default-image

বাংলাদেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয় গত বছরের ৮ মার্চ। মহামারির দুঃসময়ের প্রায় এক বছর পার করে এখন স্বস্তি অবশ্য এসেছে করোনার টিকা পাওয়ার পর। রক্ষাকবচ পেলেও অনেকের প্রথমে মনে অনেক দ্বিধা থাকলেও এখন ভিড় বাড়ছে টিকা নেওয়ার কেন্দ্রে কেন্দ্রে। আনন্দের কথা। বুঝতে পারা যে সুরক্ষার আবরণে নিজেকে ঢেকে নিলে নিজে শুধু নয়, অন্যরাও বাঁচবেন।

করোনা আর করোনা টিকা নিয়ে অনেকে লিখেছেনও দুই কলম। অনেকে নাতিদীর্ঘ প্রবন্ধ। প্রথম আলোর আনিসুল হক, যাঁর লেখা পেলেই পড়ি আর ওদিকে জীবনমুখী নচিকেতা এবার গান না গেয়ে লিখে ফেললেন কবিতা।

করোনা ছিল মারাত্মক আগ্রাসী রূপে। কিন্তু ধীরে ধীরে যেন সেই ভয় কেটে যাচ্ছে, পরিবেশ যে সবুজ হয়েছিল, বাতাস হয়েছিল দূষণমুক্ত, বুড়িগঙ্গার গাঢ় কালো পানি ধীরে ধীরে ফিরে পাচ্ছিল এর মূল রং, পাখি আর প্রজাপতিরা সব ডানা মেলে উড়ছিল, হয়তো দিঘির নিস্তরঙ্গ জলে যখন পড়ছিল গোধূলির রং, সেই রং মেখে দিঘি অপেক্ষা করছিল কোনো কপোত–কপোতীর জন্য—হঠাৎ সব উধাও।

বিজ্ঞাপন

মানুষ বেরিয়ে এল ঘরের বাইরে বিপুল উৎসাহে— কক্সবাজারের সাগরসৈকত, সিলেটের বিলাসবহুল রিসোর্ট, কুয়াকাটার সূর্যোদয় আর সূর্যাস্ত দেখা—কিছুই না দেখে যেন থাকতে পারছে না মানুষ। টিকা নেওয়ার পর যেন আরও বেশি উচ্ছ্বাস। মনে হচ্ছে যেন স্বাভাবিক জীবন ফিরে পেলাম।

কিন্তু আমাদের বোঝা উচিত, আমরা টিকা নিলেও সবাই এর আওতায় আসিনি। আর তাই আমাদের বর্তমান জীবন নতুন ছাঁচে ঢালতে হবে। খাঁচা থেকে পাখি বেরুলেও তার পা যেন বাঁধা। আকাশ দেখছে, মুক্ত হয়ে উড়ছে, কিন্তু সীমার মধ্যে। তাই কিছু স্বাস্থ্যবিধি, যা মেনে নেওয়ার কথা বলা হয়েছিল, সেগুলো চালিয়ে যেতে হবে। জীবন আর জীবিকাকে সাজাতে হবে নতুন করে, সুরক্ষা মেনে।

হয়তো সময় আসবে, অনেকের টিকা নেওয়া সাঙ্গ হবে। আর কেউ কেউ সংক্রমিত হবেন। বিপুলসংখ্যক লোক টিকার দুটি ডোজ শেষ করবেন। এভাবে একধরনের জনসুরক্ষা একদিন হবে আর তখন আমরা ফিরে যাব আগের জীবনে।

এখনো আমরা টিকা সম্পর্কে সব কথা জানি না। টিকা দিলেও পুনঃসংক্রমণ হয় কি না। টিকা বিস্তার রোধ করে কি না, তা জানার বাকি। আর জনগোষ্ঠীর একাংশ, যেমন ১৮ বছরের নিচে যারা, তারা এখনো টিকা নেবে কি না, তা ঠিক হয়নি। আর অনেকেই আছেন, যাঁদের উপসর্গ নেই অথচ ভাইরাস ছড়াচ্ছেন, তাঁরাও সংখ্যায় কম নন।

তাই টিকার রক্ষাকবচের সঙ্গে স্বাস্থ্যবিধি মানা হবে দ্বিগুণ সুরক্ষা। একটা কথা ঠিক, কোনো টিকাই শতভাগ সুরক্ষা দিতে পারে না। আর কত দিন সুরক্ষা দেবে টিকা, তা এখনো নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। তাই পরামর্শ হিসেবে বলা হচ্ছে, টিকা নিলেও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে।

এ কথা ঠিক, করোনার টিকা নেওয়ার পর শরীরে তৈরি হবে অ্যান্টিবডি, তাই সংক্রমণের আশঙ্কা কমবে, কিন্তু কত দিন সুরক্ষিত থাকবে, তা জানা গেল না এখনো। আমরা জানি না পুনঃসংক্রমণ হবে কি না।

এসব বিষয় স্পষ্ট না হওয়া পর্যন্ত আমাদের মাস্ক পরা, সাবান–পানি দিয়ে হাত ধোয়া, শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা নিশ্চিত করে নিতে হবে জীবনের স্থায়ী সব আচরণ।

ভ্যাকসিন নিলেও যে মাস্ক বাধ্যতামূলক, তা বুঝতে পারছেন না অনেকে। টিকা এসে গেছে আর মাস্ক কী দরকার, এমন সব উত্তর মাস্ক না পরে আসা লোকদের। দোকানে–বাজারে ক্রেতা–বিক্রেতা অনেকের মুখে–নাকে মাস্ক নেই, নেই মাস্ক সমুদ্রসৈকতে বেড়াতে আসা বিপুলসংখ্যক পর্যটকদের। তাঁরা যেমন বিপদে পড়ছেন, অন্যদেরও ফেলছেন, এমন ধারণা কম লোকের। দেশের বিপুলসংখ্যক লোকের টিকা নেওয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত এমন ব্যবস্থা চালাতেই হবে। আমরা অনেকেই টিকার আওতায় আসতে পারছি না, টিকার সরবরাহ প্রচুর নয়। আর টিকা নিয়ে জনসুরক্ষা হবে একদিন আর আমরা হয়তো মুক্ত বলাকা হয়ে মেলে দেব পাখা ওই দূর নীল আকাশে, এর আগে নয়।

বিজ্ঞাপন

গবেষণা হচ্ছে, কত দিন সুরক্ষা দেবে, কতজন টিকা নিলে জনসুরক্ষা হবে, তা অজানা। তাই আমাদের ঝুঁকি না নিয়ে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। বৈজ্ঞানিক এসব তথ্য আর যুক্তি মাথায় থাকল। আমরা মাস্ককে পরিধেয় বস্ত্রের একটি অংশ হিসেবে নিলে একটি নতুন ফ্যাশন হবে, এভাবে ভাবলে মন্দ কী। অনেকে বেশ ম্যাচিং করে মাস্ক পরছেন, মন্দ লাগছে না। নতুন ক্রেজ হতে পারে তা।

আর যাঁরা পূর্ণমাত্রায় টিকা নেবেন, তাঁরা করোনাতে আক্রান্তদের দেখভাল করার কাজ আরও নির্ভয়ে করতে পারবেন, তবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে।

শারীরিক দূরত্ব মেনে চলুন। দেখুন এই নতুন জীবনশৈলী চালিয়ে যেতে কেমন লাগে। একপলকে একটু দেখা, বেশি হলেও ক্ষতি নেই। দেহভঙ্গিতে মনের কথা প্রকাশ। অনেক কথা যান না বলে কোনো কথা না বলে। আর বললেও উচ্চ স্বরে না বলে ভঙ্গিতে হোক না ভাবের প্রকাশ। আলিঙ্গন থাক না অধরা। জমা থাক আগামী দিনের জন্য।

এই সাময়িক সংযমে আছে অন্য রকম আনন্দ অনুভব। বিজ্ঞানীরা বলেই দিয়েছেন, টিকা নিলেন মানে বড় জনসমাবেশে যাবেন তা নয়, ভিড়ে যাবেন তা নয়। রেস্তোরাঁ, কনসার্ট, ভ্রমণে এখন চাই বিধিনিষেধ।

জনসুরক্ষা না হওয়া পর্যন্ত এটুকু মেনে নিতেই হবে আমাদের।

আর গর্ভবতী, শিশুকে স্তন্যদুগ্ধ পান করানো মা, ১৮ বছরের নিচে যারা, তারা এখনো রয়ে গেল টিকার বাইরে। আর অনেকেই আছেন উপসর্গহীন, তাই সমাবেশে গেলে যে কেউ হতে পারেন ভাইরাসের উৎস, আর সে জন্য পুরো সুরক্ষার গ্যারান্টি নেই।

টিকা নিয়ে সুরক্ষার প্রথম পাঠ হলো, কিন্তু আরও আছে অনেক দূর যাওয়া। আর যখন আবার আগের জীবনে ফিরে যাব, এত দিন চলুক না মাস্ক পরে, হাত ধুয়ে দূরে দূরে থেকে জীবন। একধরনের অ্যাডভেঞ্চার হিসেবেই নিন। জীবনের অভিজ্ঞতা বিচিত্রই হয়।

প্র স্বাস্থ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন