default-image

প্রাচীন কোনো পুরাকীর্তি কিংবা ভগ্নপ্রায় কোনো স্থাপনার কথা বললেই কোন দৃশ্যটা ভাসবে আপনার চোখে? হয়তো দেয়াল থেকে খসে পড়া ইট-পাথর কিংবা গা ছমছমে একটা পরিবেশ...। কিন্তু প্রাচীন এই দেয়ালই হয়তো অনেক ইতিহাসের সাক্ষী। এখানেই লুকিয়ে আছে কোনো পৌরাণিক গল্প কিংবা রাজরাজড়ার যুদ্ধের কথন!

‘ফাইন্ড ইয়োর বাংলাদেশ’ এমনই এক অনলাইন প্রতিযোগিতা, যার উদ্দেশ্য ছিল প্রতিযোগীদের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রাচীন ইতিহাস, ঐতিহাসিক গল্প এবং পুরোনো স্থাপনার গুরুত্ব তুলে ধরা। সময়ের সঙ্গে হারিয়ে যেতে বসা স্থাপনাগুলোর সংরক্ষণ প্রক্রিয়া, সংরক্ষণের বাধা ছাড়াও কেমন হতে পারে এর প্রচারণা কৌশল—সেটিও উপস্থাপন করতে হয়েছে প্রতিযোগীদের।

বেসরকারি সংস্থা ফাইন্ডিং বাংলাদেশ এবং ব্রিটিশ কাউন্সিলের যৌথ উদ্যোগে এই আয়োজনে অংশগ্রহণ করেছিল ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের দুজন বা তিনজনের দল। প্রতিযোগিতার প্রথম ধাপে দেশের ৩৮টি জেলার, ভিন্ন ভিন্ন ৪৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ২৫৪ জনের ৯৪টি দল অংশ নেয়। প্রতিটি দল বাংলাদেশের একটি ঐতিহাসিক স্থান নির্বাচন করে এবং তুলে ধরে তাঁর পেছনের ইতিহাস, গুরুত্ব ও সংরক্ষণ কৌশল। সেখান থেকে নির্বাচিত হয় সেরা ২০টি দিল। দ্বিতীয় ধাপে প্রতিটি দল তৈরি করে নিজেদের ‘ভিডিও প্রেজেন্টেশন’। নির্বাচিত সেরা ৬টি দল চলে যায় চূড়ান্ত ধাপে।

বিজ্ঞাপন

গত ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় এই প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত ধাপ। ফাইন্ডিং বাংলাদেশের ফেসবুক পেজ থেকে সরাসরি সম্প্রচারিত এই অনুষ্ঠানে বিচারক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ইউনিভার্সিটি অব ম্যাসাচুসেটস বোস্টনের অধ্যাপক ইলোরা হালিম চৌধুরী, ডেইলি স্টার–এর সাংবাদিক ও সংগীতশিল্পী এলিটা করিম, নগর উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ ঈশিতা আলম, স্মার্টিফায়ার একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা মো. সোহান হায়দার এবং প্রাভা হেলথের মার্কেটিং ম্যানেজার সালমীন রফিক।

প্রেজেন্টেশন, প্রশ্ন, পাল্টা প্রশ্নের কঠিন পরীক্ষা পেরিয়ে অবশেষে চ্যাম্পিয়ন হয় ‘টিম লাস্ট কিউরেটরস।’ ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের সামিয়া শারমিন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুসাব্বির হুসাইন ও সাবিহা শারমিনের দল লাস্ট কিউরেটরসের নির্বাচিত স্থানটি ছিল রাজশাহী বিভাগের ‘নাটোর রাজবাড়ি।’ এই ঐতিহাসিক রাজবাড়ির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে রানি ভবানীর নাম। তাঁকে বলা হতো ‘অর্ধবঙ্গেশ্বরী’, অর্থাৎ অর্ধেক বাংলার রানি।

প্রথম রানারআপ হয় চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মানতাকা জুননুরাইন, সুমাইয়া নাফিস ও অনিন্দিতা দাশের ‘টিম টেরাকোটা।’ মূলত ১৯ শতকে স্থাপিত বাংলার পুনর্জাগরণের পুরোধা ব্রাহ্মসমাজের স্মৃতিচিহ্ন, বরিশাল জেলার দক্ষিণ সদর রোডের ‘বিরাম’ ছিল টিম টেরাকোটার নির্বাচিত স্থান।

দ্বিতীয় রানারআপ হয় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অমিত হাসান, রাফিদ মাহমুদ ও সাদিয়া ইস্কান্দার মুক্তার ‘টিম মিথ হান্টার’। তারা তুলে আনে চট্টগ্রাম জেলার ‘রাঙ্গুনিয়া চাকমা রাজবাড়ি’র পুরোনো ইতিহাস ও হারিয়ে যাওয়া অসংখ্য না জানা গল্প।

প্রতিযোগিতার বিচারকার্যে ঠিক কোন বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্ব পেয়েছে, এই প্রশ্নে বিচারক এলিটা করিম বলেন, ‘বিচারকার্যে বিষয় নির্বাচনটি ছিল আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। শুধু একটা স্থাপনা সংরক্ষণ করলেই কিন্তু হয় না। তার পেছনের ইতিহাস, আদর্শ, ঐতিহাসিক গল্প সংরক্ষণের চেষ্টাটাও প্রয়োজন।’ অন্যদিকে বিচারক ঈশিতা আলম বলেন, ‘সচরাচর দেখা যায় যে স্থাপত্যের শিক্ষার্থীরাই এ রকম বিষয়ে আগ্রহী হয়। কিন্তু আমি অবাক হয়েছি যে এখানে বিভিন্ন বিষয়ে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীরা অংশ নিয়েছে। তারা অজানাকে খুঁজে ফিরেছে। যেখান থেকে শুধু নতুন প্রজন্মই যে জানতে পারছে, তা নয়। এমনকি আমরা অগ্রজরাও জেনেছি, শিখেছি।’

আয়োজক ফাইন্ডিং বাংলাদেশ সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা আদনান এম এস ফকির বলেন, ‘ফাইন্ড ইয়োর বাংলাদেশ এমন একটি প্রতিযোগিতা, যেখানে তরুণদের সঙ্গে দেশের ঐতিহাসিক স্থান, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ও বৈচিত্র্যময় ঐতিহ্যের পরিচয় ঘটানোর চেষ্টা করা হয়।’ তিনি আশা করেন, প্রতিযোগীরা এখানেই থেমে থাকবে না। বরং তারা খুঁজে ফিরবে নিজেদের শিকড়ের কথা, ইতিহাস সংরক্ষণে হবে আরও সচেতন।

বিজ্ঞাপন
প্র স্বপ্ন নিয়ে থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন