default-image

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়: হলুদ রঙে রঙিন হবে না ক্যাম্পাস

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে (ঢাবি) কেন্দ্র করে রাজধানীবাসীর একটি বড় অংশ পয়লা ফাল্গুন উদ্‌যাপন করে। তাই এই দিনকে ঘিরে ঢাবির আনাচকানাচে উৎসবের ধুম পড়ে যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে থাকে বাড়তি আয়োজন। চারুকলা অনুষদের পাশের বকুলতলায় ভোর থেকে শুরু হয় সাংস্কৃতিক আয়োজন। ‘বসন্ত এসে গেছে’ কিংবা ‘আহা আজি এ বসন্তে’ গানের সুরে বসন্তকে স্বাগত জানান শিক্ষার্থীরা।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর থেকেই প্রতিবছর পয়লা ফাল্গুনে বকুলতলার অনুষ্ঠানে গান করেন ঢাবির চারুকলা অনুষদের স্নাতক চূড়ান্ত বর্ষের শিক্ষার্থী সানজিদা জেরিন। অনুষ্ঠানের সপ্তাহখানেক আগে থেকে গানের রেয়াজ শুরু করেন তিনি। গত বৃহস্পতিবার যখন মুঠোফোনে কথা হলো তিনি বললেন, ‘এটাই হয়তো আমার বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের শেষ বসন্ত। কিন্তু এবারই আর গান করা হচ্ছে না। ক্যাম্পাসে বসন্ত উৎসব হবে না এটা ভাবলেই মন খারাপ হয়ে যাচ্ছে।’

শুধু সকালের এই সাংস্কৃতিক আয়োজনই নয়, দিনজুড়ে আরও নানা অনুষ্ঠান থাকে তাঁদের অনুষদে। ক্যাম্পাসে পিঠার দোকান, ফুলের দোকান দেন শিক্ষার্থীরা। ‘ফাল্গুনের দিন বাসন্তী জামা পরব নাকি শাড়ি, এটা নিয়ে তো বেশ কয়েক দিন ধরে বান্ধবীদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা হয়!’ বললেন জেরিন।

শিক্ষার্থীদের সঙ্গে এদিন শিক্ষকেরাও আনন্দ উৎসবে যোগ দেন। শিক্ষকেরাও বাসন্তী পোশাক পরে আসেন। অনেকে আসেন পরিবার নিয়ে। উৎসবের মধ্যে ক্লাসও চলে।

চারুকলা অনুষদের চূড়ান্ত বর্ষের আরেক শিক্ষার্থী আসীম ফাইয়াজ বলেন, ‘পয়লা ফাল্গুনের দিন ক্লাস করতেও তো মজা লাগে। অন্য দিনের মতো হয়তো খুব টাইট ক্লাস হয় না। কিন্তু সবাই সেজেগুজে আসে। একবার তো বসন্তের পোশাক পরে যাইনি বলে স্যারের কাছে বকাও খেয়েছিলাম। এ বছর এগুলো সবই মিস করব।’

করোনাভাইরাসের কারণে কেন্দ্রীয়ভাবে এবার আর কোনো অনুষ্ঠান হচ্ছে না বলে জানালেন ঢাবির চারুকলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক নিসার হোসেন। তিনি বলেন, ‘জাতীয় কমিটিগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের জায়গা ব্যবহার করে উৎসব করে। করোনা পরিস্থিতির জন্য মানুষের ভিড় করতে কর্তৃপক্ষের নিষেধাজ্ঞা থাকায় এবার অনুমতি দেওয়া হয়নি।’

বিজ্ঞাপন
default-image

নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি: ক্লাসের মতো উৎসবও হবে অনলাইনে

অন্য বসন্তের মতো এ বছর প্রাণ নেই ঢাকার নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে। প্লাজা, গ্যালারি কিংবা গার্ডেন—শিক্ষার্থীদের প্রিয় আড্ডাস্থলগুলো সবই ফাঁকা। প্রাণহীন ক্যাম্পাসেই উৎসবের আয়োজন করেছেন নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি সাংস্কৃতিক সংগঠনের সদস্যরা। দূরে থেকেই ক্যাম্পাসের সবাইকে যেন এক করা যায়, সেই চেষ্টা করছে ক্লাবটি। ক্যাম্পাসের কিছু অংশে রংতুলি দিয়ে আলপনা এঁকেছেন তাঁরা। রঙিন কাগজ কেটে ঝালর বানিয়ে ক্যাম্পাসের কিছু জায়গাও পুরোনো দিনগুলোর মতো সাজিয়েছেন। ফাঁকা ক্যাম্পাসেই গান, নাচ আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে।

ক্লাবটির সাধারণ সম্পাদক আবিদ ইবনে মজীদ বলেন, ‘বসন্তবরণ আর পয়লা বৈশাখ আমাদের ক্যাম্পাসের সবচেয়ে বড় উৎসব। করোনার কারণে গত বছর আমরা পয়লা বৈশাখ উদ্‌যাপন করতে পারিনি। তাই এবার অন্তত বসন্তবরণের সুযোগ হাতছাড়া করতে চাইনি। আমরা এমনভাবে অনুষ্ঠান আয়োজনের চেষ্টা করেছি, যেন সবার মনে হয় চিরচেনা ক্যাম্পাসে বন্ধুদের সঙ্গে নিয়েই বসন্ত উৎসব হচ্ছে।’

বছরের শুরুতে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসের বড় আয়োজন হিসেবে বসন্ত উৎসবকেই বিবেচনা করা হয়। বছরের প্রথম উৎসব বলে এই দিনেই ক্যাম্পাসে নবীন শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুরোনো শিক্ষার্থীদের পরিচিত হওয়ার একটা সুযোগ তৈরি হয়। সদ্য এইচএসসি পেরোনো নতুন একটা ব্যাচও যাত্রা শুরু করে এই সেমিস্টারে। তাই তাঁরাও ক্যাম্পাসের উৎসবমুখরতা টের পান। বছরের এই দিনটি শুধু আনন্দ-আয়োজন নয়, বন্ধুত্ব আর ভ্রাতৃত্ববোধেরও দারুণ এক উপলক্ষ বলে মনে করেন আবিদ। এবার সেসব হচ্ছে না বলে আফসোস আছে, আবার একই সঙ্গে কিছুটা স্বস্তি—গত পয়লা বৈশাখের মতো পুরোপুরি ভার্চ্যুয়াল অনুষ্ঠান তো আর করতে হচ্ছে না।

যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মেনে তাঁরা বসন্তের গানসহ ১২টি বাংলা গান, ৭টি নাচ, বাদ্যযন্ত্রের পরিবেশনাসহ একটি ফ্ল্যাশমবের ভিডিও ধারণ করেছেন। এ ছাড়া যাঁরা ক্যাম্পাসে এসে সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় অংশ নিতে পারেননি, তাঁরা বাড়ি থেকেই গানের ভিডিও ধারণ করে পাঠিয়েছেন। ভিডিওগুলো জোড়া লাগিয়ে দুই ঘণ্টাব্যাপী অনুষ্ঠান সাজিয়েছেন ক্লাবের সদস্যরা। পুরো অনুষ্ঠানটি আজ রোববার বেলা ১১টায় বিশ্ববিদ্যালয় ও ক্লাবের ফেসবুক পেজ থেকে একযোগে সম্প্রচারিত হওয়ার কথা রয়েছে।

default-image

বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস: তৈরি হয়েছে অনুষ্ঠানের ভিডিও

পয়লা ফাল্গুনের মাসখানেক আগে থেকেই বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি) কালচারাল ফোরামের সদস্যদের ব্যস্ততা শুরু হয়ে যায়। কারণ, ক্যাম্পাসের বসন্ত উৎসব আয়োজনের দায়িত্ব তো তাঁদের কাঁধেই। এবারও ব্যতিক্রম হয়নি। তবে দায়িত্ব পুরোনো হলেও এবার ব্যস্ততার ধরন ভিন্ন। ফাঁকা ক্যাম্পাসে বসন্ত উৎসবের আয়োজন করেছেন তাঁরা। সাংস্কৃতিক আয়োজনে যাঁরা অংশ নেবেন, তাঁরা এসেছেন ক্যাম্পাসে। বাসন্তী পোশাক পরে তাঁরা নেচেছেন, গেয়েছেন, আবৃত্তি করেছেন। সাংস্কৃতিক পরিবেশনার এই ভিডিও ধারণ করেছেন ক্লাবটির সদস্যরা।

ক্লাবটির হেড অব লজিস্টিক শাহেদুল শান্তর সঙ্গে যেদিন কথা হলো, সেদিন তাঁদের দলগত একটি সংগীতের ভিডিও ধারণের কাজ চলছিল। শান্ত বলেন, ‘আমাদের পুরো অনুষ্ঠানের ভিডিও ধারণের কাজ প্রায় শেষ। আমরা নিজেরাই ভিডিওগুলো সম্পাদনার কাজ করছি। আশা করি, ঘণ্টাখানেকের একটি অনুষ্ঠান উপহার দিতে পারব।’ এর আগে অনলাইনে পয়লা বৈশাখ ও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অংশগ্রহণে ফোক ফেস্টের আয়োজন করেছিল ক্লাবটি। অনলাইনে অনুষ্ঠান আয়োজনের সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে এবার আরও ভালো কিছু করার আশা করছেন আয়োজকেরা।

উৎসবের উন্মাদনা ছড়িয়ে দিতে তাঁদের প্রস্তুতিপর্ব ও পরিবেশনার মুহূর্তগুলো সাজিয়ে ইতিমধ্যে একটি প্রচারণামূলক ভিডিও তৈরি করেছেন তাঁরা। বাঙালির অন্যতম বড় এই উৎসবের দিনে শিক্ষার্থীরা যেন প্রিয় ক্যাম্পাসকে মিস না করেন, সে লক্ষ্যেই তাঁদের এই আয়োজন বলে জানালেন ক্লাবটির সভাপতি সৈয়দ রাফাত।

বসন্ত উৎসবকে কেন্দ্র করে তাঁরা সৃজনশীল গল্প লেখা, নাটকের চিত্রনাট্য লেখা ও ছবি আঁকার প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছিলেন। বিইউপির যেকোনো শিক্ষার্থীর অংশ নেওয়ার সুযোগ ছিল এই প্রতিযোগিতায়। প্রতিটি বিভাগ থেকেই সেরা তিনজনকে পুরস্কৃত করা হবে। রাফাত বলেন, ‘আমাদের মধ্যে অনেকেই এখন ঢাকার বাইরে আছেন। বাড়িতে বসেই সবাই যেন উৎসবে অংশ নিতে পারে, তাই আমরা এই প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছি।’

সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আর প্রতিযোগিতা মিলিয়ে মূলত চার দিনের উৎসব করছেন তাঁরা। আজ প্রথম দিনে ফেসবুক লাইভে হবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। অন্য দিনগুলোতে হবে সৃজনশীল প্রতিযোগিতা।

বিজ্ঞাপন
default-image

সিলেট এমসি কলেজ: আগামী বছর আরও বড় আয়োজনের প্রত্যয়

সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে হয়তো বসন্ত উৎসবের অনুষ্ঠানমালার পোস্টারে ছেয়ে যেত সিলেট এমসি কলেজের ক্যাম্পাস। সুরে সুরে যাঁরা বসন্তকে স্বাগত জানাবেন, তাঁরা হয়তো গিটার, তবলা আর হারমোনিয়াম নিয়ে গানের রেওয়াজে বসে যেতেন। অন্যদিকে নৃত্যশিল্পীরা হয়তো নাচের সঙ্গীদের নিয়ে তালগুলো আরেকবার মিলিয়ে নিতেন। তবে এবার সেসব কিছুই হচ্ছে না। প্রতিবছর এমসি কলেজে বসন্তের আগমনে রঙিন উৎসবের আয়োজন করে মোহনা সাংস্কৃতিক সংগঠন। নাচ, গান থেকে শুরু করে সাংস্কৃতিক আয়োজন ও ক্যাম্পাস সাজানোর যাবতীয় দায়িত্ব থাকে কলেজটির শিক্ষার্থীদের এই সংগঠনের ওপর। এক যুগের বেশি সময় ধরে ক্যাম্পাসে বসন্ত উৎসব আয়োজন করে আসছে সংগঠনটি।

প্রতিবছর থাকে দিনব্যাপী আয়োজন। জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। এরপর থাকে শিক্ষকদের বক্তব্য। আর মূল আকর্ষণ হিসেবে শিক্ষার্থীদের নাচ, গান, কবিতা আবৃত্তি আর কনসার্ট থাকে। অনুষ্ঠানের প্রায় সপ্তাহ দুয়েক আগে থেকে দম ফেলার সময় পান না সংগঠনটির সদস্যরা। স্মৃতি রোমন্থন করে সংগঠনটির সাংগঠনিক সম্পাদক ইমরান ইমন বলেন, ‘পয়লা বসন্তে আমরা ক্যাম্পাসে বিশাল এক উৎসবের আয়োজন করি। নিজেদের অর্থায়নেই পুরো ক্যাম্পাস সাজাই। ওই দিন শহরের অন্যান্য স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা, অভিভাবকেরাও অনুষ্ঠান উপভোগ করতে আমাদের ক্যাম্পাসে চলে আসে। সিলেট শহরজুড়েই একটা উৎসবের আমেজ লেগে যায়।’

আপাতত ব্যতিক্রমভাবে কোনো উৎসব আয়োজনের পরিকল্পনা নেই তাঁদের। ক্যাম্পাস বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের একে অপরের সঙ্গে সেভাবে যোগাযোগ নেই। তাই অনলাইনে অনুষ্ঠান আয়োজন করাও সহজ নয়। তবে সংগঠনটির সদস্যরা নিজেদের মতো করে অনলাইনে আনন্দ-আড্ডায় মেতে উঠতে চান।

ইমরান বলেন, ‘এখন সুস্থ থাকা খুব জরুরি। এবার আমরা বসন্ত উদ্‌যাপন করতে পারছি না। কিন্তু সবাই সুস্থ থাকলে পরের বছর বন্ধুদের নিয়ে আবার হয়তো বসন্ত উদ্‌যাপন করতে পারব। সে সময় না হয় দ্বিগুণ আয়োজন করলাম। যেন এ বছরের ঘাটতি পুষিয়ে যায়।’

প্র স্বপ্ন নিয়ে থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন