default-image

নিশ্বাসে ছড়াচ্ছে অদৃশ্য জীবাণু। স্পর্শ করা বারণ। টিভির পর্দায় হিজিবিজি...রেখাচিত্র। আর সবার মতো একটা অনিশ্চিত সময়ের দিন গুনছিলেন হাসিব, রুদ্র, কনক, সজীব, প্রান্তরাও। লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার এই শিক্ষার্থীরা সবাই একসময় স্থানীয় সরকারি আলিমুদ্দিন কলেজে পড়েছেন। এখন তাঁরা দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী। গত বছর ১৭ মার্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরপরই বাড়ি ফিরেছিলেন তাঁরা। অদ্ভুত এক ঘরবন্দী সময় কাটছিল তাঁদের। সোঁদা মাটির গন্ধ, দিগন্তবিস্তৃত সবুজ খেত, কলেজমাঠ, শালবন, খরপো দোলা, তিস্তার পাড় ডাকছিল হাতছানি দিয়ে।

কিন্তু এই ঘোর লাগা সময়ে 'ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া' শৈশবের বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করার জো ছিল না। খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রুদ্র হাসান বলছিলেন, 'ঘরের সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে সারাক্ষণ শুধু ভাবতাম, কিছু একটা করতে হবে। এর মধ্যে সবকিছু সীমিত আকারে খুলে দেওয়া শুরু হলো। স্বাস্থ্যবিধি মেনে আমরাও বাইরে বের হওয়ার কিছুটা সুযোগ পেলাম। তখন বিভিন্ন বর্ষের শিক্ষার্থীরা এক হয়ে অর্থ সংগ্রহ করে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছি। কিন্তু প্রতিদিন মৃতের সংখ্যা গুনতে গুনতে এক অদ্ভুত বিষণ্নতা ভর করছিল। কলেজমাঠের আড্ডায় আমাদের কলেজের সুবর্ণজয়ন্তীর প্রসঙ্গটা শুনে হঠাৎই একটা গান বাঁধার প্রস্তাব দিলেন হাসিব ভাই।'

বিজ্ঞাপন

প্রাণের গানে

হাতীবান্ধা উপজেলার সবচেয়ে বড় উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠান সরকারি আলিমুদ্দিন কলেজ। ১৯৭০ সালে প্রতিষ্ঠিত এই কলেজে বর্তমানে প্রায় সাড়ে সাত হাজার শিক্ষার্থী রয়েছেন। উচ্চমাধ্যমিক ও ডিগ্রির পাশাপাশি এখানে ১৩টি বিষয়ে স্নাতক ও পাঁচটি বিষয়ে স্নাতকোত্তর পড়ার সুযোগ আছে।

কলেজটির প্রাক্তন শিক্ষার্থী এ এম কুরাইশ হাসিব এখন খুলনা মেডিকেল কলেজে পড়ছেন। তিনি বলেন, '২০২০ সালে আমরা অনেক কিছু হারিয়েছি। এর মধ্যে আমাদের প্রিয় প্রতিষ্ঠানের সুবর্ণজয়ন্তীও উদ্‌যাপন করা যাচ্ছে না। তখন আড্ডা থেকেই হুট করে মাথায় আসে, কলেজের যে সুখস্মৃতি আমরা সব সময় স্মরণ করি, যা কিছু নিয়ে স্মৃতিকাতর হই, সেসব নিয়ে একটা গান বাঁধা যায় কি না। কথা, সুর আর সিনেমাটোগ্রাফির মেলবন্ধনে প্রিয় ক্যাম্পাসকে স্মরণ করতে পারলে একটা স্থায়ী কাজ হবে। আর আমরাও এই বিষণ্নতা থেকে কিছুটা মুক্তি পাব। সেই ভাবনা থেকেই আমাদের প্রিয় ক্যাম্পাসকে নিয়ে গান লেখা ও সুর করা।'

আড্ডায় প্রসঙ্গটা উঠল ঠিকই, কিন্তু কাজ করতে নেমে দেখা গেল, গান বাঁধা মোটেই সহজ কাজ নয়। দুই রাত নির্ঘুম কাটিয়ে অবশেষে গানের কথা লিখে ফেললেন হাসিব। আড্ডার পাত্র-পাত্রীরা প্রায় সবাই গানের কথা পছন্দ করলেন। সুর কী হবে, তা নিয়ে রীতিমতো গবেষণা চলল রাত-দিন। আগে সুর করার অভিজ্ঞতা আছে রুদ্র হাসানের। মাসুম বিল্লাহর সার্বক্ষণিক সহযোগিতায় গানের সুরারোপের দায়িত্ব চাপল রুদ্রর ওপর। প্রায় ১৫ দিনের চেষ্টা, অনেক কাটাছেঁড়ার পর ঠিক হলো গানের সুর।

প্রিয় ক্যাম্পাস

গানে কণ্ঠ দেওয়ার জন্য আগে থেকেই প্রস্তুতি সেরে রেখেছিলেন সাইদা জামান, শাফিন তারিক, নাহিদ, শাহরিয়াররা। কিন্তু গোল বাঁধল রেকর্ডিংয়ে এসে। হাতীবান্ধায় কোনো মিউজিক স্টুডিও নেই। যেতে হবে রংপুর; কিন্তু করোনাকালে তা সম্ভব নয়। পরে পথ দেখালেন রুদ্র।

একটি কনডেনসার মাইক্রোফোন আর হাতে তৈরি আরও কিছু যন্ত্রানুষঙ্গ সম্বল করে রুদ্র তাঁর বাসার একটি ঘরেই তৈরি করলেন অস্থায়ী স্টুডিও। চার দিনের ঘামঝরা চেষ্টায় শেষ হলো গানের রেকর্ডিং।

এরপর দৃশ্যধারণের পালা। হাসিবের পরিচালনায় সাইয়েদুল মোস্তায়িনের সিনেমাটোগ্রাফিতে দৃশ্যধারণের কাজ চলল প্রায় দুই মাস। প্রতিষ্ঠানটির ২০১৬ থেকে ২০২০ শিক্ষাবর্ষের প্রায় ৬০ জন প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থী, কলেজের অধ্যক্ষ শামসুল হকসহ ছয়জন শিক্ষক মিউজিক ভিডিওটিতে অংশ নিয়েছেন। গত ১১ ফেব্রুয়ারি রাতে কলেজের শিক্ষার্থীদের ফেসবুক পেজ 'ডোপামিনোগ্রাফি' থেকে 'প্রিয় ক্যাম্পাস' শিরোনামে গানটি মুক্তি পায়।

এরই মধ্যে এই গান বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থীদের মধ্যে বেশ সাড়া ফেলেছে, স্মৃতিকাতর করেছে সবাইকে। ফেসবুক পেজের নাম ডোপামিনোগ্রাফি কেন? জানতে চাইলে মেডিকেলের শিক্ষার্থী হাসিব বলেন, 'মানবদেহে ডোপামিন নামের একটি হরমোন আনন্দ-অনুভূতির আচরণিক সাড়া দানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আমরাও এই দুঃসহ স্মৃতি ভুলে কিছুটা আনন্দের অন্বেষণ করেছি। কেননা, আমরা বিশ্বাস করি, এই মঙ্গলালোকে দিন শেষে আনন্দটাই বেঁচে-বর্তে থাকে।'

বিজ্ঞাপন
প্র স্বপ্ন নিয়ে থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন