default-image

এখন মনে হয়, সে বুঝি ‘অনেক দিন আগের কথা’! রমজান মাসে বেলা গড়ালেই ক্যাম্পাস প্রাণচঞ্চল হয়ে উঠত শিক্ষার্থীদের ইফতারের প্রস্তুতিতে। যে যাঁর মতো বন্ধু-সহপাঠীদের নিয়ে ক্যাম্পাসের পছন্দের জায়গায় বসে ইফতার আয়োজনে ব্যস্ত হয়ে পড়তেন। করোনা সংক্রমণের কারণে ক্যাম্পাস বন্ধ থাকায় গত বছরের মতো এবারও ইফতার করার সুযোগ হচ্ছে না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণের টিএসসি, কার্জন হল, মল চত্বর, হাকিম চত্বর, কেন্দ্রীয় খেলার মাঠ, সিনেট ভবন, বিভিন্ন হলের মাঠ কিংবা ছাদে বিকেল হলেই শুরু হতো ইফতারের প্রস্তুতি। সাধারণত প্রতিবছর রমজান মাসে বন্ধ থাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। কিন্তু এ সময় ইফতারের ব্যস্ততা একটা চেনা দৃশ্য। কেউ ইফতার কিনছেন, কেউ পানি আনছেন, কেউবা সবুজ মাঠে কাগজ বিছিয়ে অন্যদের বসার ব্যবস্থা করছেন...এমনই দেখা যেত প্রতিবার।

বিজ্ঞাপন
default-image

সেসব কথাই স্মরণ করছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থী শাহারিয়ার জীম। বলছিলেন, ‘যে বছর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছি, তখন থেকেই এই রেওয়াজ দেখে আসছি। পড়াশোনার জন্য পরিবার থেকে দূরে থাকলেও মনে হতো বন্ধুরা মিলে আমরা একটা পরিবার।’

আয়োজনের ধরন ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু এই রেওয়াজ মোটামুটি সব বিশ্ববিদ্যালয়েই আছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন্দ্রীয় খেলার মাঠ, বটতলা, টিএসসি, কেন্দ্রীয় ক্যাফেটেরিয়া, প্রধান ফটকের সামনের হোটেলগুলোতে ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে চলত ইফতার আয়োজনের ব্যস্ততা। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম বিভাগের ৪৮তম ব্যাচের শিক্ষার্থী শাহরীন জাহওয়া ভর্তি হওয়ার পর একটি রমজান মাস পেয়েছেন। বলছিলেন, ‘সহপাঠীদের নিয়ে কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে বসে ইফতার করার সুযোগ হয়েছিল। সবাই মিলে দল বেঁধে ইফতার বানানোর পরে খোলা মাঠে বসে আজানের অপেক্ষা একটা পবিত্র অনুভূতি জাগায়। গত দুই বছর এই অনুভূতিটুকু আর নেওয়ার সুযোগ হচ্ছে না। এখন একটা সুস্থ পৃথিবীর অপেক্ষায় আছি।’

এমন গল্প অন্যদেরও। সহপাঠীদের সঙ্গে তো বটেই, বিভিন্ন বিভাগ, ব্যাচ, সংগঠন মিলেও ইফতার আয়োজন হয় ক্যাম্পাসগুলোতে। এ বছর সেটাও মিস করছেন শিক্ষার্থীরা।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বাসগুলো বেলা সাড়ে তিনটায় ক্যাম্পাস ছেড়ে গেলে সাধারণত চারদিকটা ফাঁকা হয়ে যায়। তবে রমজান মাসটাই ব্যতিক্রম। পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী বিভিন্ন ইফতারি সংগ্রহ করে ক্যাম্পাসে বসে পড়ার সুযোগ শিক্ষার্থীরা হাতছাড়া করতে চান না। বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনার, কাঁঠালতলা, ভাষাসৈনিক রফিক ভবন, অবকাশ ভবন, বিভিন্ন অনুষদের নিচে চোখে পড়ে ছোট ছোট দল। চতুর্থ বর্ষের ছাত্র নবাব হোসেন বলছিলেন, ‘কাগজ বিছিয়ে বসে মাগরিবের আজানের জন্য অপেক্ষা করার মধ্যে একধরনের প্রশান্তি কাজ করত। ইফতারিতে ছোলা, বেগুনি, পিঁয়াজু, আলুর চপ, জিলাপি, খেজুর, ফলমূল—এসব সাধারণ খাবারগুলোই মনে হতো বিশেষ কিছু। এ ছাড়া জেলা বা উপজেলাভিত্তিক, বিভাগ বা সংগঠনগুলোয় ইফতার মাহফিল চলত এই মাসজুড়ে।’

রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী জাকারিয়া কাউসার। ক্যাম্পাসের পাশে কয়েকজন বন্ধু মিলে বাসা ভাড়া করে থাকেন। রমজান মাসে প্রতিদিন মেসের সবাই বিকেলে ক্যাম্পাসে এসে ইফতার করতেন। বললেন, ‘খেলার মাঠ, শহীদ মিনার চত্বর, মসজিদের সামনে খোলা আকাশের নিচে দেখা যেত প্রায় তিন–চার শ শিক্ষার্থীর মিলনমেলা। এই স্মৃতিগুলো কোনো দিন ভোলা যাবে না। এখন ঘরে বসে ইফতার করলেও প্রতিদিন সেই স্মৃতি মনে পড়ে আর ভীষণ খারাপ লাগে।’

ইফতারের সুযোগে প্রাক্তন ছাত্রছাত্রীরাও হাজির হতেন। তাতে পুরোনো স্মৃতি রোমন্থন আর ছোটখাটো পুনর্মিলনী আয়োজন—দুটোই হয়ে যেত। গত বছরের মতো এ বছর মিস হলো সেটাও। দিনাজপুরের হাজী দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় কৃষি অনুষদের শিক্ষার্থী মাহবুবা অন্তি স্মৃতি ঘেঁটে বলেন, ‘একবার আমাদের ল্যাব-ক্লাস ছিল। সব শেষ করে হলে চলে এসেছি। হুট করেই ক্লাস রিপ্রেজেনটেটিভের মেসেজ “লাইব্রেরি মাঠে চলে আয়, ইফতার করব সবাই।” গেলাম। বাইরে থেকে ইফতার কেনা হলো। বড় বালতিতে শরবত বানিয়ে নিয়ে এনেছিল এক বন্ধু। হঠাৎ এমন আয়োজন শুধু ক্যাম্পাসেই সম্ভব।’

প্র স্বপ্ন নিয়ে থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন