বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

চার-ছক্কা-আউট

বাস্কেটবল মাঠের পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় ‘চাআআর’, ছক্কাআআআ...’ শব্দগুলো কানে এল। দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থীরা দুই দলে ভাগ হয়ে ক্রিকেটে মেতেছেন। খেলায় দর্শকের সংখ্যাও কম নয়।

বাস্কেটবল মাঠের এক পাশে বসে সহপাঠীদের খেলা দেখছিলেন নূর মোহাম্মদ বায়েজীদ। তিনি জানান, গত রোববার থেকে তাঁদের ক্লাস শুরু হয়েছে। অনেক দিন পর বন্ধুদের পেয়ে তাঁর ভালো লাগছে। পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে খেলাধুলাও চলছে। তিনি খেলায় অংশ না নিলেও পাশে দাঁড়িয়ে বন্ধুদের খেলায় উত্সাহ দিচ্ছেন। মাহামুদ মোমতাহীন সাকিব নামের এক ছাত্র বলেন, ‘করোনায় বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সহপাঠীরা যে যার বাড়িতে চলে গিয়েছিল। এরপর থেকে অনলাইনে সবার সঙ্গে কথা হতো। এখন আবার ক্যাম্পাস খোলায় সশরীর সবার সঙ্গে দেখা হচ্ছে। মনে হচ্ছে আমরা যেন পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে হাজির হয়েছি।’

default-image

ক্রিকেট খেলায় একটি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন শাখাওয়াত হোসেন। তিনি জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর তাঁরা মাত্র ৪৫ দিন ক্যাম্পাসে ছিলেন। এরপর শুরু হয় করোনা–পরিস্থিতি। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের আমেজ ঠিক সেভাবে পাননি। এখন আবার ক্লাস শুরু হওয়ায় তাঁরা খুশি। পড়াশোনার পাশাপাশি শারীরিকভাবে সতেজ থাকতে খেলাধুলায় অংশ নিচ্ছেন।

বাস্কেটবল মাঠ ছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ের হ্যান্ডবল গ্রাউন্ডে গিয়ে দেখা যায়, ময়দা ফেলে প্রস্তুত করা হয়েছে ভলিবল কোর্ট। এখানে আন্তবিভাগ ভলিবল প্রতিযোগিতা শিগগিরই শুরু হবে বলে শিক্ষার্থীরা জানালেন।

বিশ্ববিদ্যালয়-ঠিকুজি

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৮৬ সালের ২৫ আগস্ট। তবে ১৯৯১ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়টি ১৩ জন শিক্ষক, ২০৫ জন শিক্ষার্থী এবং পদার্থবিদ্যা, রসায়ন ও অর্থনীতি বিভাগ নিয়ে যাত্রা শুরু করে। এখন এই বিশ্ববিদ্যালয়ে সাতটি অনুষদ, ২৮টি বিভাগ এবং কয়েকটি ইনস্টিটিউট ও সেন্টার রয়েছে। শিক্ষক আছেন প্রায় সাড়ে ৫০০। শিক্ষার্থী প্রায় ১২ হাজার। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা দেশ-বিদেশে সুনাম অর্জন করেছেন। এ ছাড়া তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষায় অবদান এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের উত্কর্ষের বিবেচনায় এ বিশ্ববিদ্যালয় দেশব্যাপী সুপরিচিত। দেশের একমাত্র সার্চ ইঞ্জিন ‘পিপীলিকা’ এ বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই ২০১৩ সালে চালু হয়। দেশের প্রথম এই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে অর্ধশতাধিক সাহিত্য, সংস্কৃতি, ক্রীড়া, ক্যারিয়ারসহ নানা সংগঠন।

default-image

৩২০ একর জায়গার ওপর বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত। বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিতে ৬৯ হাজারের বেশি বই আছে। এ লাইব্রেরিতে রয়েছে একটি মুক্তিযুদ্ধ কর্নার। যেখানে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়ের বই, পোস্টার, মানচিত্র ও ভিডিওচিত্রের পাশাপাশি দুই হাজারের বেশি বই রয়েছে। ২০০৪ সালে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথমবারের মতো আয়োজন করা হয়েছিল বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড। সবুজে ঘেরা পাহাড়ের ওপর চোখে পড়ে দৃষ্টিনন্দন শহীদ মিনার। ক্যাম্পাসের ভেতরে তিনটি ছাত্র হল ও দুইটি ছাত্রী হল রয়েছে। এ ছাড়া ছাত্রীদের আবাসন নিশ্চিত করতে ক্যাম্পাসের বাইরে শহরের বিভিন্ন এলাকায় ব্যক্তিগত হলে ছাত্রীদের বসবাসের ব্যবস্থা নিশ্চিত করে দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

ক্লাসে-চত্বরে পড়াশোনা

দীর্ঘ ১৮ মাস পর ২ নভেম্বর থেকে আবার সশরীর ক্লাস চালু হয়েছে। এর আগে ২৫ অক্টোবর থেকে খুলে দেওয়া হয়েছে হলগুলো। সশরীর শ্রেণি কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর আবার প্রাণ ফিরে পেয়েছে শাবিপ্রবি ক্যাম্পাস। ক্লাসের ভেতরে শিক্ষকেরা পাঠ দিচ্ছেন শিক্ষার্থীদের। পরীক্ষাগারেও চলছে শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে শিক্ষা। পাশাপাশি চলছে পরীক্ষাও। অন্যদিকে শ্রেণিকক্ষের বাইরে শিক্ষার্থীরা দল বেঁধে নিজেদের মধ্যে গ্রুপ ওয়ার্ক ও পড়াশোনা নিয়ে আলোচনা করছেন। বিভিন্ন একাডেমিক ভবনের আশপাশের উন্মুক্ত স্থান কিংবা খোলা চত্বরে শিক্ষার্থীদের ল্যাবরেটরি-সংক্রান্ত কাজে ব্যস্ত থাকতে দেখা গেছে। একাডেমিক ভবন ‘বি’-এর সামনেই গাছপালাবেষ্টিত চত্বরে ল্যাবের কাজ করছিলেন মো. মমিনুল ইসলাম, সায়মন আবির, তানজিলুর রহমান, সামিয়া আহমেদ, নাফিসা রুম্মান, ফারহিন ফাতেমা, অনীশা দাস, মো. মূসা নাদিম ও জি এম নাকিব। তাঁরা জিওগ্রাফি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের প্রথম সেমিস্টারের শিক্ষার্থী। তাঁরা জানালেন, প্রয়োজনেই তাঁরা মাঠের মতো উন্মুক্ত চত্বরে ল্যাবের কাজ সারছেন।

default-image

টুকরো টুকরো আড্ডা

দুই বা ততোধিক শিক্ষার্থী। কোথাও আবার জনাদশেক কিংবা তারও বেশি। ক্যাম্পাসের একোণ-ওকোণ, সবখানেই বসে-দাঁড়িয়ে আড্ডা জমিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। সমানতালে চলছে হাসি, ঠাট্টা আর হই–হুল্লোড়। একথা-ওকথা নিয়ে দেদার তর্কবিতর্কও হচ্ছে। আড্ডার মাঝখানে কেউ কেউ নতুন যুক্ত হচ্ছেন। পুরো বিশ্ববিদ্যালয় ঘুরে খণ্ড খণ্ড এমন দৃশ্য দেখা গেল।

পরিবহন গ্যারেজের ঠিক পাশেই ছোট একটি টিলা। তার পাশে জলাশয়। আছে অসংখ্য গাছ। টিলার চূড়ায় পেতে রাখা আছে বেশ কিছু বেঞ্চ আর টেবিল। বেঞ্চে বসে চা-নাশতা খেতে খেতে এখানে আড্ডা জমিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। দুটো বেঞ্চে বসে প্রাণখোলা আড্ডায় মেতেছিলেন নৃবিজ্ঞান বিভাগের চতুর্থ বর্ষের পাঁচ শিক্ষার্থী—আরাফাত মল্লিক, ফুয়াদ মিয়া, ফাতেমা তুজ জোহরা, সিজান মিয়া ও প্রান্ত পাল। আরাফাত জানান, এ টিলাটিকে কেউ কেউ ‘গিফারী চত্বর’, ‘পরিবহন টিলা’ কিংবা ‘সবুজের টং’-ও বলে থাকেন। করোনার আঘাতে আগে এটাই ছিল তাঁদের নিত্যদিনের আড্ডাস্থল। বহুদিন পর চেনা আঙিনায় ফিরতে পেরে তাঁরা আনন্দিত।

default-image

সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের চেতনা ’৭১ চত্বর, গোলচত্বর, ক্যাফেটেরিয়া, স্টাফ ক্যানটিন, লুথা চত্বর, সি বিল্ডিংয়ের সম্মুখভাগ, শহীদ মিনার এলাকা, ভার্সিটি গেট, কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সম্মুখভাগ, মুক্তমঞ্চ এবং গাজী-কালুর টিলাসহ ক্যাম্পাসের স্থানে স্থানে ছাত্রছাত্রীরা আড্ডায় মশগুল।
কয়েকজন শিক্ষার্থী জানালেন, ক্যাম্পাস ও হলের আশপাশে অন্তত ১৭ থেকে ২০টি টংদোকান ছিল। ক্যাম্পাস আবার খোলার পর কর্তৃপক্ষ এসব টং চালুর অনুমতি দেয়নি। ফলে আগে টং ঘিরে যেমন আড্ডা হতো, এখন এ দৃশ্য নেই।

ক্যাফেটেরিয়ার পাশেই বসে আড্ডায় মশগুল ছিলেন ফরেস্ট্রি বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের একদল শিক্ষার্থী। তাঁদের মধ্যে সৈয়দ কিনকেল উদ্দিন ও উম্মে হানিফ জানান, করোনা পরিস্থিতিতে ঘরে একটানা বসে থাকায় একঘেয়ে লাগত। দীর্ঘদিন পর ক্যাম্পাস চালু হওয়ায় তাঁদের পড়াশোনার চাপ বেড়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় সেন্টারের দ্বিতীয় তলায় বসে গল্প করছিলেন ফুড অ্যান্ড টি টেকনোলজি বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র মো. রুবেল হোসেন আবদুস সালাম। তাঁরা জানালেন, তাঁদের ফুড ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টি টেকনোলজি সোসাইটি নামের একটা বিভাগীয় সাংগঠনিক কাঠামো আছে। ওই সোসাইটি বিভাগের ২০১৬-১৭ সেশনের ৩৪ জন বিদায়ী শিক্ষার্থীর সংবর্ধনা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। এরই প্রস্তুতি সারতে তাঁরা দুজন বিশ্ববিদ্যালয় সেন্টারে বসে প্রয়োজনীয় আলাপ সেরে নিচ্ছেন।

গবেষণাক্ষেত্রটিকে আমরা খুবই গুরুত্ব দিচ্ছি

default-image

বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে উন্নয়ন বাবদ সবচেয়ে বেশি টাকা আপনার মেয়াদেই এসেছে।এ টাকা কাজে লাগানোর ব্যাপারে কী ভাবছেন?

ফরিদ উদ্দিন আহমেদ: আমি এখন দ্বিতীয় দফায় দায়িত্ব পালন করছি। তবে প্রথম দফায় দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক উন্নয়নে নিরন্তর চেষ্টা করেছি। এখনো তা অব্যাহত আছে। প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকার উন্নয়নকাজ এখন হচ্ছে। একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য যেসব আধুনিক অবকাঠামো প্রয়োজন, যেমন একাডেমিক ভবন, হল, শিক্ষক ও কর্মচারীদের জন্য আবাসন, আন্তর্জাতিক ছাত্রাবাস, ক্লাব ভবন, মসজিদ, ডরমিটরি সবকিছু নির্মাণ হবে। এসব নির্মিত হলে বিশ্ববিদ্যালয়ে আগামী ৭০ থেকে ৮০ বছরেও আর অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রয়োজন হবে না।

কোভিড-১৯ পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর আপনারা কী কী কাজ করেছেন?

ফরিদ উদ্দিন আহমেদ: প্রথম দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে কোভিড ল্যাব স্থাপন করে আমরা সিলেটের মানুষের নমুনা পরীক্ষা করেছি। আমরা সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে এটা চালু করেছি। করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার পর থেকেই দ্রুততার সঙ্গে ল্যাবটি চালু হয়, এরপর এক দিনের জন্যও এটি বন্ধ হয়নি। এ ছাড়া করোনাভাইরাসের কারণে যখন বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে পড়ে, তখন আমরা দ্রুতই অনলাইনে ক্লাস নেওয়া শুরু করি। শুরুতে এটা চ্যালেঞ্জ ছিল ঠিকই, তবে আমরা সফল হয়েছি। অন্যদেরও এই সাফল্য পথ দেখিয়েছে। শিক্ষার্থীদের আমরা আর্থিক প্রণোদনাও দিয়েছি। এই দুর্যোগের সময় সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে শিক্ষার্থী, সবার পাশেই আমরা ছিলাম।

আপনার সময়ের উল্লেখযোগ্য সাফল্য কী কী?

ফরিদ উদ্দিন আহমেদ: শিক্ষা ও গবেষণায় আমরা ভালো করছি। আমাদের এখানে কোনো সেশনজট নেই। গবেষণাক্ষেত্রটিকে আমরা খুবই গুরুত্ব দিচ্ছি। আমি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করি, তখন গবেষণা খাতে ৯০ লাখ টাকা বাজেট ছিল। এখন এটা ছয় কোটি টাকায় নিয়েছি। আমাদের জার্নালগুলো আন্তর্জাতিক মানের। গবেষণাক্ষেত্রে আমরা অনেক এগিয়ে আছি। সুশাসন নিশ্চিত করতে কাজ করছি। ৯৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ সুশাসন বিশ্ববিদ্যালয়ে আছে। কোনো দুর্নীতি আমাদের স্পর্শ করেনি। সব ক্ষেত্রে শতভাগ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি আমরা নিশ্চিত করছি।

প্র স্বপ্ন নিয়ে থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন