শরীরে অক্সিজেন কমতে থাকলে

করোনাকালে যে নতুন শব্দগুলোর সঙ্গে মানুষ এবার বেশি করে পরিচিত হলো, তার একটি ‘হাইপোক্সিয়া’। শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা কমে যাওয়াকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষায় হাইপোক্সিয়া বলা হয়। শরীরের প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গের সুষ্ঠু কার্যক্রমের জন্য দরকার অক্সিজেন। ফুসফুসের শ্বসনপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে রক্তের লোহিত রক্তকণিকা এই অক্সিজেন বহন করে সারা শরীরে ছড়িয়ে দেয়। আর শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা কমে গেলে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ বিকল হতে শুরু করে। তাই করোনাভাইরাস সংক্রমণ শুরুর পর থেকেই ঘরে ঘরে পালস অক্সিমিটার রাখার প্রবণতা দেখা গেছে। কোভিড-১৯–এর অন্যতম উপসর্গ শরীরে অক্সিজেনের পরিমাণ কমে যাওয়া। তবে শুধু কোভিড-১৯ নয়, অন্যান্য অসুখেও হাইপোক্সিয়া হতে পারে। এটি কিন্তু কোনো রোগ নয়, রোগের উপসর্গ।

কেন হয়

একজন সুস্থ মানুষের শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা ৯৭ থেকে ১০০ শতাংশ থাকা উচিত। ফুসফুসে সংক্রমণ বা নিউমোনিয়া হাইপোক্সিয়ার অন্যতম কারণ। দীর্ঘস্থায়ী রোগের কারণেও অনেকের হাইপোক্সিয়া হতে পারে, আবার আচমকাও দেখা দিতে পারে। সিওপিডি (ক্রনিক অবস্ট্র্যাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ) ও হাঁপানি রোগীদের ক্ষেত্রে হাইপোক্সিয়া একটি পরিচিত সমস্যা। ফুসফুসের কার্যক্ষমতায় ঘাটতির কারণে তাঁদের শরীরে এমনিতেই অক্সিজেন কম থাকে। তাই হাঁপানি বা ক্রনিক ব্রঙ্কাইটিসের রোগীর সমস্যা বেড়ে গেলে শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা দ্রুত কমে যায়। তীব্র মাত্রার রক্তাল্পতা বা অ্যানিমিয়ার রোগীদের মধ্যেও এই উপসর্গ দেখা যায়। হৃদ্‌যন্ত্রে বা কিডনিতে সমস্যা থাকলেও এই সমস্যা হতে পারে।

দুর্ঘটনার কারণেও এটি হতে পারে। যেমন, শ্বাসনালিতে কোনো খাবার আটকে গিয়ে বা কোনো স্থানে আটকা পড়ে শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি তৈরি হলে, অনেক উঁচু পর্বতের ওপর বা অগ্নিকাণ্ডের স্থানে অক্সিজেন কমে যেতে পারে।

বিজ্ঞাপন

অক্সিজেনের ঘাটতি বোঝার উপায়

করোনাভাইরাসের মতো রোগে আক্রান্ত হয়ে হঠাৎ বেশি ক্লান্ত বোধ করলে, মাথা ঘুরতে শুরু করলে, শরীর অতিরিক্ত অবসন্ন লাগলে, ঝিমুনি বোধ হলে, সবকিছু এলোমেলো মনে হলে দ্রুত সতর্ক হওয়া উচিত। এ ছাড়া যাঁরা হাইপোক্সিয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন, তাঁদের নিয়মিত অক্সিজেন মাত্রা পর্যবেক্ষণ করা উচিত। পালস অক্সিমিটার নামের ছোট্ট যন্ত্রটি এখন প্রায় বাড়িতেই আছে, যা আঙুলের মধ্যে লাগিয়ে শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা ও পালস রেট মাপা যায়। যদি অক্সিজেন মাত্রা ৯২ শতাংশের নিচে নেমে যায় তবে মস্তিষ্কে ও অন্যান্য অঙ্গে অক্সিজেনের ঘাটতি হয়।

অক্সিজেনের মাত্রা ক্রমাগত কমতে থাকলে হৃৎপিণ্ড, যকৃৎ, কিডনি ইত্যাদি বিকল হতে শুরু করে। বয়স্কদের ক্ষেত্রে কথাবার্তা অসংলগ্ন হতে শুরু করা গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ। আবার কিছু কিছু ক্ষেত্রে ‘সাইলেন্ট হাইপোক্সিয়া’ হয়। অর্থাৎ, অক্সিজেনের মাত্রা কম, কিন্তু শ্বাসকষ্ট না হওয়ায় তিনি তা উপলব্ধি করতে পারেন না। ফলে চিকিৎসা পেতে অনেক দেরি হয়ে যায়। কোভিড-১৯–এ আক্রান্ত কিছু রোগীর ক্ষেত্রে এ ঘটনা ঘটেছে। একে বলে ‘হ্যাপি হাইপোক্সিয়া’। সে ক্ষেত্রে বড় ভরসা হলো পালস অক্সিমিটারের সাহায্যে বাড়িতে অক্সিজেন সেচুরেশন দেখা।

তাই দিনে অন্তত দুবার অক্সিমিটারে শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা মেপে দেখা উচিত। অক্সিমিটারের রিডিং যদি ৯৪ শতাংশের নিচে নেমে যায়, তখনই হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে। তবে অনেক হাঁপানি ও সিওপিডির রোগীদের শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা স্বাভাবিক অবস্থাতেই ৯৪ থাকে, তাই তাদের ক্ষেত্রে ৯০–এর নিচে নামলে বিপজ্জনক।

প্রতিকারের উপায়

বাইরে থেকে অক্সিজেন দিয়ে রোগীর শরীরের অক্সিজেনের অস্বাভাবিক ঘাটতি পূরণ করাই হচ্ছে চিকিৎসার প্রথম ধাপ। দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া এবং নিরবচ্ছিন্ন অক্সিজেন চালিয়ে যাওয়া আবশ্যক। অক্সিজেন সিলিন্ডার বা অক্সিজেন কনসেন্ট্রেটরের সাহায্যে রোগীকে অক্সিজেন সরবরাহ করা যায়। একই সঙ্গে আক্রান্ত ব্যক্তির করোনা সংক্রমণ বা অন্য যে কারণে হাইপোক্সিয়া হচ্ছে, তার চিকিৎসা শুরু করা জরুরি।

রোগীকে অক্সিজেন দেওয়ার ক্ষেত্রেও কিছু ধাপ রয়েছে। প্রথমে নাজাল ক্যানুলা বা ফেস মাস্কের সাহায্যে রোগীকে অক্সিজেন দেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে কাজ না হলে উচ্চ প্রবাহযুক্ত মাস্কের সাহায্যে রোগীর শরীরে অক্সিজেনের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হয়। এতে রোগীর শারীরিক পরিস্থিতির উন্নতি না হলে তখন নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে ভেন্টিলেটরের মাধ্যমে অক্সিজেন দেওয়া হয়। এ ছাড়া শোয়ার ধরন পরিবর্তন করেও অক্সিজেনের মাত্রা কিছুটা বাড়ানো যায়।

বিজ্ঞাপন
প্র স্বাস্থ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন