সাপে কাটলে

বিজ্ঞাপন
default-image

সাপে কাটার সঙ্গে ‘আতঙ্ক’ শব্দটি জড়িয়ে আছে। গ্রামীণ জীবনে সাপে কাটার বিষয়টি নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা হলেও মে থেকে অক্টোবর মাসে তা বেড়ে যায়। তবে সাপে কাটলেই যে বিষক্রিয়া হবে, বিষয়টা কিন্তু এমন নয়। অনেকের জানা, দেশে বিষধর সাপের চেয়ে নির্বিষ সাপের সংখ্যাই বেশি। কিন্তু অপচিকিৎসা ও অজ্ঞতার কারণে আক্রান্ত মানুষের জীবন বাঁচানো সম্ভব হয় না।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে প্রতি বছর ৫ লাখ ৮৯ হাজার ৯১৯ জন সাপের কামড়ের শিকার হয়। এদের মধ্যে বছরে মারা যায় ৬ হাজার ৪১ জন। আশঙ্কার বিষয় হলো, এর মধ্যে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয় মাত্র ৩ শতাংশ মানুষ।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

বিষধর সাপে কাটলে শরীরে বিষক্রিয়ার কিছু লক্ষণ দেখা যায়: ক্ষতস্থানে বিষদাঁতের দুটি দংশনের চিহ্নের উপস্থিতি, ক্ষতস্থান থেকে অনবরত রক্তপাত ও ক্ষতস্থান অস্বাভাবিকভাবে ফুলে ওঠা এবং প্রচণ্ড ব্যথা অনুভব করা, কখনো কখনো সারা শরীর ফুলে যাওয়া, খাবার ও ঢোক গিলতে অসুবিধা, শ্বাসকষ্ট, চোখে ঝাপসা দেখা ও চোখের পাতা বন্ধ হয়ে আসা, ঘুম ঘুম ভাব আসা, হাত-পা অবশ হয়ে আসা ও অচেতন হয়ে পড়া, ঘাড় সোজা রাখতে না পারা, প্রস্রাব বন্ধ হয়ে যাওয়া প্রভৃতি।

এ ধরনের কোনো লক্ষণ দেখা দিলে নিকটস্থ হাসপাতালে যথাযথ চিকিৎসা গ্রহণ করা উচিত। সাধারণত নির্বিষ সাপের কামড়ে আক্রান্ত স্থানে সামান্য ব্যথা, ফুলে যাওয়া বা অল্প ক্ষত সৃষ্টি হয়ে থাকে। তবে এসব লক্ষণ থাকলেও ঝুঁকি নেওয়া ঠিক নয়, যেকোনো রোগীকেই হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া উচিত। বিষধর সাপের কামড়ে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মৃত্যুর মূল কারণ যথাযথ সচেতনতার অভাব। ওঝা বা বেদের মাধ্যমে অবৈজ্ঞানিক উপায়ে চিকিৎসা করানো এবং রোগীকে হাসপাতালে আনতে বিলম্ব করা।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

সাপে কাটা ব্যক্তিকে প্রথমে আশ্বস্ত করতে হবে যে তার ভয়ের কোনো কারণ নেই। এর বৈজ্ঞানিক চিকিৎসা আছে। বেশির ভাগ সাপই নির্বিষ, এমনকি বিষধর সাপের পক্ষেও দংশনের সময় সব সময় প্রচুর পরিমাণ বিষ ঢেলে দেওয়া সম্ভব হয় না। এ জন্য আক্রান্ত ব্যক্তিকে সাহস দেওয়া প্রয়োজন। প্রাথমিক চিকিৎসার পর হাসপাতালে দ্রুত নিতে হবে। হাসপাতালে স্থানান্তরের সময় আক্রান্ত ব্যক্তিকে হাঁটতে না দিয়ে কাঁধে, খাটিয়ায় বা কোনো যানবাহনের সাহায্যে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। সম্ভব হলে সাপটি দেখতে কেমন, তা লক্ষ করা। সাপের বর্ণনা চিকিৎসককে চিকিৎসা পরিকল্পনায় সাহায্য করতে পারে।

দংশিত স্থান কিছুতেই কাটাছেঁড়া করা উচিত নয়। কেবল ভেজা কাপড় দিয়ে কিংবা জীবাণুনাশক মলম দিয়ে ক্ষতস্থান মুছে দিতে হবে। আক্রান্ত স্থান থেকে মুখের সাহায্যে রক্ত বা বিষ টেনে বের করার চেষ্টা করা বা ক্ষতস্থানে গোবর, শিমের বিচি, আলকাতরা, লালা, ভেষজ ওষুধ বা কোনো প্রকার রাসায়নিক লাগানো উচিত নয়। দংশন করা স্থান থেকে ওপরের দিকে একটি লম্বা কাঠ এবং গামছা বা কাপড় দিয়ে কেবল একটি বাঁধন এমনভাবে দিতে হবে, যেন তা খুব আঁটসাঁট বা ঢিলে কোনোটাই না হয় এবং একটি আঙুল একটু চেষ্টায় বাঁধনের নিচ দিয়ে যেতে পারে। কারণ, খুব বেশি শক্ত করে বাঁধলে আক্রান্ত অঙ্গে রক্ত চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যেতে পারে। যেহেতু মাংসপেশির সংকোচনে বিষ দ্রুত শরীরে ছড়িয়ে পড়ে, তাই সাপে কাটার স্থান বেশি নড়াচড়া করা উচিত নয়। আক্রান্ত ব্যক্তিকে বমি করানোর জন্য বিভিন্ন পদ্ধতি প্রয়োগ কিংবা কানের ভেতর বা চোখের ভেতর কিছু ঢেলে দেওয়া থেকেও বিরত থাকতে হবে। আশপাশের মানুষের একটু সচেতনতা ও বিজ্ঞানমনস্কতাই সাপে কাটা রোগীর প্রাণ ফিরিয়ে দিতে অনেকাংশে সাহায্য করবে।

লেখক, সহকারী অধ্যাপক, নিউরোলজি বিভাগ, বারডেম জেনারেল হাসপাতাল, ঢাকা।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন