বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

প্রতিবছর সারা বিশ্বে যত মানুষ মারা যান, তাঁদের ৩১ শতাংশই হৃদ্‌রোগে। বাংলাদেশে প্রতিবছর ২ লাখ ৭৭ হাজার মানুষ হৃদ্‌রোগে মারা যান, তাঁদের ৪ দশমিক ৪১ শতাংশের জন্য দায়ী ট্রান্সফ্যা(ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, ফ্রায়েড চিকেন, হ্যাম বার্গার, কেকের মতো খাবার)। ট্রান্সফ্যাটজনিহৃদ্‌রোগে মৃত্যুর সর্বাধিক ঝুঁকিপূর্ণ ১৫টি দেশের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ।

করোনা সংক্রমণে হৃদ্‌রোগ

হৃদ্‌রোগ বিভিন্ন ধরনের হতে পারে। যেমন জন্মগত, করোনারি, হার্ট ফেইলিওর, কার্ডিওমায়োপ্যাথি, উচ্চ রক্তচাপজনিত হৃদ্‌রোগ, কোর পালমোনালি বা হৃৎপিণ্ডের ডান পাশ অচল হয়ে শ্বাস-প্রশ্বাসে ব্যাঘাত, সেরেব্রোভাস্কুলার বা মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহ, প্রান্তিক ধমনির রোগ, রিউম্যাটিক হৃদ্‌রোগ ইত্যাদি। শুরুর দিকে করোনায় আক্রান্তদের সবচেয়ে বেশি ভয় ছিল নিউমোনিয়া বা ফুসফুসের সংক্রমণ। কিন্তু পরবর্তীকালে বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, করোনাভাইরাস মানুষের শরীরের যেকোনো অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে আক্রান্ত করে এবং মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ায়। বর্তমানে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকি দেখা যাচ্ছে হৃদ্‌যন্ত্রের। এমনকি করোনা থেকে সুস্থ হওয়ার কিছুদিনের মধ্যে হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যুবরণ করছেন এমনও দেখা যাচ্ছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব করোনা রোগী ভেন্টিলেশনে থাকা অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছেন, তাঁদের প্রতি পাঁচজনের মধ্যে একজনের হার্ট অ্যাটাক হয়েছিল। করোনাভাইরাস সংক্রমণে হার্টের আংশিক ব্লক করোনারি ধমনির শতভাগ ব্লক হয়ে কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হতে পারে।

default-image

এখন হৃদ্‌রোগ হলে করণীয়

চিকিৎসকদের মতে, করোনা সংক্রমণ ও সংক্রমণের ফলে সৃষ্ট অন্যান্য জটিলতা ইতিমধ্যে কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আনা গেলেও এখনো সর্বাধিক ঝুঁকিতে আছেন হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত মানুষেরা। যাঁদের আগে থেকে হৃদ্‌রোগ আছে, তাঁরা তো ঝুঁকিতে আছেনই, পাশাপাশি এমন অনেকে আছেন, যাঁরা করোনা সেরে যাওয়ার পর হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়েছেন। কোভিড-১৯-এর সংক্রমণে মূলত শ্বাসনালি ও ফুসফুস আক্রান্ত হয়। এর ফলে শরীরে অক্সিজেনের পরিমাণ কমে যায়। অক্সিজেন কমে গেলে স্বাভাবিকভাবেই হার্টের ওপর বাড়তি চাপ পড়ে। তাই হার্টের সমস্যায় কোভিড-১৯ ভাইরাসের সংক্রমণ হলে শরীরে অক্সিজেনের পরিমাণ কমে গিয়ে অ্যাকিউট রেসপিরেটরি ডিসট্রেস সিনড্রোম বা ‘এআরডিএস’-এর ঝুঁকি অত্যন্ত বেড়ে যায়।

এ ক্ষেত্রে রোগীর জীবন সংশয়ের আশঙ্কা বাড়ে। জাতীয় হৃদরোগ গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের এক জরিপে দেখা গেছে, আগে থেকে হৃদ্‌রোগ বা মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত রোগ ছিল না, এমন করোনায় আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে ৪০ শতাংশ করোনার প্রভাবে হৃদ্‌রোগ বা মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের শিকার হয়েছে। এ ছাড়া তাঁদের মধ্যে ১৬ শতাংশের হার্টবিট অস্বাভাবিক কম-বেশি দেখা গেছে। ৭ শতাংশের কার্ডিয়াক ইনজুরি, ৮ দশমিক ৭ শতাংশের কার্ডিয়াক শক দেখা দিয়েছে। আর যাঁদের আগে থেকে হৃদ্‌রোগজনিত সমস্যা ছিল, তাঁদের সবার ক্ষেত্রে এসব প্রবণতা আরও ১০ শতাংশ হারে বেশি লক্ষ করা গেছে।

হৃদ্‌রোগে সাধারণত চিকিৎসা দেওয়া হয় উপসর্গমাফিক। হার্ট অ্যাটাকের সঙ্গে সঙ্গেই রোগীকে হাসপাতালে নেওয়া গেলে মৃত্যুঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব হয়। এ ক্ষেত্রে ক্যাথল্যাবে এনজিওগ্রাম বা এনজিওপ্লাস্টি করা হয়ে থাকে। এই চিকিৎসাকে বলা হয় প্রাইমারি পিসিআই। কিন্তু কোভিড-১৯ আক্রান্ত কারও হার্ট অ্যাটাক বা হৃদ্‌রোগ দেখা দিলে সাধারণত রক্ত পাতলা করার জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধ দেওয়া হয়। পাশাপাশি সম্ভব হলে সব ধরনের নির্দেশনা মেনে আধুনিক চিকিৎসাপদ্ধতি অনুসরণ করে প্রাইমারি পিসিআই বা করোনারি স্টেন্টিংয়ের মাধ্যমে রোগীর জীবন বাঁচানো সম্ভব।

করোনার এ সময়ে হার্ট সুস্থ রাখতে দৈনন্দিন জীবনযাপনে পরিবর্তন আনা যেমন জরুরি, তেমনি ডায়াবেটিস আক্রান্তদের রক্তের শর্করাও নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। উচ্চ রক্তচাপ থেকে থাকলে সেটিও নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। যাঁরা করোনায় আক্রান্ত হয়ে সুস্থ হয়েছেন, তাঁদেরও সতর্ক থাকতে হবে।

হৃদ্‌রোগীর জন্য করোনার টিকা

সাধারণ হৃদ্‌রোগীদের করোনার টিকা গ্রহণে কোনো ধরনের নিষেধাজ্ঞা নেই। ১৮ বছরের অধিক বয়সী যে কেউ করোনার টিকা নিতে পারবেন। তবে যাঁরা বর্তমানে কোনো জটিল রোগে ভুগছেন, যেমন সম্প্রতি হার্ট অ্যাটাক হয়েছে, এমন ব্যক্তির টিকা গ্রহণে আপাতত নিষেধ করা হচ্ছে। অসুস্থতার ধাক্কা কাটিয়ে ওঠার পর বা পুরোপুরি সেরে ওঠার পর টিকা নিতে কোনো বাধা নেই।

যাঁদের আগে হার্টে রিং পরানো আছে কিংবা বাইপাস সার্জারি হয়েছে, তাঁদের করোনা সংক্রমণ থেকে নিরাপদ থাকতে টিকা নেওয়া জরুরি। টিকার প্রথম ডোজ নেওয়ার পর যদি তীব্র অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়া হয়ে থাকে, সে ক্ষেত্রে দ্বিতীয় ডোজ নেওয়ার আগে অবশ্যই চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করে নেবেন।

লেখক: ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা

প্র স্বাস্থ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন