি লেখেন, ‘বন্দিজীবনের কথকতা’।

অধ্যাপক ওয়াদুদের সেই কথকতা সে সময় বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরালও হয়। তিনি লিখেছিলেন, ‘মানুষ অসুস্থ হলে চায় প্রিয়জনের স্নেহ, স্পর্শ। আর আজ কিনা দূরে যাও তুমি, আরও দূরে; যদি হতে চাও মনের কাছাকাছি...! এখন গাইডলাইন মেনে দুই বেলা শরীরের তাপমাত্রা মাপি। স্বেচ্ছাবন্দিত্বের নবম দিনে অপেক্ষা করি আরও পাঁচ দিন পরের স্বাধীনতার জন্য। অপেক্ষা করি স্ত্রী আর একমাত্র সন্তানকে আলিঙ্গনের উষ্ণতার জন্য।’

প্রায় দুই বছর পরে পরিস্থিতি এখন হয়তো অনেকটাই স্বাভাবিক, প্রথম দিককার সেই আতঙ্ক, অনিশ্চয়তা, ভীতি আর নেই, কোভিড রোগী শুনলেই আঁতকে উঠে কাউকে একঘরে করে না কেউ। এত দিন পর সেই প্রচণ্ড মানসিক চাপের সময়কার কথা জানতে চাই অধ্যাপক ওয়াদুদ চৌধুরীর কাছে। তিনি বলেন, মহামারির শুরুতে সারা বিশ্বেই সবাই আতঙ্কগ্রস্ত ছিল। কারণ কি এই ভাইরাস, কেমন করে আক্রমণ করে শরীরে অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ওপর, কীভাবে এর মোকাবিলা করা যায়, কিছুই জানত না কেউ। হঠাৎ ধেয়ে আসা টাইফুনের মতো এই বিপদের মুখোমুখি হয়ে অসহায় বোধ করছিলেন চিকিৎসকেরা। কিন্তু চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সেই বিপদের মুখোমুখি হতে হয়েছিল ভয় জয় করে, সবার আগে। সে জন্য একটা মানসিক চাপ সবার তো ছিলই। কিন্তু আমাদের দেশে এর বাইরে আরও কিছু চাপ ও বৈরিতার সম্মুখীন হতে হয়েছিল স্বাস্থ্যকর্মীদের। স্বাস্থ্য বিভাগের আগাম প্রস্তুতিতে বিশাল ঘাটতি, অবিমৃশ্যকারী আচরণ, সিদ্ধান্তহীনতার মাশুল দিতে হয়েছে তাঁদের। কোনোরকম নিরাপত্তা প্রস্তুতি ছাড়াই মাঠে নেমে প্রথম দিকেই হাজার হাজার চিকিৎসক, নার্স ও তাঁদের স্বজনেরা আক্রান্ত হয়েছেন। কোনো রসদ ছাড়াই যাঁরা যুদ্ধে নামতে বাধ্য হয়েছিলেন, একঘরে হয়েছিলেন, নিগ্রহের শিকার হয়েছিলেন, পরিবার–স্বজনকে দূরে ঠেলে দিয়েছিলেন—তাঁদের স্বীকৃতি তো দূরের কথা, একটা ধন্যবাদও দেয়নি কেউ। আমাদের স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য এটা বাড়তি মানসিক চাপ তো বটেই।

অধ্যাপক ওয়াদুদ চৌধুরী বলেন, ‘দীর্ঘ এই অতিমারির সময় আমি কখনোই নিজের বয়স্ক মাকে স্পর্শ করিনি। তিনি অভিমান করে বলতেন, “কী অপরাধ করেছি আমি যে তুই আমার কাছে আসিস না?” তাঁকে বোঝানো যেত না। আমার সন্তানটিও অসহায়ের মতো দরজার বাইরে ঘোরাঘুরি করত। নিজের আপনজনদের জন্য উৎকণ্ঠা তো ছিলই, বাড়তি চাপ ছিল সমাজ ও রাষ্ট্রের বিরূপ আচরণ। প্রায় দেড় বছর পর আমাকে আবার নিজের কথকতা লিখতে দিলে বলব, এই মহামারি থেকে যেন আমরা শিক্ষা নিই। নিজের ভুল স্বীকার করা, ভুল শোধরানো আর অপরের কাজের স্বীকৃতি দেওয়ার সংস্কৃতিতে যেন আমরা অভ্যস্ত হয়ে উঠি।’

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্যকর্মীদের কোভিডকালীন মানসিক চাপ ও বার্ন আউটের ওপর একটি জাতীয় জরিপের ফলাফল ল্যানসেট সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে। প্রায় ২০ হাজারের ওপর স্বাস্থ্যকর্মীর ওপর জরিপের এই ফলাফলে বলা হয় যে ৬১ শতাংশ চিকিৎসক, নার্স নিজেদের পরিবারের সদস্যদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিয়ে চূড়ান্ত রকমের ভীতি, আশঙ্কা ও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগেছেন, ৩৮ শতাংশ আক্রান্ত হয়েছেন অতি-উদ্বেগ ও বিষণ্নতায়, ৪৩ শতাংশ বাড়তি কাজের চাপের শিকার, আর ৪৯ শতাংশ বার্ন আউটের শিকার। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যে এই গবেষণায় দেখা গেছে, পুরুষদের তুলনায় নারীরা বেশি পরিমাণে মানসিক চাপের মুখোমুখি হয়েছেন। পরিবার ও সন্তানের সুরক্ষা নিয়ে দুশ্চিন্তা, উদ্বেগ বা অ্যাংজাইটি, ডিপ্রেশন, বার্ন আউট নারী স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে বেশি দেখা গেছে। আশ্চর্যের বিষয়, নারী স্বাস্থ্যকর্মী ও চিকিৎসকদের তুলনায় পুরুষ স্বাস্থ্যকর্মীরা প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি ও সম্মান পেয়েছেন বেশি!

কোভিড অতিমারি আমাদের অনেক বৈষম্য, অনেক মানসিক দৈন্য, অনেক দুর্নীতির মুখোশ উন্মোচন করেছে। আয়নায় নিজেদের মুখোমুখি দাঁড় করাতে শিখিয়েছে। একই সঙ্গে সমাজে আমাদের অবস্থান, দায়দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধের জায়গাটুকু চিনতে শিখিয়েছে। এই দুঃসময় থেকে যেন আমরা শিক্ষা নিতে পারি। বার্ন আউট বা মানসিক চাপ, কি হতাশা—সব কাটিয়ে আমরা যেন আবার সুস্থ স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারি।

স্বাস্থ্যকর্মীদের বার্ন আউট ও মানসিক চাপ মোকাবিলায়

  • মৌলিক চাহিদাকে গুরুত্ব দিন। সঠিক সুষম খাবার, বিশ্রাম ও যথেষ্ট ঘুমের দিকে নজর দিন।

  • কর্মঘণ্টার ওপর নজর রাখুন। অতিরিক্ত শ্রমঘণ্টা থেকে বিরত থাকুন। কারণ, এতে কোনো পক্ষেরই লাভ হয় না, কাজে ভুলভ্রান্তি হয়। কর্তৃপক্ষের এদিকে নজর দিতে হবে।

  • কাজের ফাঁকে স্বাস্থ্যকর বিরতি নিন। স্বাস্থ্যকর নাশতা, স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ, বন্ধু বা সহকর্মীর সঙ্গে আনন্দময় সময় কাটানোর চেষ্টা করুন।

  • কর্তৃপক্ষ, পরিবার ও সমাজের অন্যদের সহানুভূতি, সহযোগিতা জরুরি। কাজের স্বীকৃতি দরকার।

  • অতিরিক্ত মানসিক চাপ, বিপন্নতাবোধ, ইনসমনিয়া, ক্লান্তি অবসাদে ভুগলে সাহায্য নিতে দেরি করবেন না। প্রয়োজনে মনোরোগবিদের সাহায্য নিন।

তথ্যসূত্র: আমেরিকান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন

প্র স্বাস্থ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন