বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

ফিরে দেখা

খুব বেশি দিন আগের কথা নয়। ১৯৯৯ সালের ১১ সেপ্টেম্বরে পথচলা শুরু। এরই মধ্যে ২৩-এ পা দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়টি। ৩০০ শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও এখন ১২ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী পড়ছেন এখানে। শুধু দেশের নয়; সীমানা পেরিয়ে অন্যান্য দেশ যেমন নেপাল, ভারত, ভুটান, ইথিওপিয়া, সোমালিয়া, নাইজেরিয়া থেকেও শিক্ষার্থীরা পড়তে আসছেন এখানে। বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী এখন দেড় শর বেশি বিদেশি শিক্ষার্থী এখানে পড়ছেন।

মূলত কৃষি ক্ষেত্রে এ অঞ্চলের অ্যাগ্রো ইকোলজিক্যাল বৈশিষ্ট্যের কথা বিবেচনা করে ১৯৭৯ সালে স্থাপিত হয় কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট। পরে ১৯৮৮ সালে সরকারি সিদ্ধান্তে ইনস্টিটিউটটি কৃষি কলেজে উন্নীত হয়। ঐতিহাসিক তেভাগা আন্দোলনের নেতা হাজী মোহাম্মদ দানেশের নামেই নামকরণ হয় কৃষি কলেজটির। কার্যক্রম পরিচালিত হতো তৎকালীন ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে। ১৯৯৯ সালের ১১ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উত্তরবঙ্গে প্রথম বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন এবং প্রথম উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পান অধ্যাপক মোশাররফ হোসেন।

default-image

কোর্স-ক্রেডিট-সেমিস্টার পদ্ধতি ও ইংরেজি মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রম। শুরুতে কৃষি অনুষদ নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও পরে কম্পিউটারবিজ্ঞান ও প্রকৌশল, ব্যবসায় শিক্ষা, মৎস্য অনুষদ, অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড ফুড প্রসেস ইঞ্জিনিয়ারিং, পোস্টগ্র্যাজুয়েট স্টাডিজ অনুষদ, ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিমেল সায়েন্সসহ ৮টি অনুষদে ৪৫টি বিভাগ চালু রয়েছে। প্রতিষ্ঠার পরের বছর ৬২৯ জন শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়। সর্বশেষ ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি করা হয়েছে প্রায় আড়াই হাজার শিক্ষার্থী। বর্তমানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১২ হাজারের বেশি।

২২ বছর—একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য খুব বেশি সময় নয়। এই সময়ে বিভাগ, অনুষদ বা শিক্ষার্থী যেমন বেড়েছে, অবকাঠামোগত উন্নতির ছোঁয়াও দৃশ্যমান হয়েছে। শহীদ মিনার, প্রশাসনিক ভবন, নির্মাণাধীন ১০ তলা ভবনসহ ৫টি একাডেমিক ভবন, শিক্ষার্থীদের জন্য ৮টি আবাসিক হল, দুটি মিলনায়তন, মসজিদ, শিশুপার্ক, লাইব্রেরি, আবাসিক কোয়ার্টার, খেলার মাঠ, ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপ, ভ্রাম্যমাণ ক্লিনিক, কৃষক সেবা কেন্দ্র, হাসপাতাল, ব্যাংকসহ নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন শিক্ষার্থীরা।

গবেষণায় কালো জামের জুস

কালো জাম থেকে পাল্প ছাড়ানো হচ্ছে। সেই পাল্প গ্রাইন্ডিং করে প্রয়োজনীয় অন্যান্য উপাদান মিশিয়ে নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় রেখে বোতলজাত হচ্ছে। প্রায় তিন বছর গবেষণা শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুড প্রসেসিং অ্যান্ড প্রিজারভেশন বিভাগের শিক্ষক মারুফ আহমেদ শিক্ষার্থীদের নিয়ে উদ্ভাবন করেছেন বিশেষ ধরনের কালো জামের জুস। এখন চলছে বাজারজাত করার প্রক্রিয়া। শুধু তা–ই নয়, কালো জাম থেকে পাল্প ছাড়ানোর জন্য ‘পাল্প এক্সট্রাক্টর’ মেশিনও তৈরি করেছেন তিনি।

গবেষক মারুফ আহমেদ বলেন, ‘প্রতি মৌসুমে বিশ্ববিদ্যালয়ের কালো জামের গাছ থেকে ফল পড়ে নষ্ট হয়। অথচ সুস্বাদু ও ঔষধি গুণসম্পন্ন এই ফল মানুষ খেতে পারে না। এ অবস্থা দেখেই কালো জামের জুস তৈরির চিন্তা মাথায় আসে।’ জানালেন কালো জামের বীজ থেকে ডায়াবেটিস উপশমের ট্যাবলেট প্রস্তুতকরণের গবেষণাও শেষ পর্যায়ে রয়েছে।

default-image

শস্য শুকানোর যন্ত্র

দিনাজপুর অঞ্চল মূলত কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির ওপরে দাঁড়িয়ে আছে। এ অঞ্চলে প্রচুর পরিমাণ গম, ভুট্টা, ধান উৎপন্ন হয়। তবে এটি শীতপ্রধান এলাকা। উৎপাদিত পণ্যের সঠিক প্রক্রিয়াকরণ নিয়ে ভাবছিলেন ফুড ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি বিভাগের শিক্ষক সাজ্জাত হোসেন। সেই ভাবনা থেকে তিনি উদ্ভাবন করেছেন মাল্টি গ্রেইন ড্রায়ার। মূলত এটি শস্য শুকানোর মেশিন। ইতিমধ্যে দিনাজপুর সদর ও কাহারোল উপজেলায় স্থাপন করা হয়েছে, যা কৃষকদের মধ্যে সাড়া জাগিয়েছে। সাজ্জাত হোসেন জানালেন, কৃত্রিম পদ্ধতিতে শস্য শুকানোর মেশিন দেশে এটিই প্রথম। আর্দ্রতাসহ শস্যের মান বজায় রেখে সাশ্রয়ী মূল্যে ড্রায়িং মেশিনটি গড়ে ২৪ ঘণ্টায় ৪৮ টন শস্য শুকাতে সক্ষম।

কৃষকের পাশে কৃষি সেবা কেন্দ্র

বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকে গবেষণা ও প্রশিক্ষণে অধিকতর গুরুত্ব দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ বিভাগের পরিচালক শ্রীপতি সিকদার জানান, গত ২২ বছরে এক হাজারের বেশি বিষয়ে গবেষণা সম্পন্ন হয়েছে। তবে মৌলিক গবেষণার চেয়ে প্রায়োগিক গবেষণাই বেশি। গবেষণার মধ্যে কালো জামের জুস ও মাল্টিক্রপ ড্রায়ার ছাড়াও ছয়টি শস্য জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে।

সাম্প্রতিককালে এখানে চালু হয়েছে কৃষক সেবা কেন্দ্র। স্থানীয় কৃষকেরা কৃষিবিষয়ক যেকোনো পরামর্শের জন্য এই কেন্দ্রে আসেন। কৃষিবিষয়ক যেকোনো তথ্যপ্রযুক্তি প্রয়োগ বিষয়ে কৃষকদের সহায়তা প্রদান, কৃষক প্রশিক্ষণসহ বিভিন্ন পোস্টার, বুলেটিন, কৃষক সমাবেশের আয়োজন করে শিক্ষক শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কৃষকদের মতবিনিময়ের আয়োজন করা হয়।

ক্যাম্পাসে চালু করা হয়েছে ভ্রাম্যমাণ ভেটেরিনারি ক্লিনিক। গবাদিপশুর চিকিৎসাদানে কৃষকের দোরগোড়ায় গিয়ে সেবা দিচ্ছে ক্লিনিক গাড়িটি। এর ফলে বিশেষ করে কৃষি, ফিশারিজ ও ভেটেরিনারি অনুষদের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কৃষকের তৈরি হয়েছে নিবিড় বন্ধন।

করোনাকালে দীর্ঘ সময় ক্যাম্পাস বন্ধ থাকার পরে গত ২১ সেপ্টেম্বর শিক্ষার্থীদের পদচারণে আবার মুখর হয়ে উঠেছে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। প্রিয় ক্যাম্পাসের আবাসিকে ফিরেছেন শিক্ষার্থীরা। শুরু হয়েছে ক্লাস পরীক্ষাও। টিএসসিতে গান আর আড্ডাবাজি চোখে পড়ছে আবার। গত ৩০ জুন বিশ্ববিদ্যালয়ের সপ্তম উপাচার্য হিসেবে যোগ দিয়েছেন এম কামরুজ্জামান। যোগদানের পরই শিক্ষার্থীদের জন্য বিদ্যুৎ বিল কমানো, সেশনজট নিরসনে অনলাইন অ্যাপসের মাধ্যমে সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষা গ্রহণ, আবাসিক হলের উন্নত ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন কার্যক্রম হাতে নিয়েছেন তিনি। বললেন, ‘শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক ও গঠনমূলক পাঠদান করে শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং র‌্যাঙ্কিং আদর্শের মর্যাদায় নিয়ে যেতে আমরা পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি।’

প্র স্বপ্ন নিয়ে থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন