ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী নেহা। এ বছর অন্য শিক্ষার্থীদের মতো সে–ও ঘরে বসেই প্রথম দিনের ক্লাসে অংশ নিয়েছে
ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী নেহা। এ বছর অন্য শিক্ষার্থীদের মতো সে–ও ঘরে বসেই প্রথম দিনের ক্লাসে অংশ নিয়েছেছবি: খালেদ সরকার
default-image

ব্যতিক্রমদের মধ্যেও আমার গল্পটা ব্যতিক্রম

ঐশ্বরিয়া ফৌজদার, রাজশাহী কলেজ

‘আজ নবীন মেঘের সুর লেগেছে আমার মনে, আমার ভাবনা যত উতল হলো অকারণে।’ রবীন্দ্রনাথের এই গানের মতো অকারণে নয়, কলেজের নবীন শিক্ষার্থী হিসেবে প্রথম দিনটা কেমন হতে পারে, ভেবে সংগত কারণেই আমার মন উতলা হয়েছিল। আমাদের নবীনবরণ ভার্চ্যুয়াল মাধ্যমে অনুষ্ঠিত হবে জানার পর থেকেই আগ্রহী ছিলাম। অনলাইনে নবীনবরণ সবার জন্যই নতুন অভিজ্ঞতা। আর আমি বোধ হয় একটু বেশিই ব্যতিক্রম। কারণ, নবীন শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে অনুভূতি ব্যক্ত করার জন্য আমাকে কলেজে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল।

নবীনবরণের দিন কলেজের পোশাক পরে ক্যাম্পাসে গিয়েছি। অধ্যক্ষ মো. হাবিবুর রহমান, শিক্ষকেরাসহ সবার সঙ্গে দেখা হয়ে খুব ভালো লেগেছে। কিন্তু শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি তো আমি একাই! আমার বক্তব্য শেষ করার পর অন্যদের মতো আমিও জুম অ্যাপের মাধ্যমে কলেজে বসেই নবীনবরণে অংশ নিই। কী কপাল আমার! নবীনবরণে কলেজে গেলাম, অথচ বন্ধুদের কারও সঙ্গে মুখোমুখি দেখা হলো না, কলেজে বসেও অনুষ্ঠানে অংশ নিতে হলো অনলাইনে।

আমাদের প্রথম ক্লাস ছিল ৬ অক্টোবর। আগে থেকেই রুটিন দিয়ে দেওয়া হয়েছিল। প্রথম দিনটা তিনটা ক্লাস—সব কটিই মূলত পরিচিতিমূলক। শিক্ষকেরা নিজেদের পরিচয় দিলেন। কোনো সমস্যা হলে যেন যোগাযোগ করতে পারি, সে জন্য ফোন নম্বর ও ই–মেইল অ্যাড্রেসও দিয়ে দিয়েছেন। ফেসবুক লাইভে কমেন্টের ঘরে আমরা নিজেদের নাম আর রোল নম্বর লিখে উপস্থিতি জানান দিয়েছি। এসএসসি পরীক্ষার পর দীর্ঘদিন পড়ালেখা থেকে দূরে ছিলাম। এত দিন পর পড়াশোনা শুরু করে শুরুতে একটু চাপে পড়ে গিয়েছিলাম, এখন আবার ভালোই লাগছে।

বিজ্ঞাপন
default-image

নতুনের সঙ্গে মানিয়ে নিয়েই এগোতে হয়

সুদাদ হাসানাত, নটর ডেম কলেজ

এই প্রথম অনলাইনে ভর্তি পরীক্ষা হলো। ঘরে বসে সে পরীক্ষায় অংশ নিয়ে আমি সুযোগ পেয়ে যাই স্বপ্নের নটর ডেম কলেজে। স্কুলে পড়ার সময় থেকেই কত স্বপ্ন ছিল—নটর ডেম কলেজে পড়ব!

ভর্তি কার্যক্রম সম্পন্ন করা এবং ব্যাগসহ অন্যান্য জিনিস সংগ্রহের জন্য এখন পর্যন্ত মাত্র একবারই কলেজে যেতে হয়েছে। জীবনে প্রথম নটর ডেম কলেজে পা রেখে সবুজে ঘেরা ক্যাম্পাসটা দেখে একটা অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছিল। চারপাশটা ঘুরে দেখছিলাম আর ভাবছিলাম, ক্যাম্পাসে ক্লাস করার অভিজ্ঞতা নিশ্চয়ই দারুণ হবে।

কিন্তু হায়! আমরা এমনই দুর্ভাগা ব্যাচ, আমাদের নবীনবরণও হয়েছে অনলাইনে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। নবীনবরণে শিক্ষকদের কথা শুনে কলেজে যেতে না পারার আফসোস বেড়ে গেছে আরও।

সব অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে ৪ অক্টোবর এল কলেজের প্রথম দিন। কলেজে না গেলেও সেদিন কলেজের ইউনিফর্ম পরে ল্যাপটপের সামনে বসেছিলাম ক্লাস করার জন্য। কলেজজীবনের প্রথম ক্লাসই ছিল রসায়ন। রসায়ন বিষয়টা আমি সব সময়ই যমের মতো ভয় পেয়ে এসেছি। কিন্তু ক্লাসে পড়ার ধরন, পড়া বোঝানোর কৌশল দেখে সেদিনই প্রথম রসায়নকে খুব সহজ মনে হলো।

অনলাইনে ক্লাস হলেও কখন, কীভাবে যে সময় কেটে গেছে, টের পাইনি। ক্লাস বেশ ভালো হয়েছে, তবে মিস করেছি ক্লাসে বসে বন্ধুদের সঙ্গে গল্প-আড্ডা। সেই আক্ষেপ কিছুটা ঘুচেছে ফেসবুক, মেসেঞ্জারের সুবাদে। ক্লাস শেষ হওয়ার পর সহপাঠীদের সঙ্গে অনলাইনে যুক্ত হয়েছি।

নতুনকে মানিয়ে নিয়েই তো এগোতে হয়। আপাতত সেভাবেই মনকে প্রস্তুত রাখছি।

চল্লিশ মিনিটের ক্লাস দেড় ঘণ্টা হয়ে যায়

বিজ্ঞাপন
default-image

চল্লিশ মিনিটের ক্লাস দেড় ঘণ্টা হয়ে যায়

শ্রাবন্তী সরকার, চট্টগ্রাম কলেজ

স্বপ্ন ছিল চট্টগ্রাম সরকারি কলেজেই পড়ব। ভর্তিও হলাম। কিন্তু সকালবেলা গাড়ি ভেঙে ক্লাসে যাওয়ার তাড়া এখনো নেই, বরং ল্যাপটপ খুলে বসতে হয় জুম নামের সফটওয়্যারের সামনে। অনলাইন ক্লাসে বিশৃঙ্খলা হলেও শিক্ষকেরা ধমক দিয়ে শাসন করেন না। স্রেফ ‘মিউট’ করে দেন। যান্ত্রিক ক্লাসরুমে মাঝেমধ্যে দম বন্ধ হয়ে এলেও পড়াশোনা খুব একটা মন্দ হয় না।

৪ অক্টোবর শুরু হয় অনলাইন ক্লাস। শিক্ষকেরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন পড়া বুঝিয়ে দিতে। শিক্ষার্থীদের প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে কখন যে সময় গড়িয়ে যায়। ৪০ মিনিটের ক্লাস হয়ে যায় দেড় ঘণ্টা, টেরই পাওয়া যায় না। অনলাইনে রসায়ন ক্লাস করা খুব মজার। শিক্ষক তাত্ত্বিক বর্ণনার পাশাপাশি নানা ধরনের ভিডিও দেখান, যা দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং বুঝতেও সাহায্য করে। এখনো খুব বেশি ক্লাস হচ্ছে না। আগামী সপ্তাহ থেকে ক্লাসের সংখ্যা বাড়বে। তবে ক্লাস করতে গিয়ে কিছু বিপত্তিও এসেছে। নেটওয়ার্ক সমস্যার কারণে অনেক সময় ভিডিও দেখা যায় না। আবার কখনো কখনো ক্লাসের মাঝখানে শোনা যায় গান, নানা রকম আওয়াজ। ফলে ক্লাসে কিছু ব্যাঘাত ঘটে। অনেক সময় শিক্ষকেরা বিরক্ত হন। এসব সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পেতে কলেজ কর্তৃপক্ষ কিছু উদ্যোগও নিয়েছে। বেশ কয়েকটি ফেসবুক গ্রুপ খোলা হয়েছে। এসব গ্রুপে শিক্ষার্থী ছাড়া অন্য কেউ প্রবেশ করতে পারে না। অবশ্য কয়েকটি অনলাইন ক্লাসে নাম-আইডি ছাড়া কয়েকজন ঢুকে পড়েছিলেন।

অনলাইন ক্লাসের চেয়ে বাস্তবের ক্লাসরুমে বসে ক্লাস করা অনেক আনন্দের। তাই অপেক্ষা করছি মহামিলনের। সহপাঠীরা সবাই একত্র হব। ফিরে যাব সেই চক-ডাস্টারের ক্লাসরুমে। সবুজে ঘেরা ক্যাম্পাসে।

বিজ্ঞাপন
default-image

আক্ষেপটা বোধ হয় আজীবন থাকবে

গোলাম মমীত, সরকারি বিজ্ঞান কলেজ

কদিন আগেও মনে হচ্ছিল, বেশ একটা ছুটিতে আছি, কলেজে যাওয়ার অত তাড়া নেই। কিন্তু ৪ অক্টোবর যখন বই-খাতা নিয়ে ল্যাপটপের সামনে বসলাম, শিক্ষকের চেহারা মনিটরে ভেসে উঠল, মনে হলো প্রিয় সরকারি বিজ্ঞান কলেজে সরাসরি গিয়ে ক্লাসের অভিজ্ঞতা কত দারুণ হতে পারত!

প্রথম দিনে সময়মতো অনলাইন লাইভে এসে সরকারি বিজ্ঞান কলেজের শিক্ষকেরা আমাদের স্বাগত জানান। ঘরে বসেও সবার অস্থিরতা টের পাচ্ছিলাম। ক্লাসরুমে ফেরার আকুতিগুলো জমা হচ্ছিল মন্তব্যের ঘরে। শিক্ষকদের অনুভূতিও মনে হয় প্রায় একই রকম ছিল। তাঁরাও জানালেন, নতুন মুখগুলো দেখতে তাঁরা কতটা আগ্রহী। ক্লাস হচ্ছিল ফেসবুক লাইভে। শিক্ষকেরা আমাদের মুখ দেখতে পাচ্ছিলেন না, তবু তাঁদের আগ্রহের কমতি ছিল না।

ক্লাসরুমে বসে ক্লাস করা, আর বাসায় বসে স্ক্রিনে চোখ রেখে ক্লাস করায় যে আকাশ-পাতাল তফাত, স্পষ্ট বুঝতে পারছিলাম আমরা। আমাদের চেয়ে বোধ হয় বেশি অস্বস্তিতে ছিলেন শিক্ষকেরা। কমেন্টের ঘরে প্রশ্ন করার সুযোগ ছিল, কিন্তু আমরা কে কতটা সাড়া দিচ্ছি, বোঝার উপায় ছিল না। এই দিকগুলো বাদ দিলে বলা যায়, কলেজ প্রাঙ্গণ আমার ল্যাপটপের পর্দায় কিছুক্ষণের জন্য হাজির হয়েছিল। এত যান্ত্রিকতার ভিড়েও শিক্ষকদের মমতা, সহপাঠীদের বন্ধুত্বের উষ্ণতা টের পেয়েছি। দীর্ঘদিন ক্লাসের বাইরে থাকার পর এটা একটা অন্য রকম অনুভূতি।

প্রথম দিন কলেজে না থাকতে পারার আক্ষেপটা বোধ হয় আজীবন থাকবে, পাশাপাশি নতুন বন্ধুদের সঙ্গে দেখা না করতে পারার দুঃখও। আশা করি, এই বিষণ্ন দিনগুলো দ্রুতই কেটে যাবে, পা রাখতে পারব ক্যাম্পাসে।

default-image

কথা ছিল বন্ধুরা মিলে একই বেঞ্চে বসব

মৌনতা নাথ, মুরারিচাঁদ কলেজ, সিলেট

স্কুলজীবনের বন্ধুদের যেন কলেজজীবনেও একই বেঞ্চে পাই, দশম শ্রেণিতে ওঠার পর থেকেই মনে মনে এমনটা চাইছিলাম।আমরা সবাই চাইতাম ঐতিহ্যবাহী মুরারিচাঁদ কলেজে পড়ব। সেখানে পড়তে হলে এসএসসির ফল খুব ভালো হতে হয়। দশম শ্রেণির অর্ধবার্ষিক পরীক্ষার ফল যখন দেওয়া হলো, দেখা গেল আমার চেয়ে আমার বন্ধুদের নম্বর বেশ ভালো। তাই অর্ধবার্ষিক পরীক্ষার পর পড়ালেখা শুরু করলাম পুরোদমে।

এসএসসি পরীক্ষা ভালো হলো। ফলাফল পাওয়ার জন্য উদ্‌গ্রীব হয়ে উঠেছিলাম। কিন্তু হঠাৎ করেই করোনাভাইরাসের থাবায় সবকিছু থমকে গেল। শুরু হলো দীর্ঘ প্রতীক্ষা। অবশেষে এসএসসির ফলাফল প্রকাশিত হলো গত ৩১ মে। আমি জিপিএ–৫ পেলাম। কিন্তু কলেজে ভর্তির বিষয়টা তখনো অনিশ্চিত। আবারও দীর্ঘ প্রতীক্ষা।

অনলাইনের মাধ্যমে ঘরে বসেই কলেজে ভর্তি হলাম, নোটিশ পেলাম—৫ অক্টোবর থেকে অনলাইনে আমাদের ক্লাস শুরু হবে। দীর্ঘ ক্লান্তিকর অপেক্ষার পর এবার শুরু হলো রোমাঞ্চকর অপেক্ষা! কিন্তু অনলাইন ক্লাসে যখন মোবাইলের সামনে বসলাম, কেন জানি না, মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গিয়েছিল। যেখানে কথা ছিল নতুন পোশাক পরে, কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে সব বন্ধু মিলে একসঙ্গে কলেজে যাব, আজকের এই দিনে আমরা একে অন্যকে দেখতেই পারছি না। যে জায়গায় কথা ছিল একই বেঞ্চে বসে ক্লাস করব, সেই জায়গায় আমাদের সবার মধ্যে কত দূরত্ব! ভেবেছিলাম কলেজের প্রথম দিন টিফিনের সময় বন্ধুরা মিলে কলেজের পুরো ক্যাম্পাস স্বাধীনভাবে ঘুরব, সেই জায়গায় এখন আমরা ছোট্ট মোবাইলের সামনে বন্দী হয়ে আছি।

সৃষ্টিকর্তার কাছে একটাই প্রার্থনা—আমরা যেন এই মহামারি কাটিয়ে উঠতে পারি।

মন্তব্য পড়ুন 0