বছরের শুরু থেকে করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে আক্রান্ত মানুষের মৃত্যুহার বেড়েই চলেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, জানুয়ারি মাসে দেশে করোনার নতুন ধরন বাংলাদেশে পাওয়া গেছে। যুক্তরাজ্যে করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের কারণ হিসেবে করোনার পরিবর্তিত রূপ, যাকে ‘ইউকে স্ট্রেইন’ বলা হচ্ছে, যা বিদ্যমান করোনার ধরনের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি সংক্রামক ও ক্ষতিকারক।

বিশ্বব্যাপী কোভিড-১৯ ভাইরাসের অনেক জেনেটিক ভ্যারিয়েন্ট বা জিনগত ধরন বর্তমানে বিস্তার করেছে। এগুলোর মধ্যে তিনটি যুক্তরাজ্য, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং ব্রাজিলীয় ধরনকে ‘ভ্যারিয়েন্ট অব কনসার্ন’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ভাইরাসের স্পাইক প্রোটিনে পরিবর্তন এসেছে এবং এই পরিবর্তিত রূপ নির্ণয় করতে প্রয়োজনীয় প্রাইমারের নকশা পরিবর্তন করতে হবে। কারণ, বর্তমানে ব্যবহৃত যে প্রাইমার রয়েছে, তা দ্বারা ভাইরাসের স্পাইক প্রোটিনের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করা যায় না। এর ফলে নতুন আক্রান্ত রোগীদের আরটি পিসিআর পরীক্ষার ফল নেতিবাচক (নেগেটিভ) হলেও বুকের এক্স-রে করে দেখা যায়, ফুসফুসের অনেকাংশই সংক্রমিত হয়েছে। এ কারণে এখন পিসিআর পরীক্ষায় কোভিড নেগেটিভ হলেই আর নিশ্চিন্ত থাকা যাচ্ছে না।

default-image
বিজ্ঞাপন

তবে ‘থ্রি-জিন পিসিআর’ ইউকে স্ট্রেইন শনাক্ত করতে সক্ষম। বর্তমান পরীক্ষাপদ্ধতির দ্বারা নতুন স্ট্রেইনে সংক্রমিত ব্যক্তির সংখ্যা ঠিক খুঁজে পাওয়া মুশকিল।

পিসিআর বলতে পলিমারেজ চেইন বিক্রিয়া বোঝায়, যা ভাইরাসের জিন বা জিনোম সম্প্রসারণের সঙ্গে জড়িত। সার্স-কোভিড-২ একটি আরএনএ ভাইরাস, যা ডিএনএতে বিপরীতভাবে প্রতিলিপি হয় এবং তারপরে প্রাইমার নামের রিএজেন্ট ব্যবহার করে প্রসারণ করা হয়। প্রাইমারগুলো নির্দিষ্ট জিনোম ক্রমের জন্য নির্দিষ্ট। যদি এই প্রাইমারের সঙ্গে সামঞ্জস্য অনুক্রমের কোনো রূপান্তর ঘটে, তবে আরটি পিসিআর পদ্ধতিটি কাজ করবে না। পিসিআর পদ্ধতিটি এখনো নতুন স্ট্রেইনের জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে, তবে তার জন্য পরিবর্তিত অনুক্রমের জন্য আমাদের নতুন প্রাইমারের নকশা করা দরকার। ইউকে স্ট্রেইনের জন্য আমাদের ‘থ্রি-জিন টার্গেট’ পিসিআরের মতো শক্তিশালী পদ্ধতি শুরু করতে হবে।

জিনোম সিকোয়েন্স বা জিন–নকশা বের করে ভাইরাসের জেনোমিক ভ্যারিয়েন্ট শনাক্ত করা সম্ভব। তবে একটি নমুনা থেকে নতুন স্ট্রেইনের জিনোম সিকোয়েন্স করতে ১০ দিনের মতো সময় লেগে যায়। বর্তমান অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে করোনায় আক্রান্ত লাখ লাখ নমুনা থেকে জিনোম সিকোয়েন্সিং সময়সাপেক্ষ এবং ব্যয়বহুল হয়ে যাবে। নমুনা শনাক্তের পাশাপাশি যদি একসঙ্গে ভ্যারিয়েন্ট শনাক্ত করা সম্ভব হয়, তবে এর বিস্তার রোধ করা সম্ভব।

তবে ইউকে স্ট্রেইন বা নতুন যেকোনো স্ট্রেইন আমাদের অবাধ চলাফেরা ও আবহাওয়াজনিত কারণে সংক্রমণের হার দেশে বাড়িয়ে দিয়েছে কি না, তা বৈজ্ঞানিক তথ্য ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। বাংলাদেশে ১১৮টি কেন্দ্রে পিসিআর পরীক্ষার সুযোগ রয়েছে, সেখানে ‘ট্রিপল জিন সার্স কোভিড-২ পিসিআর কিট’ দিয়ে দ্রুত সময়ে নিরীক্ষণ সম্ভব। পরবর্তীকালো এসব রোগীর জিনোম সিকোয়েন্সও করা সম্ভব। কন্টাক্ট ট্রেসিং করে তাদের সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের আইসোলেশনে রাখা গেলে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে। আমাদের দেশে যাঁরা দক্ষ মাইক্রোবায়োলজিস্ট রয়েছেন, তাঁরা এ মহামারি প্রতিরোধযুদ্ধে সহায়তা করতে পারেন।

এ ছাড়া দেশে করোনার অ্যান্টিজেন পরীক্ষা শুরু করা হয়েছে। অ্যান্টিজেন পরীক্ষার সংবেদনশীলতা আরটি-পিসিআরের থেকে অনেক কম হলেও গত কয়েক মাসে গবেষণায় এটা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে উইক পজিটিভ পিসিআর ফলাফল হলে সেসব নমুনায় সক্রিয় ভাইরাস থাকার আশঙ্কা কম।

মুখের মাস্ক ইউকে স্ট্রেইনসহ যেকোনো স্ট্রেইনকে প্রতিরোধ করতে পারে। ‘নো মাস্ক, নো সার্ভিস’–এর মতো ‘নো মাস্ক, নো মুভমেন্ট’ আইন প্রণয়ন ও প্রচার জরুরি। মাস্ক পরা ছাড়া কোনো মানুষ যাতে ঘরের বাইরে যেতে না পারে, সে জন্য প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।

বিজ্ঞাপন
প্র স্বাস্থ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন