বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

এমনই যখন বাস্তবতা, তখন অপ্রস্তুত এক পৃথিবীতে মরার উপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে এল করোনা মহামারি, যার প্রধান লক্ষ্যস্থল হলো ফুসফুস। এর ভয়াল আঘাত ফুসফুসকে তছনছ করে দেয়, মানুষ তখন ভোগে অসহনীয় অক্সিজেন–স্বল্পতায়, যার পরিণতি কখনো কখনো একেবারেই অপ্রত্যাশিত। বৈশ্বিক এ মহামারিতে ফুসফুস যখন এমনই নাজুক অবস্থায়, তেমন পরিস্থিতিতেই আজ (২৫ সেপ্টেম্বর) বিশ্বব্যাপী পালিত হচ্ছে বিশ্ব ফুসফুস দিবস, এ বছর যার মূল প্রতিপাদ্য, ‘কেয়ার ফর ইয়োর লাংস’ অর্থাৎ, ‘যত্নে থাকুক ফুসফুস’। এ লক্ষ্যকে সামনে রেখে জোর দেওয়া হচ্ছে চারটি বিষয়ের ওপর—

  • তামাককে না বলুন

  • টিকায় সুরক্ষা

  • নির্মল বায়ুসেবন

  • নিয়মিত শরীরচর্চা

তামাকবিহীন, স্বাস্থ্যকর জীবন

তামাকে প্রায় ৪০০০ রাসায়নিক পদার্থ রয়েছে, যা মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর। ক্যানসারের জন্যও দায়ী তামাক। ধূমপায়ী তো বটেই, অধূমপায়ী ব্যক্তিও পরোক্ষভাবে এসবের শিকার হন। ধূমপানের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে বাদ পড়ে না কোমলমতি শিশুরাও। ধূমপায়ী ব্যক্তি হয়তো ভাবছেন, বারান্দায় সিগারেট খেলে ঘরে থাকা শিশুর ক্ষতি হবে না। এমন ধারণা নিতান্তই ভুল। সম্পূর্ণভাবে ধূমপান পরিত্যাগই বাঁচাতে পারে আপনাকে এবং আপনার আপনজনকে। ধূমপায়ীর দেহের জন্য ধূমপান ত্যাগ দারুণ ইতিবাচক বিষয়। ধূমপান ত্যাগ করার ২০ মিনিটের মধ্যে তাঁর হৃৎস্পন্দন স্বাভাবিক হবে, ১২ ঘণ্টার মধ্যে ক্ষতিকর কার্বন মনো–অক্সাইডের মাত্রা স্বাভাবিকে নেমে আসবে, ২-১২ সপ্তাহের মধ্যে ফুসফুসের রক্তসঞ্চালন ও কর্মক্ষমতার উন্নতি হবে। ১-৯ মাসের মধ্যে কাশি ও শ্বাসকষ্ট কমে যাবে, ৫-১৫ বছরের মধ্যে স্ট্রোকের ঝুঁকি অধূমপায়ীদের পর্যায়ে নেমে আসবে। ১০ বছরের মধ্যে ফুসফুসের ক্যানসার হওয়ার আশঙ্কা অর্ধেকে নেমে আসবে, ১৫ বছরের মধ্যে হৃদ্‌রোগের সম্ভাবনা অধূমপায়ীদের পর্যায়ে নেমে আসবে।

টিকা ও মাস্ক

টিকা হলো একধরনের প্রাক্‌–যুদ্ধ প্রশিক্ষণ, যা শরীরকে তথা শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতাকে ব্যাকটেরিয়া কিংবা ভাইরাসের আক্রমণ প্রতিহত করার জন্যে প্রস্তুত করে। কোভিড-১৯, নিউমোনিয়া, ইনফ্লুয়েঞ্জা এবং হুপিং কাশির বিরুদ্ধে টিকা অত্যন্ত কার্যকর। কোভিড-১৯ সংক্রমণ প্রতিরোধ এবং সংক্রমণ হলেও তার তীব্রতা ও জটিলতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে সবারই প্রয়োজন টিকা। আর যাঁরা অন্য কোনো রোগে আক্রান্ত, তাঁদের ক্ষেত্রে টিকা অত্যন্ত জরুরি, ফুসফুসের কোনো রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির জন্য তো অবশ্যই। ফুসফুসের অন্যান্য সংক্রমণের বিরুদ্ধেও টিকা রয়েছে। বয়স ও প্রয়োজন অনুযায়ী সেগুলোও গ্রহণ করা উচিত। এ ছাড়া বাইরে গেলে মাস্ক পরতেই হবে। মানসম্মত মাস্ক পরিধানের কোনো বিকল্প নেই।

চাই নির্মল বায়ু

নির্মল বায়ুসেবন ফুসফুসের সুরক্ষার অন্যতম নিয়ামক। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বিশ্বে প্রতি ১০ জনে ৯ জনই দূষিত বায়ু সেবন করে, যা ফুসফুসের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বাংলাদেশে এর ভয়াবহতা এমনই, যা যেকোনো সুস্থ ফুসফুসেরও সর্বোচ্চ পর্যায়ের ক্ষতিসাধন করে। শিশু থেকে শুরু করে বয়োবৃদ্ধ, বাদ যান না কেউই। মূলত শহুরে বাসিন্দারা এর শিকার, ধনী–গরিবনির্বিশেষে সবাই এর দ্বারা প্রভাবিত। বায়ুদূষণ থেকে রক্ষা পেতে ব্যক্তিগত, সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ জরুরি।

শরীরচর্চায় সুস্থ ফুসফুস

সুস্থ ও অসুস্থ উভয় ধরনের ফুসফুসের ক্ষেত্রে শরীরচর্চা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শরীরচর্চার মাধ্যমে শরীর যেমন কর্মক্ষম থাকে, তেমনি হৃৎপিণ্ড ও ফুসফুসের সুস্থতার জন্যও ব্যায়াম অপরিহার্য। শরীরচর্চায় হৃৎপিণ্ডের গতি ও শ্বাস–প্রশ্বাস বাড়ে, মাংসপেশির অক্সিজেনের চাহিদা বাড়ে। ফুসফুস এ চাহিদা পূরণ করে অতিরিক্ত কার্বন ডাই–অক্সাইড বের করে দেওয়ার মাধ্যমে। এটি নিশ্চিত করতে গিয়ে ফুসফুসের অনেক বায়ুথলি সংকুচিত অবস্থা থেকে প্রসারিত হয়ে ওঠে এবং বায়ুথলিগুলোর কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। সাধারণ শরীরচর্চায়ই এ উপকার পাওয়া সম্ভব। তবে যাঁরা ফুসফুসের কোনো রোগে ভুগছেন, তাঁদের জন্য চিকিৎসক কিংবা ফিজিওথেরাপিস্টের পরামর্শমাফিক ব্যায়াম আবশ্যক। বিশেষত করোনা থেকে সেরে ওঠা ফুসফুসে যেসব সমস্যা রয়ে যায়, সেগুলো সারিয়ে তুলতে বিশেষ ব্যায়াম আবশ্যক।

ধূমপান পরিত্যাগ, নিয়মমাফিক টিকা গ্রহণ, নির্মল বায়ু সেবন এবং নিয়মিত শরীরচর্চার মাধ্যমে পৃথিবীর সব ফুসফুস সুস্থ থাক, জাতি পাক এক স্বাস্থ্যবান জনগোষ্ঠী। আজকের এই দিনে এমনটাই আমাদের প্রত্যাশা। ফুসফুসকে সুস্থ রাখতে আজ থেকেই আসুক ইতিবাচক পরিবর্তন।

লেখক: সভাপতি, বাংলাদেশ ইন্টারভেনশনাল পালমোনোলজি, ক্রিটিক্যাল কেয়ার অ্যান্ড স্লিপ সোসাইটি।

প্র স্বাস্থ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন