default-image

শঙ্কা আর বিভীষিকাময় বছরের শেষটা যেন আশার আলো দেখাচ্ছিল। তাই তো গত ডিসেম্বরে প্রথম করোনার টিকা মানবদেহে প্রয়োগের অনুমতি মেলার পর সারা বিশ্বের মানুষ যেন স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছিল। যুক্তরাজ্যে কোভিড-১৯–এর টিকা প্রয়োগ শুরু হয় গত ৮ ডিসেম্বর। ঠিক চার দিন পরই দেশটির সরকার ঘোষণা করে ভাইরাসের এক নতুন ধরন বা নিউ ভ্যারিয়েন্ট ছড়িয়ে পড়ছে, যা কিনা আগের চেয়ে ৫০-৭০ শতাংশ সংক্রমণ ছড়াতে সক্ষম। এই দুঃসংবাদ কেবল যুক্তরাজ্যের অধিবাসীদের জন্যই নয়, সারা বিশ্বের জন্যই উদ্বেগের।

গত বছর মার্চে যখন কোভিড-১৯ মহামারি যুক্তরাজ্যে ছড়িয়ে পড়ে, তখন দেশজুড়ে লকডাউন ঘোষণা করা হয়। পাশাপাশি কোভিড-১৯–এ আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা, ফিল্ড অ্যাম্বুলেন্স, নতুন হাসপাতাল তৈরি, টিকা তৈরির জন্য আর্থিক সহায়তা এবং ভাইরাসের গতিবিধ পর্যবেক্ষণের জন্য কোভিড-১৯ জেনোমিকস ইউকে কনসোর্টিয়াম (সিওজি ইউকে) গঠিত হয়। এটি এ পর্যন্ত যুক্তরাজ্যে কোভিডে আক্রান্ত ১ লাখ ৭৯ হাজার ব্যক্তির পূর্ণ জিন নকশা (জিনোম সিকোয়েন্স) কাজ সম্পন্ন করেছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ইংল্যান্ডের জনস্বাস্থ্য বিভাগ গত ২১ ডিসেম্বর এই নতুন ধরনের ভাইরাস সম্পর্কে বিশ্ববাসীকে অবহিত করে। সত্যি বলতে কি, অক্টোবর থেকেই বিজ্ঞানীরা ভাইরাসটির বৈশিষ্ট্যের পরিবর্তন লক্ষ করতে শুরু করেছিলেন। তখন থেকেই গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছিল।

বিজ্ঞাপন

নভেম্বরে যুক্তরাজ্যে আবার লকডাউন কার্যকর করা হলে সংক্রমণের হার কিছুটা কমলেও দেখা যাচ্ছিল যে কেন্ট এবং দক্ষিণ–পূর্ব লন্ডনে অস্বাভাবিকভাবে সংক্রমণ বেড়ে যাচ্ছিল। এই এলাকাগুলোর আক্রান্ত মানুষের নমুনা সংগ্রহ করে জিনোম সিকোয়েন্সের ফলাফল দেখে একে করোনাভাইরাসের নতুন ধরন হিসেবে শনাক্ত করা হয়, যার নাম দেওয়া হয় সার্স–কোভ–২ লিনেজ বি ১.১.৭ (SARS-Cov 2 Linege B.1. 1.7)।

ভাইরাসের জিনে যখন পরিবর্তন হয়, তখন তাকে ‘মিউটেশন’ বা রূপান্তর বলা হয়। সব ভাইরাসই কিছু না কিছু রূপান্তর ঘটিয়ে চলে। রূপান্তর হওয়া মানেই যে ভাইরাসটি বিপজ্জনক হবে, তা কিন্তু নয়। তবে যখন কোনো রূপান্তরের কারণে একটি ভাইরাস দ্রুত সংক্রমণ ছড়ায় বা অধিকতর আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে, তখন বিজ্ঞানীরা এ সম্পর্কে সতর্ক করে থাকেন। দেখা যাচ্ছে, করোনাভাইরাসটির ৩০ হাজার নিউক্লিওটাইডের মধ্যে মাত্র ২৩টির মিউটেশন ঘটার কারণে এই নতুন ধরনের ভাইরাসটি আগেরটির তুলনায় বেশি সংক্রমণ ছড়াতে সক্ষম।

যে ২৩টি রূপান্তর ঘটেছে, তার ৮টি হয়েছে আউটার স্পাইক প্রোটিনে, ৯টি হয়েছে অ্যামিনো অ্যাসিডে, বাকি ৬টি অন্যান্য স্থানে। যুক্তরাজ্য ছাড়াও পৃথিবীর আরও চারটি দেশে এই নতুন ধরনের ভাইরাসের সংক্রমণ পাওয়া গেছে।

করোনার নতুন ধরন যতটা ঝুঁকিপূর্ণ

নতুন ধরনের করোনাভাইরাস আগের চেয়ে ৫০-৭০ শতাংশ বেশি সংক্রমণ ছড়াচ্ছে। ফলে বর্তমানে যুক্তরাজ্যে প্রতিদিন ৫০ হাজারের বেশি মানুষ আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে। লন্ডনের কিছু কিছু এলাকায় প্রতি পাঁচ জনে একজন মানুষ কোভিডে আক্রান্ত হচ্ছেন। বয়স্ক ও স্বাস্থ্যগতভাবে ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের পাশাপাশি ১৫ বছরের কম বয়সী ছেলেমেয়েরাও বেশি আক্রান্ত হচ্ছে নতুন ধরনের ভাইরাসে।

এই নতুন ধরনের ভাইরাসে সংক্রমণে মৃত্যুঝুঁকি বেশি কি না, তা বলার সময় এখনো আসেনি। তবে এর সংক্রমণে ‘ভাইরাল লোড’ (আক্রান্ত ব্যক্তির রক্তে ভাইরাসের পরিমাণ) অনেক বেশি। আগের ভাইরাসটির গড় ভাইরাল লোড ছিল ১০ শতাংশ, আর এই ভাইরাসের গড় ভাইরাল লোড প্রায় ৩০ শতাংশ।

শনাক্ত হবে কীভাবে

প্রচলিত পিসিআর পরীক্ষায় করোনাভাইরাসের তিনটি গাঠনিক প্রোটিনকে লক্ষ করা হয়। এর মধ্যে একটি হলো সারফেস প্রোটিনের ‘এস জিন’। নতুন ধরনের ভাইরাসের ৬৯/৭০ পজিশনে রূপান্তর ঘটার কারণে এই ‘এস জিন’ শনাক্ত করা প্রচলিত পরীক্ষায় সম্ভব হচ্ছে না। ফলে করোনাভাইরাসের আরটি পিসিআর পজিটিভ কিন্তু ‘এস জিন’-এর অনুপস্থিতিকে নতুন ধরন হিসেবে ধরে নেওয়া হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

নতুন ভাইরাসের টিকা কি কার্যকর?

অধিকাংশ বিশেষজ্ঞ মনে করেন, অনুমোদিত টিকাগুলো করোনাভাইরাসের নতুন ধরনের বিরুদ্ধেও কার্যকর হবে। যদিও টিকাগুলোর কিছু টার্গেট এলাকায় ভাইরাসটির মিউটেশন বা রূপান্তর হয়েছে। আর যদি টিকা অকার্যকর মনে হয়, তবে সে ক্ষেত্রে আরএনএ ভ্যাকসিন (ফাইজার, মডার্না) ছয় সপ্তাহের মধ্যে নতুন ধরনের টিকা তৈরিতে সক্ষম হবে। আর অক্সফোর্ড অ্যাস্ট্রাজেনেকাও দ্রুততম সময়ে প্রোগ্রামিং পরিবর্তন করে নতুন টিকা তৈরিতে সক্ষম হবে।

নতুন ভাইরাস কেবল যুক্তরাজ্যেই?

জার্মানিভিত্তিক বৈশ্বিক সংস্থা গ্লোবাল ইনিশিয়েটিভ অন শেয়ারিং অল ইনফ্লুয়েঞ্জা ডেটা বলছে, নতুন ভাইরাসটির ‘এন৫০১ওয়াই’ মিউটেশনটি গত বছর এপ্রিলে ব্রাজিলে, জুন জুলাই মাসে অস্ট্রেলিয়ায় আর জুলাই মাসে যুক্তরাষ্ট্রে সংক্রমণ ছড়িয়েছিল। এই নতুন ধরনের ভাইরাসের উৎপত্তি যুক্তরাজ্যে নাকি যুক্তরাজ্য একে শনাক্ত করেছে, তা জানতে আরও অপেক্ষা করতে হবে।

বাংলাদেশে করণীয়

বাংলাদেশ যুক্তরাজ্য থেকে আসা যাত্রীদের বাধ্যতামূলক কোয়ারেন্টিনে রাখছে। কিন্তু এ ভাইরাস অন্য দেশ থেকে প্রবেশ করবে না তা বলা যাবে না। তাই বিজ্ঞানীরা বলছেন, যত দ্রুত যত বেশিসংখ্যক মানুষকে টিকার আওতায় আনা যাবে, ততই মঙ্গল। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ৭০ শতাংশ জনসংখ্যাকে টিকা দিতে সক্ষম হলেই কেবল হার্ড ইমিউনিটি গড়ে তোলা সম্ভব। কিন্তু বিশ্বের সব দেশে এখনো টিকা কার্যক্রম শুরুই হয়নি। তাই সংক্রমণ প্রতিরোধে সর্বাত্মক পদক্ষেপ নেওয়া ছাড়া উপায় নেই।

নতুন ভ্যারিয়েন্টের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে দেশি বিজ্ঞানীরা কগ–ইউকে কনসোর্টিয়াম এবং জিআইএসএইড সার্স কোভ–২–এর জিনগত উপাত্ত সংগ্রহ ও শেয়ার করে নীতিনির্ধারকদের অবহিত করতে পারেন। অন্যান্য দেশের কোভিড পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যালোচনার মাধ্যমে বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলে প্রয়োজনে আরও কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা যেতে পারে।

মন্তব্য করুন