default-image

ক্ষুধামান্দ্য, বমিভাব, বমি, পায়ে পানি আসা, প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়া কিংবা অনিয়ন্ত্রিত রক্তচাপের মতো কোনো একটি সমস্যা দিয়ে শুরু। অথবা দুর্বল অনুভব করা, নিজেকে বিবর্ণ দেখানোর মতো ‘মৃদু’ কোনো সমস্যায় ভোগা। অথচ পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জানা যায়, কিডনির সমস্যার কথা। কিডনি রোগের মুশকিলটা এখানে। উপসর্গগুলো অত প্রকট নয় আর রুটিন চেকআপ ছাড়া শনাক্ত করা কঠিন।

কিডনির সমস্যা ধরা পড়লে শঙ্কিত হওয়ারই কথা। কিডনি মানুষের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের একটি। কিডনির রোগ মানেই কিন্তু জীবনের সবকিছু শেষ হয়ে যাওয়া নয়। কিডনির সমস্যা হলেই ডায়ালাইসিস দরকার হবে কিংবা একবার ডায়ালাইসিস লাগলে প্রত্যেকেরই আজীবন ডায়ালাইসিস করাতে হয়, বিষয়গুলো এমনও নয়।

কিডনি রোগ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য জানা থাকলে কিডনি রোগ প্রতিরোধ করতে সচেষ্ট হওয়া যায়। আর যিনি এরই মধ্যে কিডনির জটিলতায় ভুগছেন, তিনি এ রোগকে সঙ্গে নিয়েই ভালোভাবে বেঁচে থাকার উপায় জানতে পারবেন।

বিজ্ঞাপন

রোগের ধরন-ধারণ

কিডনির রোগ মূলত দুই ধরনের। একটি হলো আকস্মিক কিডনির সমস্যা, অন্যটি দীর্ঘমেয়াদি কিডনির সমস্যা। আকস্মিক কিডনি সমস্যা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই পুরোপুরি নিরাময় হয়ে যায়, মাত্র ৫ থেকে ১০ শতাংশ রোগী পরবর্তী সময়ে দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগে ভুগতে পারেন। তবে কোনো কারণে দীর্ঘমেয়াদি কিডনির সমস্যা হলে তা পুরোপুরি নিরাময় করা সম্ভব নয়। কিন্তু রোগকে নিয়ন্ত্রণে রেখে ভালো থাকা সম্ভব, ভালোভাবে বাঁচা সম্ভব, অন্যান্য মানুষের মতোই সক্রিয় থাকা সম্ভব।

এসবই সম্ভব হবে রোগের অগ্রসর হওয়ার গতিকে (অর্থাৎ, রোগের জটিলতা বাড়ার হারকে) অনেকটা কমিয়ে আনার মাধ্যমে। এর জন্য প্রয়োজন বেশ কিছু বিষয়ে সচেতন ও সতর্ক থাকা।

সব কিডনি রোগীরই কিন্তু ডায়ালাইসিস বা কিডনি প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন পড়ে না। তবে দীর্ঘমেয়াদি কিডনির সমস্যায় ভুগতে থাকা রোগীর যখন কিডনির সক্ষমতা ন্যূনতম বা শেষ পর্যায়ে নেমে আসে, তখন ধরে নিতে হবে আজীবন তাঁকে ডায়ালাইসিস নিতে হবে কিংবা কিডনি প্রতিস্থাপন করতে হবে।

যাঁদের হতে পারে কিডনির রোগ

অনিয়ন্ত্রিত ও দীর্ঘদিনের ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপ, কিডনির প্রদাহ (যার কারণে প্রস্রাবের সঙ্গে আমিষ নিঃসৃত হয়) কিংবা মূত্রপ্রবাহে বাধা সৃষ্টিকারী কোনো সমস্যা থাকলে কিডনির রোগ হতে পারে। জন্মগত কিছু সমস্যার কারণেও এ রোগ দেখা দেয়। একজন সুস্থ ব্যক্তি, যাঁর আগে থেকে কিডনির সমস্যা নেই, তাঁর হঠাৎ প্রচণ্ড বমি বা পাতলা পায়খানা হলে কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, যদি তিনি বমি বা পায়খানার সঙ্গে বেরিয়ে যাওয়া পানি ও লবণের প্রতিস্থাপন না করেন। প্রায়ই যাঁরা ব্যথার ওষুধ সেবন করেন, তাঁদেরও কিডনির সমস্যা হতে পারে। অতিরিক্ত আমিষজাতীয় খাবার গ্রহণের কারণেও কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

কিডনি রোগীর জীবনধারা

আমাদের চারপাশে কিডনি রোগীর সংখ্যা অনেক। বিশেষ করে ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপজনিত কিডনি সমস্যায় অনেকেই ভুগছেন। শুরু থেকে সচেতনভাবে জীবন যাপন করলে এই কিডনি সমস্যা জটিলতর পর্যায়ে যাওয়া থেকে প্রতিরোধ করা যায়। আজীবন সুস্থ থাকা যায় কিডনির রোগ নিয়েই।

খাবারদাবারের বেলায় কিডনি রোগীকে হতে হবে খুব সচেতন। দীর্ঘমেয়াদি কিডনির সমস্যায় পানি, লবণ এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে আমিষজাতীয় খাবারের পরিমাণ নির্ধারণ করে দেওয়া হয় প্রতিদিনের জন্য। নির্ধারিত পরিমাণ আমিষের কতটা প্রাণীজ, কতটা উদ্ভিজ্জ আমিষ হতে হবে, সেটিও নির্দিষ্ট করা থাকে। ক্ষেত্রবিশেষে উচ্চ পটাশিয়ামযুক্ত কিছু ফল কম পরিমাণে খেতে বলা হয় এবং কারও ইউরিক অ্যাসিড বেড়ে যাওয়ার প্রবণতা থাকলে লাল মাংস, কলিজা, মগজ, সামুদ্রিক মাছ প্রভৃতি খাবার খেতে নিষেধাজ্ঞা থাকে। আপনার কিডনির সমস্যার ধরন অনুযায়ী আপনার জন্য যে খাদ্যতালিকা নির্ধারিত, সেটি মেনে চলুন। সবারই যে সব ধরনের খাদ্য নিষেধ, তা কিন্তু নয়।

বিজ্ঞাপন

শরীরচর্চা করুন নিয়মিত

নিয়মিত শরীরচর্চার কোনো বিকল্প নেই। অন্য ব্যায়াম করতে না পারলেও অবশ্যই হাঁটুন রোজ। ওজন রাখুন নিয়ন্ত্রণে। নিয়মিত পরীক্ষা করান রক্তচাপ ও রক্তের সুগারের মাত্রা। কিডনি সুস্থ রাখতে হলে অবশ্যই রক্তচাপ ও রক্তের সুগার সুনিয়ন্ত্রিত থাকতে হবে। ধূমপান ও অ্যালকোহল অবশ্যই বর্জনীয়। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ব্যথার ওষুধ বা অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করবেন না কখনোই। নিয়মিত কিডনির সক্ষমতার নানা পরীক্ষা–নিরীক্ষা করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ রাখুন।

সুস্থ থাকুন, প্রতিরোধ করুন

কিডনি রোগ প্রতিরোধে চাই সুস্থ জীবনধারা। সুষম খাদ্যাভ্যাস জরুরি। কোনো পুষ্টি উপাদান বেশিও গ্রহণ করবেন না, আবার কমও নয়। একজন সুস্থ, পূর্ণবয়স্ক ব্যক্তির দৈনিক আমিষজাতীয় খাবার গ্রহণের পরিমাণ হওয়া উচিত শরীরের প্রতি কেজি ওজনের জন্য প্রতিদিন ১ গ্রাম করে আমিষ (গর্ভাবস্থায় একটু বেশি)।

নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম আবশ্যক। উচ্চ রক্তচাপ কিংবা ডায়াবেটিস থাকলে অবশ্যই তা নিয়ন্ত্রণে রাখুন। আর একটা বিষয়, ৪০ বছর বয়সের পর কিডনির কর্মক্ষমতা স্বাভাবিকভাবেই একটু একটু করে কমতে থাকে। ব্যথার ওষুধ যতটা সম্ভব কম সেবন করবেন।

হঠাৎ বমি বা পাতলা পায়খানা হলে দ্রুত স্যালাইন খেয়ে পানিশূন্যতা পূরণ করবেন। না হলে কিডনি বিকল হওয়ার ঝুঁকি থাকে। স্যালাইন খেতে না পারলে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে শিরাপথে স্যালাইন নেওয়ারও প্রয়োজন হতে পারে।

চল্লিশের পর কোনো শারীরিক সমস্যা না থাকলেও প্রতিবছর কিডনির অবস্থা বোঝার জন্য প্রাথমিক পরীক্ষা (সেরাম ক্রিয়েটিনিন, প্রস্রাবের রুটিন মাইক্রোস্কপিক পরীক্ষা এবং রক্তের সুগার) করিয়ে নিন। নিয়মিত রক্তচাপ মাপবেন। মদ ও ধূমপান সবার জন্যই বর্জনীয়।

অনুলিখন: ডা. রাফিয়া আলম

প্র স্বাস্থ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন