default-image

চোখের সামনে দিয়ে ছুটে গেল ২২৫এ নম্বরের একটা বাস। তাকিয়ে দেখি তার পিছনে গোটা গোটা হরফে লেখা আছে: ‘সুন্দর মুখের চেয়ে ভদ্র ব্যবহার অনেক বেশি আকর্ষণীয়’।

এ তো প্রায় বাণীর মতো! উপরন্তু, বাস-ট্রাকের পিছনে যে রকম হেলাফেলায় অক্ষরবিন্যাস দেখা যায় তেমন নয় একেবারেই। এর ছাঁদের মধ্যেও বেশ একটা চারুতা। বাসের গায়ে এমন কথাও লেখা হয় তাহলে? সচরাচর তো এসব জায়গায় ইংরিজিতে বা হিন্দিতে পাবার কথা ‘ব্লো হর্ন’ ‘টা-টা’ ‘ডু নট কিস মি’ কিংবা ‘বুরি নজরওয়ালে তেরি মুঁহ কালা’। না, শুধু এইটুকুই নয়, কদিন আগে আরও একটা দেখেছিলাম ‘ইন্ডিয়া ইজ গ্রেট’।

সম্প্রতি বাংলাদেশে গিয়ে ট্রাকের বা অটোরিকশার পিছনে ওই ধরনের নানারকম লেখন দেখছিলাম, দেখতে দেখতে ভিন্ন একটা সুখের বোধ হচ্ছিল, কেননা তার সবটাই ছিল বাংলা। ‘ব্লো হর্ন’ নয়, সেখান থাকে ‘ভেঁপু বাজান’ বা ‘ভেঁপু দিন’। সেখানে পাওয়া যায় এইসব বাচন বা নির্দেশ: ‘১০১ হাত দূরে থাকেন’, ‘এবার তবে চলি’, ‘মা-বাবার দোয়া’ কিংবা একেবারে ঢাকাই রসবোধ থেকে উঠে আসা: ‘জন্ম থেকে জ্বলছি’। তবে, এসব ছাপিয়ে সবচেয়ে যেটা আমাদের মনে গেঁথে রইল এবার, তা হলো আচমকা পেয়ে যাওয়া এই চমৎকার এক ঘোষণা: ‘যাইত্যাছি যাইত্যাছি, কই যাইত্যাছি জানি না’।

ঘোষণাটার মধ্যে ঠিক কী যে আছে, ভাবতে থাকি। কোনো স্পর্ধা, না কি উপেক্ষা? অ্যাডভেঞ্চার, না ঔদাস্য? রকেট-বাসের সামনের আসনে বসে আমরা চলেছি চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার, আমাদের দিকে ওই বাণীনিক্ষেপ করতে করতে সামনে সামনে চলেছে একটা ট্রাক, আর ব্যক্তিগত স্তর থেকে প্রায় রাষ্ট্রনৈতিক কিংবা দার্শনিক নিরুদ্দেশের দিকে চকিতে চকিতে ইশারা পাঠাচ্ছে কথাগুলি, বলে চলেছে: যাইত্যাছি যাইত্যাছি, কই যাইত্যাছি জানি না।

কে বলতে পারে, গোটা বাংলাদেশেরই এটা মর্মকথা কি না।

বিজ্ঞাপন
খুব বেশি ছাত্রছাত্রীর দরকার নেই তাঁর, মোশতাক ভাবেন। শৃঙ্খলা দিয়ে, কল্পনা দিয়ে, বিদ্যাচর্চার আনন্দ দিয়ে তিনি গড়ে তুলতে চান এই কলেজ। অসম্ভব কি তা?

শান্তিনিকেতনের ছায়া

রামু কলেজের অধ্যক্ষ অবশ্য জানেন কোথায় তিনি যেতে চান। কক্সবাজারে পৌঁছবার ঘণ্টাদেড়েকের মধ্যেই সমুদ্রকে পিছনে ফেলে উল্টোমুখে চলে এসেছি আবার, তার ঠিক আগের বসতি রামু শহরের দিকে। আমাদের নিয়ে চলেছেন নতুন পাওয়া বন্ধু জাফর আহমদ হানাফি।

কক্সবাজার সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের পরিচালক এই হানাফি। নিজের নামটাকে সব সময়েই লেখেন জাফর আহমাদ, কেননা জাফর বা আহমদ লিখলে শব্দগুলো তার যথার্থ আরবি রূপ পায় না বলে তাঁর ঘোর বিশ্বাস। সজ্জন, সুপারিবারিক, অতিথিবৎসল এই মানুষটি কথা বলেন নিরন্তর, আকর্ষক সেসব কথার মধ্যে ওতপ্রোত জড়ানো থাকে ইতিহাস-ভূগোল-ভাষাতত্ত্ব। তাঁর একেবারে নিজস্ব চর্চার বিষয় হলো দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের উপজাতীয় বৃত্তান্ত। অচিরেই আমাদের সমস্ত দায়িত্ব হাতে তুলে নেন তিনি, আর কক্সবাজারে পৌঁছবার দেড়ঘণ্টার মধ্যেই নিয়ে চলেন রামুর দিকে, পুরোনো এক বৌদ্ধমন্দির দেখাবার জন্য।

‘কিন্তু তার আগে’—বলেন হানাফি—‘চলেন এই কলেজটা একবার ঘুরে যাই।’ কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রাম ফিরে যাওয়ার ঝকঝকে পিচের মসৃণ চওড়া রাস্তাটা থেকে হঠাৎ একটু ডাইনে বেঁকে যায় গাড়িটা, তিনদিকে ছড়ানো প্রান্তরের মধ্যে গাছগাছালি ঘেরা লম্বাটে একখানা দালানের সামনে দাঁড়ায় এসে, গাড়ি থেকে নামতে জানতে পাও এ হলো বছর তিনেক আগে শুরু করা রামু কলেজ। এ কলেজের অধ্যক্ষের সঙ্গে কথা না বললে কক্সবাজারে বেড়ানোটা সম্পূর্ণ হতে পারে না: এই হচ্ছে হানাফির অভিমত।

অধ্যক্ষের নাম মোশতাক আহমদ। ইংরিজির এই অধ্যাপক তাঁর কাজ ছেড়ে দিয়ে জীবিকাজগতের বাইরে ছিলেন কিছুদিন, কেননা কর্তৃমহলের কোনো কোনো আচরণকে খুবই নীতিভ্রষ্ট মনে হচ্ছিল তাঁর। রামু কলেজ প্রতিষ্ঠার পর এখানবার নিযুক্ত অধ্যাপকেরা কেউ কেউ তাঁর প্রাক্তন ছাত্র, সানুনয়ে তাঁরা তাঁদের শিক্ষককে ধরে এনেছেন কলেজের দায়িত্ব নেওয়ার জন্য, আর নতুন কিছু গড়ে তোলার সম্ভাবনায় অনেক স্বপ্ন নিয়ে তিনিও চলে এসেছেন খুশি মনেই।

খুব বেশি ছাত্রছাত্রীর দরকার নেই তাঁর, মোশতাক ভাবেন। শৃঙ্খলা দিয়ে, কল্পনা দিয়ে, বিদ্যাচর্চার আনন্দ দিয়ে তিনি গড়ে তুলতে চান এই কলেজ। অসম্ভব কি তা? অসম্ভব কেন মনে হবে তাঁর, অনেক ঝুঁকি নিয়ে যিনি একদিন চলে গিয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধের সেনা হয়ে? ‘চারপাশের অবস্থা ভালো না। কোন ইতিহাসের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা এসেছে দেশে, এরা সব ভুলে গেছে তা। কিন্তু এর মধ্য থেকেই ভালো কিছু গড়ে তোলার চ্যালেঞ্জ তো নিতেই হবে আমাদের, কী বলেন?’ ঠিক, সেই গড়ে তোলার আবেগে মোশতাক ভাবেন যে শিক্ষার চাই পরিবেশের সঙ্গে যোগ। ছেলেমেয়েদের চাই প্রকৃতির সঙ্গে লগ্নতা। ‘আমি তো ভেবেছি বাইরের ওই গাছগুলি আরেকটু বড় হলে তার চারপাশে গোল করে বাঁধিয়ে নেব বেদি, ক্লাস হবে সেইখানে শান্তিনিকেতনের মতো। এখনই অবশ্য মাঝে মাঝে ক্লাস নিই বাইরে। রবীন্দ্রনাথ ঠিক ঠিক জানতেন কীভাবে শেখাতে হয় লেখাপড়া’। বলতে থাকেন মোশতাক: ‘সরকারের কাছে আমরা কতটুকুই আর দাবি করি বলেন। আমরা তো চাই মোটামুটি একটা সুখী সচ্ছল দেশ? তার তো পূর্বশর্তই হলো শিক্ষা। শিক্ষা না থাকলে হবে কিছু? তা সেদিকেই এদের নজর নাই। যে কোনো মূল্যে সন্ত্রাসমুক্ত পরিবেশ ফিরাতে হবে স্কুল-কলেজে আর সেজন্য সংস্কৃতিচর্চায় উৎসাহ দিতে হবে ছাত্রছাত্রীদের। ভাবেন তো, যে গান ভালোবাসে, যে কবিতা ভালোবাসে, ভালোবাসে ফুল পাখি নদী—সে কি কখনও সন্ত্রাসী হতে পারে? সেই ভালোবাসাটাই তো তৈরি করে দিতে হবে ছেলেমেয়েদের মনে?’

চা খেয়ে উঠে আসছি যখন, বিশাল হাতের থাবায় আমার হাতটা ধরে নেন মোশতাক, বলেন: ‘আপনাদের যেন শুভেচ্ছা পাই এই কাজে।’

শুধুমাত্র শুভেচ্ছায় কী হবে? ‘চতুরঙ্গ’র জ্যাঠামশাইয়ের মতো বলতে ইচ্ছা করে যে শুভেচ্ছাতে আমার ‘সিকি পয়সার বিশ্বাস’ নেই। কিন্তু এই কলেজের ভবিষ্যৎ কী হয়, তা নিয়ে একটা আগ্রহ আর উৎকণ্ঠা বহুকালই জেগে থাকবে আমাদের মনে।

প্র স্বপ্ন নিয়ে থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন