default-image

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পথের পাঁচালী উপন্যাসের অপু-দুর্গার কথা মনে আছে? উপন্যাস অবলম্বনে তৈরি সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্রটি যাঁরা দেখেছেন, অপু-দুর্গা নাম শুনলে নিশ্চয়ই ছবিতে দেখা দুই ভাই-বোনের কথা মনে পড়ে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়েও এমন অপু-দুর্গাদের দেখা মিলবে। বয়স প্রায় একই, তবে এরা সুবিধাবঞ্চিত, অসহায়। বছর পাঁচেক আগেও তাদের কেউ বোতল কুড়িয়ে বিক্রির জন্য জমা করত, কেউবা গাছের গুঁড়ি, পাতা সংগ্রহ করত। ক্যাম্পাসের ঝুপড়িতে দেখা যেত এই শিশুরা কাজ করছে চায়ের দোকানে, মুদির দোকানে। কিন্তু এখন ওরা পড়াশোনা করে, স্কুলে যায়।

এই পরিবর্তন সম্ভব হয়েছে ‘পথের পাঁচালি’ নামের সংগঠনের হাত ধরে। দরিদ্র, অসহায় শিশুদের অক্ষরজ্ঞান দিতে বছর পাঁচেক আগে উদ্যোগ নেন বাংলা বিভাগের কিছু শিক্ষার্থী। গড়ে তোলেন এই সামাজিক সংগঠন। প্রথম দিকে ক্যাম্পাসের আশপাশের এলাকা থেকে জনা বিশেক সুবিধাবঞ্চিত শিশুর পড়ার দায়িত্ব নেয় সংগঠন। ক্রমেই বাড়তে থাকে সংখ্যা। ক্লাবের সদস্যরা চাঁদা দিয়ে বই, খাতা, ব্যাগ কিনে দেন। এ কারণে অনেকেই পড়তে উদ্বুদ্ধ হয়। পাশাপাশি অসহায় ও হতদরিদ্র শিশুদের নতুন জামা, খাবারও দেওয়া হয়। এভাবেই একসময় টোকাইয়ের কাজ করা শিশুদের কেউ এখন তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ছে, কেউ পড়ছে পঞ্চম শ্রেণিতে।

বিজ্ঞাপন

আড্ডা থেকেই শুরু

২০১৭ সালের এক রৌদ্রোজ্জ্বল দুপুরে ক্যাম্পাসের কলার ঝুপড়িতে বসে আড্ডা দিচ্ছিলেন কয়েকজন শিক্ষার্থী। সবাই বাংলা বিভাগে পড়েন। অদূরে কিছু বাচ্চার দিকে ইঙ্গিত করে হঠাৎ এক ছাত্রী বলেন, ‘বাচ্চাগুলো দিনের বেলা এভাবে টোকাইয়ের কাজ করছে, অথচ পড়াশোনা করতে পারছে না। আমরা কি ওদের জন্য কিছু করতে পারি না?’

সেই প্রশ্ন থেকেই আড্ডার মোড় ঘুরে যায়। একেকজন একেক রকম পরিকল্পনার কথা বলেন। এরপর বহু আড্ডা আর পরিকল্পনা শেষে সংগঠন তৈরির সিদ্ধান্ত আসে, পরে ‘পথের পাঁচালি’ নামে যাত্রা শুরু করে। সংগঠনে এখন বিভিন্ন বিভাগের শতাধিক শিক্ষার্থী কাজ করছেন।

তবু ঝরে পড়ে...

কিছুদিন পড়ানোর পর দেখা যায় কয়েকজন শিশু অভাবের কারণে স্কুলে যেতে পারছে না। পড়াশোনা বন্ধ করে দিয়েছে। বিষয়টি ভাবায় সংগঠনের সদস্যদের। সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নেন, আর্থিক সহায়তা দিতে না পারলে ঝরে পড়া ঠেকানো যাবে না। পরে সদস্যরা নিজেদের মধ্যে থেকে চাঁদা তুলে আর্থিক সাহায্য দিতে থাকেন। একপর্যায়ে ধরনা দিতে হয় শিক্ষকদের কাছেও। শিক্ষকেরা সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। দর্শন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মাছুম আহমেদ, বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ শেখ সাদী, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সুলতানা সুকন্যা বাশার এবং হিসাববিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মৌরি দে সংগঠনের উপদেষ্টা হন। তাঁরাও অসহায় শিশুদের আর্থিক সহায়তাও দেন। এভাবে শিশুদের মধ্যে ঝরে পড়ার হার কমতে থাকে।

সংগঠনের সদস্যরা জানালেন, স্কুলমুখী করতে গিয়ে নানা ঝামেলায় পড়তে হয় তাঁদের। শিশুদের কেউ কেউ মাঝপথে স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দেয়। এর প্রধান কারণ অভাব হলেও আছে অভিভাবকদের অসচেতনতা। তাই প্রতি মাসে শিক্ষা উপকরণ প্রদানসহ অভিভাবকসমাবেশের আয়োজন করেন তাঁরা। স্কুলের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখা হয়। ফলে, কেউ স্কুলে না গেলে সেটি সংগঠন জেনে যায়। পরে খোঁজ নিয়ে আবার বিদ্যালয়মুখী করার চেষ্টা চালানো হয়। তবু কিছু শিশু ঝরে পড়ছে।

করোনার ধাক্কা সামলে পথচলা

সবকিছু ঠিকই চলছিল। কিন্তু হঠাৎ করোনার ধাক্কায় তালটা যেন কেটে গেল। থমকে গেল শিশুদের পড়াশোনা। মূলত স্মার্টফোন না থাকায় খোঁজখবর নেওয়াও কষ্টসাধ্য হয়ে গেল। কিন্তু সদস্যরা হাল ছেড়ে দিতে চাননি। তাই করোনার প্রকোপ একটু হালকা হওয়ার পরই কয়েকজন ক্যাম্পাসে চলে এলেন। করোনার মধ্যেই শিশুদের পরিবারে আর্থিক সহায়তা দিলেন।

কমিটির সদস্য মো. আবদুর রহমান বলেন, ‘করোনাকালে ১৪ থেকে ১৫ বছরের এক ছাত্রীকে পরিবার থেকে বিয়ে দিয়ে দেওয়া হচ্ছিল। বারবার বুঝিয়ে, আমরা আর্থিক সহায়তার আশ্বাস দিয়ে বিয়ে ঠেকিয়েছি।’ সংগঠনের পক্ষ থেকে মেয়েটির পড়াশোনার খরচ বহনের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। ‘পথের পাঁচালি’র ঝুলিতে আছে এমন আরও অনেক গল্প।

বিজ্ঞাপন
প্র স্বপ্ন নিয়ে থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন