default-image

গত কয়েক দশকে শিশুমৃত্যুর হার রোধে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ অর্জন রয়েছে। এই অর্জন আর্থসামাজিক অবস্থা ও জীবনমানের দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক। তবে বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভে ২০১৭-১৮–এর তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রতিবছর পাঁচ বছরের কম বয়সী ১ লাখ ৩৫ হাজারের বেশি শিশুর মৃত্যু ঘটে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন করতে হলে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) অংশ হিসেবে এই মৃত্যুর হার কমিয়ে আনা জরুরি।

শিশুমৃত্যুর অন্যান্য কারণের তুলনায় নিউমোনিয়ার কারণে শিশুমৃত্যু কমে আসার হার তুলনামূলক কম। বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮৯-৯৩ সময়ে নিউমোনিয়ার কারণে মৃত্যুর হার ছিল ২৭ শতাংশ, যা ২০১৭ সালে ১৮ শতাংশ অর্থাৎ নিউমোনিয়ার কারণে এখনো পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুর মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় ২৪ হাজার। এ ক্ষেত্রে সেবাগ্রহীতা ও সেবাদাতা—উভয় দিকেই চ্যালেঞ্জ রয়েছে। ইউনিসেফের মাল্টিপল ইনডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে ২০১৯–এর তথ্য অনুযায়ী, নিউমোনিয়ার লক্ষণযুক্ত শিশুদের ৪৬ শতাংশকে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে বা এ বিষয়ে দক্ষ সেবাদাতার কাছে পরামর্শের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। নিউমোনিয়ার লক্ষণ রয়েছে, এমন পাঁচ বছরের কম বয়সী ৬৩ শতাংশ শিশুকে চিকিৎসা হিসেবে অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয়। সেবাকেন্দ্রগুলোতে এ রোগের চিকিৎসায় প্রস্তুতির ঘাটতি রয়েছে। এ রোগের মোকাবিলায় এখনো যথাযথ উদ্যোগ ও অর্থায়নের ঘাটতি রয়েছে। অর্থাৎ এ রোগ প্রতিরোধের ক্ষেত্রে পরিবারের সচেতনতার ঘাটতি থেকে শুরু করে উপযুক্ত স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতি পর্যন্ত নানাবিধ প্রতিকূলতা রয়েছে। নিউমোনিয়ার সঙ্গে লড়াইয়ে এখন পর্যন্ত আমাদের সাফল্য যথেষ্ট নয়। এ ব্যাধি এখনো পরিবার, সমাজ ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর একটি বড় চাপ। নিউমোনিয়া রোগ প্রতিরোধ, প্রতিকার, নির্ণয় ও উপযুক্ত চিকিৎসার জন্য সহযোগীদের মধ্যে পারস্পরিক সমন্বয় এবং সহযোগিতার দরকার।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ সরকার ১৯৯৮ সালে সমন্বিত শিশু চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা (ইন্টিগ্রেটেড ম্যানেজমেন্ট অব চাইল্ডহুড ইলনেস-আইএমসিআই) কৌশল গ্রহণ করে। ২০১৪ সালের মধ্যে সব জেলা ও উপজেলাকে এই সেবার আওতায় আনা হয়েছে। জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন পর্যায়ে আইএমসিআই কর্নারে প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীরা এই সেবা দিয়ে থাকেন। কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতেও আইএমসিআইয়ের সেবা দেওয়া হচ্ছে। চতুর্থ হেলথ পপুলেশন নিউট্রিশন সেক্টর প্রোগ্রামে (২০১৭-২০২২) আইএমসিআই কার্যক্রমে বিদ্যমান সুবিধাদিকে আরও জোরদার করে এবং নতুন কৌশল উদ্ভাবনের মাধ্যমে এই সেবার মান বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে।

নিউমোনিয়া মোকাবিলা খুব কঠিন বা ব্যয়বহুল নয়। এ সমস্যার সমাধান জানা রয়েছে এবং তা সহজলভ্যও। মৃত্যুর ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের সুরক্ষায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফ ২০০৯ ও ২০১৩ সালে নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়া মোকাবিলায় সমন্বিত গ্লোবাল অ্যাকশন প্ল্যান প্রকাশ করে। নিউমোনিয়া প্রতিরোধে অর্জন বিচারের সুনির্দিষ্ট সূচক রয়েছে: মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবার মাধ্যমে শিশুদের সুরক্ষা, টিকা কর্মসূচির মাধ্যমে শিশুদের মধ্যে নিউমোনিয়া প্রতিরোধ এবং নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিকসহ যথাযথ চিকিৎসা প্রদান। দুর্ভাগ্যজনকভাবে নিউমোনিয়ায় অনেক শিশুই মারা যাচ্ছে, যা সহজে ও কম খরচেই ঠেকানো যেত। নিউমোনিয়ার সঙ্গে দারিদ্র্য অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত। গ্রাম ও শহরের বস্তিগুলোর পরিবারের শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। এসব শিশু সাধারণত অপুষ্টির শিকার, টিকা কর্মসূচির বাইরে থাকে এবং সময়মতো রোগনির্ণয় ও সঠিক চিকিৎসার সুযোগ
পায় না।

২০২০ সালে কোভিড-১৯ অতিমারির কারণে শিশুরা চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে। এই মহামারির কারণে শিশুদের স্বাস্থ্যের ওপর বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে। ১১৮টি স্বল্প ও মধ্যম আয়ের দেশের ওপর জনস হপকিনস ব্লুমবার্গ স্কুল অব পাবলিক হেলথের এক গবেষণায় আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়, স্বাভাবিক স্বাস্থ্যসেবা বিঘ্নিত হওয়ার কারণে পরবর্তী ছয় মাসে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুর মৃত্যু স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে ১২ লাখ বেশি ঘটবে এবং শিশুদের মধ্যে অপুষ্টি বাড়বে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ, গ্যাভি ও সাবিন ভ্যাকসিন ইনস্টিটিউটের তথ্য থেকে দেখা গেছে, লকডাউনের সময় অন্তত ৬৮টি দেশে স্বাস্থ্যসেবা বিঘ্নিত হয়েছে এবং এ জন্য টিকা কর্মসূচি বাধাগ্রস্ত হওয়ার কারণে এক বছরের কম বয়সী প্রায় ৮ কোটি শিশু রোগের শিকার হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে। নিউমোনিয়ার ঝুঁকি মোকাবিলায় দুর্বল দেশগুলোর শিশুরা কোভিড-১৯ মহামারির কারণে বাড়তি ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। এ কারণে প্রতিরোধযোগ্য রোগ মোকাবিলায় গত কয়েক দশকের অর্জন ভেস্তে যেতে পারে। তাই শিশুদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে নিউমোনিয়ায় মৃত্যু প্রতিরোধকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

বাংলাদেশে সেভ দ্য চিলড্রেন দীর্ঘদিন ধরে নিউমোনিয়ার কারণে শিশুমৃত্যু কমাতে কাজ করছে, যার সামগ্রিক লক্ষ্য কোনো শিশু তাদের পঞ্চম জন্মদিনের আগে নিউমোনিয়া এবং অন্যান্য প্রতিরোধযোগ্য কারণগুলো থেকে মারা না যায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেভ দ্য চিলড্রেন এই চ্যালেঞ্জকে একসঙ্গে মোকাবিলায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নেতৃত্বে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ, চিকিৎসক, পেশাদার সংগঠন, গবেষক, উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে বৃহত্তর অংশীদারি গড়ে তুলেছে।

বিশ্ব নিউমোনিয়া দিবস ২০২০ উপলক্ষে সেভ দ্য চিলড্রেন ও ইউনিসেফ যৌথভাবে ঢাকায় প্রথম আলোর সঙ্গে একটি ভার্চ্যুয়াল গোলটেবিল আলোচনার আয়োজন করে। গোলটেবিলে বিশেষ করে কোভিড-১৯ মহামারির সময়ে শিশুদের নিউমোনিয়ার নানা প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা করা হয়। আলোচনা থেকে এটি স্পষ্ট যে নিউমোনিয়া মোকাবিলায় নীতিমালা ও স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর দিক দিয়ে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। আলোচকদের সবাই শিশুদের সুরক্ষায় সমন্বিত পদক্ষেপের ব্যাপারে একমত পোষণ করেন। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে নিউমোনিয়ায় মৃত্যু রোধ করতে কৌশল প্রণয়ন করা সম্ভব বলে মত প্রকাশ করা হয়।

এক বছর আগে স্পেনের বার্সেলোনায় সেভ দ্য চিলড্রেন, ইউনিসেফ এবং অন্যরা যৌথভাবে শিশুদের নিউমোনিয়াবিষয়ক গ্লোবাল ফোরাম অব চাইল্ডহুড নিউমোনিয়ার আয়োজন করে। ফোরামে অংশ নেওয়া দেশগুলো নিউমোনিয়াজনিত শিশুমৃত্যু মোকাবিলায় গ্লোবাল অ্যাকশন প্ল্যান ও এসডিজিতে বর্ণিত প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে যৌথভাবে কাজ করতে অঙ্গীকার ব্যক্ত করে।

ওই বিশ্ব ফোরামে অংশগ্রহণকারীরা নিউমোনিয়াজনিত মৃত্যু ২০২৫ সালের মধ্যে প্রতি হাজারে তিনের নিচে এবং পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মৃত্যুহার ২০৩০ সালের মধ্যে প্রতি হাজারে ২৫-এর নিচে নামিয়ে আনতে প্রাইমারি হেলথ কেয়ার শক্তিশালীকরণ, বিনিয়োগ বাড়ানো, নানা খাতের সমন্বিত উদ্যোগ গতিশীল করা এবং নতুন উদ্ভাবনের ব্যাপারে একমত হয়।

এ অবস্থায় কোভিড-১৯-এর প্রাদুর্ভাবের কারণে এ বিষয়ে এখন জরুরি ভিত্তিতে মনোযোগ দিতে হবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে এ বিষয়ে প্রণীত কৌশল এগিয়ে নিতে চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি সুযোগও তৈরি করে দিয়েছে। করোনা মহামারির কারণে একদিকে যেমন টিকাদান কর্মসূচিসহ নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা বাধাগ্রস্ত হয়েছে, করোনার সংক্রমণ রোধে নেওয়া নানা পন্থা ও সামাজিক দূরত্বের কারণে তেমনি আবার ছোঁয়াচে রোগগুলোর সংক্রমণের ঝুঁকি অনেকটাই প্রশমিত হয়েছে। কোভিড-১৯ রোগীদের চিকিৎসায় অক্সিজেন সরবরাহসহ যেসব সেবার প্রসার বেড়েছে, এগুলো শিশুদের মধ্যে নিউমোনিয়াজনিত মৃত্যুর হার কমাতে ও নবজাতকদের জীবন বাঁচাতে এবং স্বাস্থ্যসেবার মান বাড়াতে সহায়ক হবে।

গ্লোবাল ফোরাম অব চাইল্ডহুড নিউমোনিয়ার এক বছর পর অংশীদার দেশগুলোর অংশগ্রহণে ১৬ মার্চ, ২৩ মার্চ ও ৬ এপ্রিল ২০২১ ধারাবাহিকভাবে তিনটি ভার্চ্যুয়াল গোলটেবিলের আয়োজন করা হয়েছে। এসব আয়োজনের উদ্দেশ্য হলো বছর শেষে অংশীদার দেশগুলোর স্বাস্থ্যমন্ত্রীদের নেতৃত্বে ভিন্ন এক আয়োজনের মাধ্যমে এ ধরনের সংকটকালে সামনে আসা চ্যালেঞ্জ ও এসব মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপগুলো সবার সামনে তুলে ধরা, যেন দেশগুলো নিউমোনিয়াজনিত মৃত্যু রোধে যথাযথভাবে কাজ করতে পারে।

পরিবর্তনশীল পরিস্থিতি ও শিশুদের মধ্যে নিউমোনিয়ার সার্বিক চিত্র বিবেচনায় এ সমস্যা রোধে একটি জাতীয় কৌশল প্রণয়ন ও তা বাস্তবায়নের পরিকল্পনা–সংবলিত একটি জাতীয় শিশুস্বাস্থ্য কৌশল প্রণয়ন অত্যাবশ্যক। এই কৌশল নবজাত ও শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বিদ্যমান স্বাস্থ্যসেবাকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে নিউমোনিয়া নিয়ন্ত্রণে অগ্রাধিকার নির্বাচন করবে ও কর্মকৌশল বাস্তবায়নে করণীয় সুপারিশ করবে। এই কৌশল শিশুদের রোগ ও মৃত্যু রোধে টিকাদান, অক্সজিনে এবং মুখে খাওয়ার অ্যান্টিবায়োটিকের প্রাপ্যতা, কমিউনিটি পর্যায়ে শিশুদের নিউমোনিয়ার চিকিৎসা, দূষণ কমানো, পরিচ্ছন্নতা, পুষ্টিমানের উন্নয়নসহ কার্যকর ব্যবস্থাদি নির্দেশ করবে। এটি শিশুদের জীবন রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

ম্যালেরিয়া ঠেকাতে ইনসেক্টিসাইডে ট্রিটেড মশারি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে, তবে নিউমোনিয়া ঠেকাতে এমন জাদুকরি কোনো পদ্ধতি নেই। এ ক্ষেত্রে জরুরি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের সমন্বিত গ্লোবাল অ্যাকশন প্ল্যান অনুযায়ী শিশুদের নিউমোনিয়া প্রতিরোধ ও প্রতিকার ব্যবস্থাপনা, নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের ক্ষেত্রে মানসম্মত যথাযথ চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা এবং পাশাপাশি সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের অগ্রাধিকার প্রদান করা। একই সঙ্গে সবার মধ্যে সচেতনতা তৈরি করতে হবে। বৈশ্বিক অংশীদারত্বের মাধ্যমে নিজেদের জ্ঞান, দক্ষতা ও প্রয়োজনীয় অন্যান্য সম্পদ বিনিময় করতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, এ রোগ ঠেকাতে কেবল কথা বললে হবে না, এ নিয়ে কাজ করার তীব্র আকাঙ্ক্ষা থাকতে হবে। আমাদের সবার একসঙ্গে কাজ করার এখনই সময়।


সাব্বির আহমেদ: অ্যাডভাইজার, নিউমোনিয়া সেন্টেনারি কমিটমেন্ট প্রজেক্ট, সেভ দ্য চিলড্রেন ইন বাংলাদেশ।

বিজ্ঞাপন
প্র স্বাস্থ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন