default-image

কর্মজীবনের শুরু

২২ বছর বয়সে আমার কর্মজীবন শুরু। আমার পরিবারে কেউ ছিল না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরোনোর পরেই আমাকে একটি চাকরি নিতে হয় নিজের ভরণপোষণের জন্য। বস্তুত, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানে পড়াশোনা করার সময়ই পড়াশোনার খরচ চালাতে আমাকে চাকরি করতে হয়েছে।

স্নাতক দ্বিতীয় বর্ষে পড়ার সময় আমি একটি ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানির মেডিকেল রিপ্রেজেনটেটিভ হয়েছি। ভাবতে পারেন? একজন লিবারেল আর্টসের ছাত্র, যার বিজ্ঞান নিয়ে তেমন কোনো পড়াশোনা নেই, সেই আমাকে মেডিকেল রিপ্রেজেনটেটিভ হিসেবে কাজ করতে হয়েছে। আমি ইন্টারভিউ দিয়ে পেয়েছি সেই চাকরি।

প্রতিষ্ঠানটির নাম ছিল ইলাই লিলি করপোরেশন। বিশ্বের অনেক নামীদামি ওষুধ তারা গবেষণা করে বের করেছে, সেগুলো তারা বাজারজাত করে। এই প্রতিষ্ঠানে আমার বড় ভাইয়ের এক বন্ধু তখন মেডিকেল রিপ্রেজেনটেটিভদের সুপারভাইজার ছিলেন। তাঁর কাছে গিয়ে বললাম, ‘ভাই, আমারতো একটা চাকরি দরকার। না হলে খেতে পাব না।’ বললেন, আমার কাছে চাকরি আছে, কিন্তু বিজ্ঞানের ছাত্র দরকার। আমি বললাম, ‘কী করা যায়? আমি তো সমাজবিজ্ঞানে পড়ছি। আমি আপনাদের কাজ করে দেব সারা দিনরাত, কিন্তু পড়া ছাড়তে পারব না।’

তখন তিনি আমাকে মোটা একটা ওষুধের ম্যানুয়েল ধরিয়ে দিলেন। ওটাকে রেড বুক বলতাম আমরা। তিনি আমাকে পাঁচটা পণ্য দেখিয়ে দিলেন। এই পাঁচটা পণ্যের সবচেয়ে বেশি কাটতি বাংলাদেশে, মানে তখনকার পূর্ব পাকিস্তান। বললেন, এ সম্পর্কে বিষদ পড়বে। আর তখন তো ইন্টারনেট ছিল না। অতএব মৌলিক কিছু জানার সুযোগ ছিল না। যা লেখা থাকত বইয়ে, সেটাই আমাদের শিক্ষা। এখন তো একটা অ্যান্টিবায়োটিক দেখলে সঙ্গে সঙ্গে গুগলে সার্চ করি। তখন এই সুযোগ ছিল না।

ফলে সেই বই আমি মুখস্থ করে ফেললাম। আমাকে ৪৮ ঘণ্টা সময় দেওয়া হয়েছিল। ওই ৪৮ ঘণ্টায় আমি সূর্যের আলো দেখিনি। আমি একটা ঘরের মধ্যে নিজেকে বন্দী করে রেখেছিলাম। প্রতিযোগিতামূলক ইন্টারভিউ দিয়ে চাকরি পেলাম। বেশ ভালো বেতন। সেই চাকরি করে পড়াশোনা চালিয়েছি।

বিজ্ঞাপন

চাকরি নয়, দায়িত্ব

বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করার পর করাচি গেলাম আমার ভাইয়ের কাছে। করাচিতে আমি একটি ব্রিটিশ বিজ্ঞাপনী সংস্থায় চাকরি নিই। সেখানে চাকরি নিয়ে আমি আর কোনো দিন পেছন ফিরে তাকাইনি। তারপর থেকেই বিজ্ঞাপন, মার্কেটিং, মার্কেটিং কমিউনিকেশন, গণযোগাযোগ, বাজার গবেষণা, ইভেন্ট অ্যান্ড অ্যাকটিভেশন ইত্যাদি ইত্যাদির সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়লাম।

আমার মনে আছে, আমি যখন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে বদলি হয়ে আসি, তখন আমার বয়স ২৪ বছর। আমাকে আনা হলো ক্লায়েন্ট সার্ভিসের নির্বাহী হিসেবে, তিন মাসের মধ্যে আমি জ্যেষ্ঠ নির্বাহী হয়ে গেলাম। আমি ওই চাকরি করছি, এমন সময় আমাদের প্রতিষ্ঠানের প্রধান চাকরি ছেড়ে দিলেন। করাচি থেকে আমার ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও নির্বাহী পরিচালক প্লেনে করে এলেন। আমাকে বললেন, ‘দেখো, আমাদের বাঙালি একজনকে দরকার এই প্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসেবে। আমরা একজনকে খুঁজছি।’ আমি ভাবলাম, নিশ্চয়ই নতুন কেউ আসবেন।

হঠাৎ করেই ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমাকে বললেন, ‘শোনো যাকের, আমরা একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তুমি ইস্ট এশিয়া অ্যাডভারটাইজিংয়ের প্রধান হবে।’ তখন আমার বয়স মাত্র ২৪ বছর। আমি প্রায় আকাশ থেকে পড়লাম।

ভেবে দেখুন, ২৪ বছর বয়সে জীবন কত বর্ণময় হয়—যেদিকে ইচ্ছা চলে যাচ্ছি, এখানে প্রেম করছি, ওখানে চিঠি লিখছি, সেখানে পালাচ্ছি, কত কিছু করি আমরা। সেই ২৪ বছর বয়সে আমাকে একটা রুম দিয়ে, টেবিল-চেয়ার দিয়ে বসিয়ে দেওয়া হলো। বলা হলো এটা তোমার দায়িত্ব। যখন বলা হলো দায়িত্ব, তখন সেটা আর চাকরি থাকল না। দায়িত্ব হয়ে গেল—কীভাবে প্রতিষ্ঠানকে লাভজনক করব। সেই দিয়ে আমার যাত্রা শুরু।

রবির আলোয়

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আমার অতি প্রিয় একজন মানুষ। মানুষ বললাম এ কারণে যে আমি শুধু তাঁর গান, কবিতা, সাহিত্যের অনুরাগী নই, বরং মানুষ হিসেবে তিনি আমার কাছে অত্যন্ত শ্রদ্ধার একজন ব্যক্তি। যিনি সব সময় মা–বাবার পরেই আমাকে পথ দেখিয়ে চলেছেন।

আমি আমার পাকিস্তানি ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাহেবকে বলেছিলাম, ‘স্যার, আমাকে ভাবার জন্য এক রাত সময় দিন।’ এই এক রাতে আমি রবীন্দ্রনাথের শরণাপন্ন হলাম। ‘কণিকা’ বলে ওনার বেশ কিছু কবিতা আছে। এগুলোর মধ্য দিয়ে তিনি জীবনের গভীর গভীর কথা বলে যান। হঠাৎ একটি চরণে আমার চোখ ঠেকে গেল, ‘কে লইবে মোর কার্য, কহে সন্ধ্যারবি। শুনিয়া জগৎ রহে নিরুত্তর ছবি।’ মানে অস্তগামী সূর্য চলে যাচ্ছে পৃথিবী ছেড়ে। সে সবাই প্রশ্ন করছে, আমি তো যাচ্ছি, আমার কাজটা কে নেবে? শুনে সবাই ভাবছে, আরেব্বাবা, সূর্য বলছে কে নেবে আমার কাজ! সূর্যের কাজ আমরা কী করে নেব? এটা তো অসম্ভব! আমরা সবাই কিন্তু এ রকম বলি। দায়িত্ব কাঁধে এসে পড়লে বলি, না এটা অসম্ভব।

এরপর রবীন্দ্রনাথ কী বলছেন? ‘মাটির প্রদীপ ছিল, সে কহিল, ‘স্বামী,/ আমার যেটুকু সাধ্য করিব তা আমি।’ আমরা প্রত্যেকেই একেকজন মাটির প্রদীপ। আমাদের অসীম ক্ষমতা। আমরা চাইলে পারি মাথা তুলে দাঁড়াতে। আর যখন মাথা তুলে দাঁড়াই, তখন সারা বিশ্ব আমাদের আয়ত্তে চলে আসে।

আপনারা ভবিষ্যতের নেতা। আপনাদের এভাবেই ভাবতে হবে—মাটির প্রদীপ দিয়ে শুরু করে আপনারা হয়ে উঠবেন একেকটি সূর্য। আপনারা সত্যিই সূর্যের সন্তান।

(ঈষৎ সংক্ষেপিত ও পরিমার্জিত)

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন