বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

হৃদ্‌রোগের ক্ষেত্রে আমরা নানান পরীক্ষার নাম শুনে অভ্যস্ত। কখন, কেন, কোন পরীক্ষা করা হয়, এগুলো সে সম্পর্কে একটু ধারণা নেওয়া যাক। বিশেষ বিশেষ হৃদ্‌রোগের জন্য ধাপে ধাপে নানান পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন হতে পারে।

শরীরে একটা ছিদ্রের মাধ্যমে (ইনভেসিভ প্রসিডিওর) কোনো যন্ত্র প্রবেশ করিয়ে যেসব পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানো হয়, সেগুলোর মধ্যে এনজিওগ্রাম বহুল প্রচলিত। কিন্তু যেসব পদ্ধতি বা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শরীরে যন্ত্র প্রবেশ না করিয়ে পরীক্ষা করা হয়, সেগুলোকে বলা হয় নন-ইনভেসিভ প্রসিডিওর।

হৃদ্‌রোগ যে কেবল বুড়ো বয়সেই হয়, এ ধারণা ভুল। প্রাপ্তবয়স্ক, কিশোর, শিশু, সদ্য ভূমিষ্ঠ শিশু এমনকি গর্ভস্থ ভ্রূণের সমস্যাও নির্ণয় করা সম্ভব বিভিন্ন নন-ইনভেসিভ প্রক্রিয়ায়। সাধারণ ইকোকার্ডিওগ্রাম (অর্থাৎ স্ক্রিনিং ও ডপলার) ছাড়াও রয়েছে যেমন স্ট্রেস-ইকো, ট্রান্স-ইসোফেজিয়াল (গলায় নল ঢুকিয়ে, অজ্ঞান না করে কেবল অবশ করার স্প্রে প্রয়োগ করে করা হয়), ভাসকুলার (রক্তনালির), কনজেনিটাল (জন্মগত), নিওনেটাল (নবজাতকের), ফিটাল (গর্ভস্থ শিশুর), ইন্ট্রাঅপারেটিভ (অস্ত্রোপচার চলাকালীন)সহ অত্যাধুনিক ইকোকার্ডিওগ্রাম।

default-image

স্ট্রেস ইকোকার্ডিওগ্রাম

হার্ট অ্যাটাকের রোগীর হৃৎপেশির ঠিক কতটা আক্রান্ত, আক্রান্ত পেশি পুনরায় সুস্থ করে তোলা সম্ভব কি না, সে সম্পর্কে জানা যায় স্ট্রেস ইকোকার্ডিওগ্রাম থেকে। তা থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় পরবর্তী চিকিৎসাপদ্ধতির বিষয়ে। আন্তর্জাতিক পরিসরে এভাবে রোগনির্ণয় স্বীকৃত পদ্ধতি। ভালভের সমস্যার ক্ষেত্রেও জটিলতার মাত্রা নিরূপণে প্রয়োজন এই পরীক্ষার।

আবার শল্যচিকিৎসার মাধ্যমে বাইপাস করা কিংবা স্টেন্টিং করা রোগীরও কিন্তু হৃদ্‌রোগের লক্ষণ পুনরায় দেখা দিতে পারে। ক্ষেত্রবিশেষে রোগীর লক্ষণের সঙ্গে পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফলাফল মেলে না। কারণ, মাটির গভীরে গাছের শিকড়ের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অংশের মতোই হৃদ্‌পিণ্ডে ছড়িয়ে থাকে অসংখ্য ক্ষুদ্র রক্তনালি, যেগুলোর রক্তচলাচল ঠিক থাকা বা না থাকাটা সহজে ধরা যায় না। আর বারবার এনজিওগ্রাম করা হলে বিকিরণজনিত ঝুঁকিতে পড়তে পারেন রোগী, প্রক্রিয়াটি ব্যয়বহুলও বটে। এনজিওগ্রামে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র নালির সমস্যা ধরা না-ও পড়তে পারে। এমন ক্ষেত্রেও সঠিক রোগনির্ণয়ের জন্য প্রয়োজন স্ট্রেস ইকোকার্ডিওগ্রামের।

আবার একজন রোগী হয়তো হৃদ্‌রোগে ভুগছেন না, কিন্তু শরীরে অন্য কোনো অস্ত্রোপচার করতে হচ্ছে। অস্ত্রোপচারের আগেই শল্যচিকিৎসার দলটি রোগীর হৃদ্‌পিণ্ড ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে কি না, তা জানতে চান। যাতে অস্ত্রোপচারের সময় বা পরে সমস্যা না হয়। সাধারণ ইসিজি কিংবা ইটিটি থেকে সব সময় সামগ্রিক অবস্থা বোঝা যায় না। সবাই ইটিটি করানোর মতো শারীরিক অবস্থায় থাকেনও না। তাই উন্নত বিশ্বে স্ট্রেস ইকোকার্ডিওগ্রাম করানোর নিয়ম প্রচলিত।

ট্রান্স-ইসোফেজিয়াল ইকোকার্ডিওগ্রাম

জন্মগত ত্রুটি নির্ণয় ও চিকিৎসায় (অস্ত্রোপচার বা যন্ত্র প্রতিস্থাপন) এই পরীক্ষা আবশ্যক। সাধারণ ইকোকার্ডিওগ্রামের অস্পষ্ট বিষয় নিশ্চিত করতে, ভালভের অবস্থা বুঝতে কিংবা স্ট্রোক, রক্তনালির রোগ বা অজ্ঞাত সংক্রমণের কারণ উদ্‌ঘাটন করতে কাজে লাগে ট্রান্স-ইসোফেজিয়াল ইকো। ভর্তি না হয়েই ৩০-৪০ মিনিট সময়ের মধ্যেই করা যায় এই পরীক্ষা। আধুনিক হাসপাতালে যখন শল্যচিকিৎসক হৃদ্‌পিণ্ডের অস্ত্রোপচার করেন, তখনই করা হয় ট্রান্স-ইসোফেজিয়াল ইকোকার্ডিওগ্রাম। ত্রুটি রয়ে গেলে তখনই শল্যচিকিৎসক তা সংশোধন করে নিতে পারেন।

জন্মগত হৃদ্‌রোগে, ভ্রূণের ত্রুটি নির্ণয়ে

গর্ভের সন্তানের হৃদ্‌পিণ্ডের গতি অনিয়মিত হওয়া, আগের সন্তানের জন্মগত হৃদ্‌রোগের ইতিহাস কিংবা মায়ের কিছু নির্দিষ্ট জীবাণু সংক্রমণ হয়ে থাকলে ফিটাল ইকোকার্ডিওগ্রাম প্রয়োজন হয়। প্রয়োজনীয়তা থাকলে শিশু ভূমিষ্ঠ হওয়ার আগেই ত্রুটি দেখে নেওয়া ভালো। প্রয়োজনে এমন হাসপাতালে প্রসবের ব্যবস্থা করতে হবে, যেখানে সদ্যোজাত শিশুর নিবিড় পরিচর্যার ব্যবস্থা রয়েছে। এ ছাড়া হৃৎপিণ্ডের জন্মগত ত্রুটি সংশোধনের জন্য শুরুতেই রোগীকে ভর্তি রেখে ইনভেসিভ পদ্ধতি প্রয়োগের (ক্যাথেটারাইজেশন) প্রয়োজন পড়তো একসময়, আদৌ অস্ত্রোপচার সম্ভব কি না, তা নির্ণয় করতেই এমন ব্যয়বহুল প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হতো। এখন দক্ষ হাতে করা সাধারণ ইকোকার্ডিওগ্রাম, এক্স–রে আর অল্প কিছু পরীক্ষা করিয়েই রোগীবান্ধব পদ্ধতিতে এই ধাপ পেরোনো সম্ভব।

চব্বিশ ঘণ্টা পর্যবেক্ষণ

হৃৎপিণ্ডের নানা সমস্যার ক্ষেত্রে, যেমন বুক ধড়ফড় করা বা অনিয়মিত হৃৎস্পন্দন থাকলে ১-৩ দিন, এমনকি সপ্তাহব্যাপী হৃৎপিণ্ডের গতিপ্রকৃতি পর্যবেক্ষণ বা মনিটর করার প্রয়োজন হতে পারে। ২৪ ঘণ্টার জন্য রোগীকে ইসিজি লিড (দেখতে প্লাস্টিকের ক্ষুদ্র পাতের মতো, যা সাধারণ ইসিজির সময় পরানো হয়) পরিয়ে দেওয়া হয়, সঙ্গে থাকে মুঠোফোনের মতো ক্ষুদ্র একটি যন্ত্র। একে বলা হয় হল্টার মনিটরিং। ২৪ ঘণ্টা পর সব কটি ‘রিডিং’ পেয়ে যান চিকিৎসক; যা পর্যালোচনা করে হৃৎস্পন্দনের ছন্দে কোনো সমস্যা থাকলে তা নির্ণয় করা যায়।

রোগী উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন কি না, তা নির্ণয়ে জটিলতা হলে কিংবা কিছু জটিল ক্ষেত্রে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের ওষুধের ডোজ ঠিক করার ক্ষেত্রে অ্যাম্বুলেটরি ব্লাড প্রেশার মনিটরিং (এবিপিএম) করার প্রয়োজন পড়ে। এতে ২৪ ঘণ্টা রক্তচাপ মাপা হয় রোগীর। তবে সব রোগীর এসব পরীক্ষা প্রয়োজন হয় না। প্রাথমিক অবস্থায় উচ্চ রক্তচাপ ধরা পড়লে এবং দ্রুত চিকিৎসা শুরু করলে হৃৎপিণ্ড, কিডনি ও চোখের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিরাট ক্ষতির হাত থেকে বেঁচে যায়।

সিটি করোনারি এনজিওগ্রাম

সিটি স্ক্যানে যেমন শরীরের কোনো অংশের অভ্যন্তরের এক বা একাধিক ‘ছবি’ দেখা যায়, তেমনি সিটি এনজিওগ্রামে শরীরে কোনো যন্ত্র প্রবেশ না করিয়েই হৃৎপিণ্ডের রক্তনালির ছবি দেখা সম্ভব। এতে রোগীর রক্তনালির বিস্তৃতি এবং সেখানে ব্লকের পরিমাণ বোঝা যায়, ভবিষ্যতে হৃদ্‌রোগের ঝুঁকিও নির্ণয় করা যায়। হৃৎপিণ্ড থেকে বের হওয়া অন্যতম রক্তনালির (অ্যাওর্টা) রোগও ধরা পড়ে এখানে। এ ছাড়া বাইপাস করা রোগীর বাইপাস গ্রাফটের বিষয়ে জানা যায় এমন পদ্ধতিতে।

শেষ কথা

সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় করতে না পারার কারণে আমাদের দেশে আকস্মিক হৃদ্‌রোগে মৃত্যুহার অনেক বেশি। রুটিন চেকআপ করেন না অনেকেই, শরীরে যে হৃদ্‌রোগের বীজ বহন করে চলেছেন, তা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নন বেশির ভাগ রোগী। অথচ উন্নত বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও ৪০ পেরোনো প্রত্যেকে ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তির হৃৎসমস্যা অগ্রিম নির্ণয় করা গেলে অনেক জীবন রক্ষা করা যেত, অনেকেই দীর্ঘকাল কর্মক্ষম থেকে দেশকে সেবা দিতে পারতেন। হৃদ্‌রোগ নির্ণয়ের এসব আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার সবাইকে হৃদ্‌যন্ত্রের সুস্থতা সম্পর্কে সচেতন করে তুলতে পারে।

অনুলিখন: ডা. রাফিয়া আলম

প্র স্বাস্থ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন