বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

শুরু যেভাবে

কান্নুর গভর্নমেন্ট কলেজ অব ইঞ্জিনিয়ারিং থেকে বি. টেক (ব্যাচেলর অব টেকনোলজি) পাস করে বাইজু যোগ দিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের একটি বহুজাতিক শিপিং কোম্পানিতে। ২০০৩ সালে তিন সপ্তাহের ছুটিতে কর্ণাটক রাজ্যের রাজধানী বেঙ্গালুরু আসেন। সে সময় তাঁরই কিছু বন্ধু সিএটি (কমন অ্যাডমিশন টেস্ট) পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। ছোটবেলা থেকেই গণিতে পটু বাইজুকে কাছে পেয়ে তাঁর সাহায্য চান বন্ধুরা। বন্ধুদের সাহায্য করতে গিয়ে মজা করেই সেবার সিএটি পরীক্ষা দিতে বসেছিলেন তিনি। পরীক্ষায় নম্বর পেয়েছিলেন শতভাগ।

কিন্তু শতভাগ নম্বরের চেয়েও বাইজুর কাছে বড় অর্জন ছিল—নিজেকে আবিষ্কার করা। নিজের জ্ঞান অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার মধ্যে তিনি সত্যিকার আনন্দ পেতে শুরু করেন। এরপর ছুটিতে দেশে এলেই বিনা মূল্যে শিক্ষার্থীদের গণিতের ক্লাস নিতেন তিনি। আস্তে আস্তে তাঁর ক্লাসের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে শহরজুড়ে। অবিশ্বাস্য সাড়া পেয়ে এই আয়োজনের একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার কথা ভাবেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের চাকরি ছেড়ে ২০০৭ সালে গড়ে তোলেন ‘বাইজুস ক্লাসেস’ নামের একটি টেস্ট প্রিপারেশন কোচিং।

পড়াতে গিয়ে বাইজু দেখলেন, ভারতের শিক্ষার্থীদের ভিতটাই নড়বড়ে। সেই জায়গায় কাজ শুরু করলেন। ২০১১ সালে গড়ে তুললেন ‘থিংক অ্যান্ড লার্ন’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু তবু লক্ষ করলেন, শিক্ষার্থীরা শুধু গৎবাঁধা মুখস্থনির্ভর পড়াশোনা করছে। এ থেকে উত্তরণের জন্য তাঁর মাথায় আসে একটি অ্যাপের ভাবনা। যেখানে এমন সব কনটেন্ট থাকবে, যা থেকে শিক্ষার্থীরা সহজে তাঁদের পাঠ্য বিষয়গুলো ‘ভিজ্যুয়ালাইজ’ করতে পারবে। ৪ বছর কাজ করার পর ২০১৫ সালে সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেন তিনি।

অ্যাপে বাজিমাত

ভারতের অভিভাবকেরা খাদ্য ও বাসস্থানের পর সবচেয়ে বেশি ব্যয় করেন শিক্ষা খাতে। তাই বাইজু তাঁর অ্যাপটি বিনা মূল্যে বাজারে ছাড়েননি। গুণগত মানের অডিও ভিজ্যুয়াল কনটেন্ট তৈরি করে সেটিকে সাবস্ক্রিপশন পদ্ধতিতে বাজারে নিয়ে আসেন। এখানে গ্রেড ভেদে শিক্ষার্থীদের মাসে ৫০ থেকে ৫০০ ডলার পর্যন্ত চার্জ গুনতে হয়। যদিও অ্যাপটিতে কিছু বিনা মূল্যের কনটেন্টও রয়েছে। এত উচ্চমূল্যের পরও ভারতজুড়ে অ্যাপটি অবিশ্বাস্য রকমের সাড়া ফেলেছে শুধু এর গুণগত মানের কারণে। বিজ্ঞানের নানা জটিল বিষয় অ্যানিমেশনের মাধ্যমে তুলে ধরতে প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ৩ হাজার ৬০০ কর্মী কাজ করছেন নিরলসভাবে।

২০১৫ সালে চালু হওয়ার পর ৮ কোটির বেশি শিক্ষার্থী অ্যাপ থেকে নিয়মিত শিখছে, যাদের মধ্যে প্রায় সাড়ে ছয় কোটি ‘পেইড সাবস্ক্রাইবার’ রয়েছেন।

বিনিয়োগ গ্রহণ ও আত্তীকরণ

ইউবিএস গ্রুপ ও জুমের প্রতিষ্ঠাতা এরিক ইউয়ান, ব্ল্যাকস্টোনসহ অনেকের কাছ থেকে প্রায় ৩৪০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ পাওয়ার পর ভারতে সবচেয়ে দামি স্টার্টআপ হয়ে উঠেছে বাইজু’স, যার বর্তমান বাজার মূল্য ১৬ বিলিয়ন ডলার। এর আগে বাইজুসের সঙ্গে চুক্তি হয় ওয়াল্ট ডিজনির। এই চুক্তির অধীনে ১৫ কোটি ডলার বিনিয়োগ পায় প্রতিষ্ঠানটি। বিনিয়োগ নেওয়ার পাশাপাশি অন্য প্রতিষ্ঠান আত্তীকরণেও নজর দিয়েছে বাইজু’স। প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার জন্য পড়ুয়াদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার প্রতিষ্ঠান ‘আকাশ এডুকেশনাল সার্ভিসেস’কে প্রায় এক বিলিয়ন ডলারে কিনে নেয় তারা। মার্কিন শিশুদের শিক্ষা নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠান এপিকসহ প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ১৫টি প্রতিষ্ঠান অধিগ্রহণ করেছে বাইজু’স। এ জন্য তাদের খরচ করতে হয়েছে ৬০০ মিলিয়ন থেকে প্রায় ২.৫ বিলিয়ন ডলার। ভারতের বিজ্ঞাপনের বাজারেও বড় নাম হয়ে উঠেছে বাইজু’স। এমনকি ভারতের জাতীয় ক্রিকেট দলের জার্সিতেও চোখে পড়বে বাইজু’স–এর নাম।

ভবিষ্যৎ ভাবনা

২০১৯ সালে বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বাইজু রবীন্দ্রন জানিয়েছিলেন, কোম্পানিটিকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় শিক্ষা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে চান তিনি। করোনা মহামারির কারণে শিক্ষায় অনলাইন–নির্ভরতা তাঁর সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেয়। ১৬ বিলিয়ন ডলার মূল্যমান নিয়ে এটিই বর্তমানে সবচেয়ে বড় শিক্ষা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু বাইজু রবীন্দ্রনের স্বপ্নটা শুধু সংখ্যায় সীমাবদ্ধ নয়। তিনি চান তাঁর অ্যাপ ভারতের প্রান্তিক শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছড়িয়ে যাক। আর সেই লক্ষ্যেই নিরন্তর ছুটছেন সবচেয়ে কম বয়সী ভারতীয় মাল্টিবিলিয়নিয়ারদের একজন—বাইজু রবীন্দ্রন।

প্র স্বপ্ন নিয়ে থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন