বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
default-image

গার্গী তনুশ্রী পাল

করোনার প্রথম দিকে আমার ভালোই লাগছিল। কারণ, এক মাস পর পরীক্ষা ছিল। এমন সময় স্কুল ছুটি দিয়ে দিয়েছে। পরীক্ষা বাতিল হয়েছে। এখন আর পড়াশোনার দরকার নেই বলে ভালো লাগছিল। তখনো আমি বুঝতে পারিনি যে এ ছুটি এক থেকে দেড় বছর দীর্ঘ হবে! স্কুল বন্ধ থাকায় সারা দিন বাসায় থাকতে হয়েছে। আমি বাইরে যেতে পারছিলাম না। আমার মা–বাবা দুজনেই কর্মজীবী। ফলে তাঁরা বাসায় এলেও তাঁদের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখতে হতো। এভাবে সবকিছুই বিরক্ত লাগা শুরু করে। পড়াশোনা, খেলাধুলা, বই পড়া ভালো লাগত না। টিভি দেখে দেখে চোখ নষ্ট হচ্ছে। ফলে বাসায় একটা অস্বস্তিকর অবস্থা তৈরি হয়েছে। সামাজিক দূরত্ব মানা, বাইরে না যাওয়া, ২০ সেকেন্ড ধরে হাত ধোঁয়া—এ নিয়মগুলোও বিরক্ত লাগা শুরু হলো।

অনলাইন ক্লাস নিয়ে আমাদের কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না। সবকিছু মিলিয়ে আমার মানসিক চাপ অনেক বেড়ে গেছে। পাশাপাশি আমার বন্ধুরাও বিষণ্নতায় ভুগছে। বন্ধুদের সঙ্গে অনলাইনে যোগাযোগ হতো। বিধিনিষেধ শেষে বাইরে যাওয়ার চেষ্টা করতাম, কিন্তু সেটা সম্ভব হতো না। বন্ধুদের সঙ্গে অনলাইনে যোগাযোগ হতো। তা–ও ঠিকমতো করতে পারতাম না। দু-তিন মাস পর আমি ও আমার বোন সময় কাটানোর নতুন পথ বের করতে থাকি। আমি একটি অনলাইন পোর্টালে প্রতিবেদন লেখা শুরু করি। এ ছাড়া আমি কিশোর আলোর বুক ক্লাবের সদস্য হয়েছি। তারা আমাদের বিভিন্ন কাজ দিত। সেসবে আমার সময় ব্যয় হতো। এভাবে আমি এ সময়টা উপভোগ করা শুরু করি। কিন্তু বাসায় থাকার কারণে অত উদ্যম ছিল না। আগে বাইরে যেতাম, বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলতাম। এখন সেটা হচ্ছে না। ফলে করোনার এ সময় আমার ওপর একটা মানসিক চাপ দিচ্ছিল। যেখান থেকে আমি বের হয়ে আসতে পারছিলাম না। দেড় বছরের বেশি সময় এ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাওয়ার ফলে আমি অনেকটা অভ্যস্ত হয়ে গেছি। তবু আমি চাই এ মহামারি জলদি শেষ হোক।

default-image

আনিসুল হক

গার্গীর বলা সমস্যার কথাগুলো বাস্তবতা ছিল। এ বাস্তবতা মোকাবিলার জন্য কিশোর আলো থেকে আমরা চেষ্টা করেছি। কিশোর আলো বুক ক্লাব আছে। এখানে ওরা অনলাইনে নিজেদের মধ্যে যুক্ত হয়ে বই বাছাই করে পড়ে ও তা নিয়ে আলোচনা করে। ছবি তোলা, ভিডিও করার মতো সৃজনশীল কাজে আমরা তাদের ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করেছিলাম। এক মাস কিশোর আলোর ছাপা সংস্করণ বন্ধ রাখা হয়েছিল। কিন্তু আমরা দেখলাম, এটা করলে ক্ষতি হবে। কারণ, একটা জিনিস হাতে নেওয়ার একটা মূল্য আছে। ফলে আমরা আবার ছাপা শুরু করলাম। সেখানে গল্পের মধ্য দিয়ে গাছ লাগানো, বাগান করা, মা–বাবার কাজে সাহায্য করা, পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে খেলাধুলা করা, শারীরিক কসরতসহ নানাভাবে শিশু-কিশোরদের ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করেছি। যেন তাদের মনের ওপর চাপ কম পড়ে। পাশাপাশি কিশোর আলো ডটকম, কিশোর আলো ফেসবুক ফেজ, ফিল্ম অ্যান্ড ফটোগ্রাফি ক্লাব আছে। এগুলোর মধ্য দিয়ে ছেলেমেয়েদের সৃজনশীল কাজে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা ছিল।

আমি প্রথম দিকে করোনার খবর খুব দেখতাম ও শুনতাম। সারাক্ষণ সিএনএন দেখতাম। প্রতিদিন মানুষের মৃত্যু ও আক্রান্ত হওয়া দেখে নিজের মনের অবস্থা খারাপ হয়ে গেল। পরে দেখি, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এ খবর বেশি না দেখতে পরামর্শ দিচ্ছে। এ খবর বাদ দিয়ে আনন্দের খবর বা অন্য কিছু দেখার কথা বলা হচ্ছিল। ভালো ছবি দেখা, বই পড়া, বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে গল্প করলে মনের ওপর চাপ কম পড়ে। পরে আমরা দেখলাম, শুধু আমার মতো একজন সাহিত্যিক এ দায়িত্ব নিলে হবে না। এ ক্ষেত্রে আমাদের বিশেষজ্ঞদের সাহায্য নিতে হবে। তখন অনলাইনে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে ছেলেমেয়েদের যুক্ত করে মানসিক স্বাস্থ্য পরামর্শ দেওয়া শুরু করি। এটি প্রথম আলো, প্রথম আলো বন্ধুসভা ও প্রথম আলো ট্রাস্টও করেছে। মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসকদের সরাসরি যুক্ত করে দেওয়ার কাজগুলো আমরা করেছি।

default-image

মেহ্জাবীন হক

প্রায় দুই বছর ধরে আমাদের শিক্ষার্থীরা অনেক ধরনের মানসিক চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। মা–বাবার সঙ্গে সন্তানদের বোঝাপড়া ঠিক হচ্ছিল না। তাদের মধ্যে অনেক রকম চাপ, উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ছিল। পরিবারে কোনো সদস্যের করোনা হয়েছে—সেটা নিয়ে ভয়। কারও মৃত্যু হয়েছে, কারও মা–বাবার চাকরি চলে গেছে, কারও বেতন অর্ধেক হয়ে গেছে। আমাদের শিশুদের অনেক রকম সংকটের মুখোমুখি হতে হয়েছে।

আমাদের স্কুল, কলেজ বা বাসায় একটি ফাস্টএইড বাক্স থাকে। সেখানে ছোটখাটো সমস্যার দ্রুত ব্যবস্থা নিতে ব্যান্ডেজ, তুলাসহ কিছু উপকরণ থাকে। বড় সমস্যা হলে আমরা চিকিৎসক বা হাসপাতালে নিয়ে যাই। ঠিক একইভাবে একটি সাইকোলজিক্যাল ফাস্টএইড আছে। অর্থাৎ মানসিক প্রাথমিক সেবার একটা ব্যবস্থা আছে। এখানে আমার গজ, তুলার দরকার নেই। সেখানে কী থাকবে? করোনা শুরুর সময়ে আমাদের জন্য সামষ্টিক ট্রমা ছিল। আমরা কেউ এই মহামারির জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। ফলে আমরা মানসিকভাবে একটা প্রচণ্ড আঘাত পেয়েছি।

একইভাবে স্কুল খোলার আগের দেড়-দুই বছরে শিক্ষার্থীদের অভ্যাস অন্য রকম হয়ে গেছে। এটাও একটা মানিয়ে নেওয়ার ব্যাপার। তাদের জন্য এ মানিয়ে নেওয়া কীভাবে সহজ করা যায়? যেন শিক্ষার্থীরা সহজে তাদের পড়াশোনার জগতে ফেরত আসতে পারে। এটার জন্যই সাইকোলজিক্যাল ফাস্টএইড কার্যক্রম নেওয়া হয়। শিক্ষকদের এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। যেন তাঁরা শিক্ষার্থীদের প্রাথমিক মানসিক স্বাস্থ্যসেবা দিতে পারেন।

টনি মাইকেল গোমেজ

গত দেড় বছরে অনেক শিশুই কোনো পড়াশোনা করতে পারেনি—এ রকম শিশুরা ওপরের শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হয়েছে। যে ছাত্র বীজগণিত করত না, তার সামনে এখন ওপরের শ্রেণির বীজগণিত এসে গেছে। হঠাৎ করে এই পরিবর্তন আসায় এসব শিক্ষার্থী ফলাফল খারাপ করলে তাদের আত্মবিশ্বাস কমে যাবে। অনেক বড়সংখ্যক শিক্ষার্থী এসব পড়া বুঝতে না পারার আশঙ্কা রয়েছে। এর সঙ্গে দারিদ্র্য যুক্ত হলে মা–বাবা এসব শিক্ষার্থীর পড়াশোনার বিষয়ে অনাগ্রহী হয়ে যান। এটাকে ব্যবস্থাপনা করা এত সহজ নয়। আমরা করোনার সময়ে শিশুদের পাশে ছিলাম। এসব ব্যবস্থাপনার জন্য শিশুদের পাশে আমাদের আরও বেশি করে থাকতে হবে। এ জায়গায় শিশুদের মনস্তাত্ত্বিক সহায়তা দেওয়া অনেক গুরুত্বপূর্ণ।

আনিসুল হক

জীবনের শিক্ষা অনেক কাজে লাগে। কোনোভাবেই আমাদের মধ্যে যেন পরাজিতের মনোভাব না চলে আসে। আমি হয়তো পাঠ্যপুস্তক পড়িনি, অনলাইনে ক্লাস করতে পারিনি। তার মানে এই নয় যে আমি হেরে যাব। আমরা কেউই হতাশ হব না। আমি চাই, মুজিব বর্ষ ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে যেন শিশুদের স্কুলে গরম খাবার দেওয়া হয়। আমি গ্রামের ছেলেমেয়েদের চোখের মধ্যে পুষ্টিহীনতার ছাপ দেখেছি। অন্তত সব স্কুলে দুপুরবেলা গরম খাবার দিতে পারলে পুষ্টির সমাধান হওয়ার পাশাপাশি ছেলেমেয়েদের স্কুলে আসার হার বাড়বে।

মেহ্জাবীন হক

শিক্ষার্থীদের জন্য আমার একটা পরামর্শ রয়েছে। জীবনে আমরা অনেক ধাক্কা ও হোঁচট খাব। কিন্তু তাতেই থেমে যাওয়া যাবে না। উঠে দাঁড়াতে হবে। ঘুরে দাঁড়ালে সামনে অনেক কিছু আছে। অনেক দারুণ কিছু তোমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। তাই হাল ছাড়া যাবে না।

টনি মাইকেল গোমেজ

ছাত্রছাত্রী ও অভিভাবকদের বলব, স্কুলের জুতা, জামা—সবকিছু প্রস্তুত রাখা হোক। জানুয়ারি থেকে নতুন করে স্কুল খুলবে। সরকার নতুন বই ছাপানোর ব্যবস্থা করেছে। সবার হাতে নতুন বই উঠবে। প্রথম যেদিন সবাই স্কুলে যাবে, স্কুলে পতাকা উঠবে, সেদিন হবে সত্যিকারের জয়। আমরা যা কিছু হারিয়েছি, সেটা জীবনের একটা অভিজ্ঞতা। দেশ ও দেশের শিশুদের জন্য সামনে অনেক সুন্দর ভবিষ্যৎ। আমরা সবাই মিলে কাজ করলে এটা নিশ্চয়ই সম্ভব হবে।

গার্গী তনুশ্রী পাল

মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি নজর দেওয়ার পাশাপাশি প্রকৃতির প্রতিও আমাদের নজর দিতে হবে। প্রকৃতি আমাদের ভালো রাখলে এ রকম মহামারি আসবে না, কারও মধ্যে মানসিক চাপও আসবে না। তাহলে আমরা সবাই শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ থাকব।

ফিরোজ চৌধুরী

করোনাকাল শেষ হয়েছে—তা এখনই বলা যাচ্ছে না। স্কুলগুলো খুলেছে। পরীক্ষা চলছে। আমরা চাই, যেকোনো পরিস্থিতিতে স্কুল খোলা রেখে সমাধান খুঁজতে হবে। আমরা যেন শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি আরও বেশি যত্ন নিই। আমরা আশা করি, সরকারি–বেসরকারি সম্মিলিত উদ্যোগের ফলে শিশুদের স্কুলে ফেরা নিরাপদ হবে।

default-image

সুপারিশ

  • যেকোনো পরিস্থিতিতে স্কুল খোলা রেখে সমাধান খুঁজতে হবে।

  • শিশুরা স্কুলে যাওয়ার অভ্যাস থেকে দূরে সরে আসছে, তাই তাদের স্কুলে ফেরাতে হবে আনন্দময় পরিবেশে।

  • ছবি তোলা, গান গাওয়া, গল্প–কবিতার বইপড়া, বেড়ানো সহ বিভিন্ন বিনোদনমূলক কাজে শিশুদের যুক্ত করা দরকার।

  • মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি নজর দেওয়ার পাশাপাশি প্রকৃতির প্রতিও নজর দেওয়া জরুরি

প্র স্বপ্ন নিয়ে থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন