default-image

আমার বই পড়া

আমি বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রামে বড় হয়েছি। তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় বাবার সঙ্গে ঢাকায় এলাম। বাবা নিউমার্কেটের একটা বইয়ের দোকানে নিয়ে বলেছিলেন, ‘তুমি তোমার পছন্দমতো দু–তিনটা বই তুলে নাও।’ আমি দুটো বই নিয়েছিলাম। একটা হচ্ছে হাবীবুর রহমানের ল্যাজ দিয়ে যায় চেনা। এটা কিন্তু আমি নিজের জন্য কিনিনি। ভেবেছিলাম ছোট বোনের জন্য একটা বই বাড়িতে নিয়ে যেতে হবে।

দ্বিতীয় যে বইটা কিনেছি, সেটার বাংলা নাম ছিল বিজ্ঞানের খেলাঘর। ফুলবাড়ি স্টেশনেই আমার ল্যাজ দিয়ে যায় চেনা পড়া শেষ হয়ে গিয়েছিল। দ্বিতীয় বইটা পড়তে ও গবেষণা করতে লেগেছে এক বছর। সে সময় জেলা গ্রন্থাগার নামে ছোট একটা পাঠাগার ছিল। সেখানে প্রায় দুই হাজারের মতো বই ছিল। বেশির ভাগই কল্পকাহিনি। চার আনা দিলে এক সপ্তাহের জন্য একটা বই পাওয়া যেত।

চট্টগ্রামের ফৌজদারহাট যাওয়ার পর আমার জীবনটা একটু বদলে গেল। বাবা ইতিহাস, চিকিৎসা, ইসলাম ও তুলনামূলক ধর্ম–সম্পর্কিত বইয়ের আগ্রহী পাঠক ও আলোচক ছিলেন। বই পড়ার সময় যে পৃষ্ঠাগুলো তিনি উপযুক্ত মনে করতেন, সেগুলোর নোট নিতেন, দাগ দিতেন, আমাদের সঙ্গে আলোচনা করতেন—আমরা বুঝি বা না–বুঝি। আমি সব সময় প্রশ্ন করতাম। আমার মা ও ছোট বোন সাধারণত শুনত। আবুল হাসান নামের একজন বাংলার অধ্যাপকের কথা শুনে কল্পকাহিনির বইয়ের সঙ্গে আমি রীতিমতো সম্পর্কচ্যুত হয়ে গেলাম। অষ্টম বা নবম শ্রেণিতে ফিকশন থেকে নন–ফিকশনের দিকে ঝুঁকলাম। তখন আমি শুধু বই কিনতাম না, ঢাকা থেকে বা মাঝেমধ্যে করাচি শহরের প্যারাডাইস বুক স্টল থেকেও বই আনাতাম। বই কেনার জন্য টাকা দেওয়ার ব্যাপারে বাবা খুব উদার ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন এলাম, তখন আমার সঙ্গে এক ট্রাঙ্ক বইও এল।

বিজ্ঞাপন

যেভাবে পদার্থবিদ্যায়

আমি খুব সৌভাগ্যবান, এমন সব অধ্যাপকের সঙ্গে আমার যোগাযোগ ছিল বা হয়েছে, যাঁরা আমাকে পথ দেখিয়েছেন এবং আমি সেখান থেকে সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করেছি। পথ অনেকেই দেখায়, কিন্তু আপনার বুঝতে হবে কোন পথটা সঠিক। দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়ার সময় ভিজিবল ইউনিভার্সিটির ইউনিভার্সের ডায়ামিটার ক্ল্যাসিক্যাল ফিজিকসের ধারণা দিয়ে একটা হিসাব করেছিলাম। আমার কাছে মনে হয়েছিল সাংঘাতিক কিছু একটা করেছি। পরে জেনেছি, সেটা ছিল পুরোপুরি ভুল হিসাব। সেই যুগে প্রফেসর আবদুস সালামকে আমি চিঠি লিখি। তিনি তখন যুক্তরাজ্যে ইম্পিরিয়াল কলেজের তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক ছিলেন। তিনি চিঠিটা আবর্জনা হিসেবে ফেলে দিতে পারতেন কিন্তু তা করেননি। আমাকে লিখেছেন, ‘আমি কিন্তু এই বিষয়ে অভিজ্ঞ নই। আমি একজন অভিজ্ঞ ব্যক্তির কাছে পাঠাব।’ তারপর অভিজ্ঞজনের কাছ থেকে আমার কাছে চিঠি আসে, তিনি থাকতেন জার্মানিতে। ইংরেজিতে লেখা দুই পৃষ্ঠার চিঠি। প্রথম লাইনটাই একটা সমীকরণ দিয়ে শুরু। এই সমীকরণ বুঝতে আমার প্রায় ১০ থেকে ১২ বছর সময় লেগেছে। প্রথম কথা হচ্ছে, বড় মাপের মানুষ সাধারণত কাউকে অবজ্ঞা করেন না। এই চিঠির কারণেই হয়তো আমি পদার্থবিজ্ঞানে এসেছি।

বিজ্ঞাপন

তরুণদের জন্য

আমি তরুণদের সব সময় বলি, আজও বলব—আপনারা বড় স্বপ্ন দেখুন। তরুণেরা প্রায়ই হতাশ হয়ে যান। আমি বলব, ধৈর্য ধরুন। হতাশ হতে পারেন কিন্তু বয়স্ক মানুষের কথা শুনে আতঙ্কিত হয়ে যাবেন না। শুধু তাঁদের দিকে তাকিয়ে কাজ করলে হবে না। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ আপনাকে উৎসাহিত করবে। পদে পদে শত শত মানুষ আপনাকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করবে। দুর্ভাগ্যবশত এটাই কিন্তু জীবন।

দ্বিতীয় কথা হলো, কঠোর পরিশ্রম করুন। সফলতার কোনো সহজ পথ নেই। কঠোর পরিশ্রমের কোনো বিকল্প নেই। আরেকটা বিষয় হলো নেটওয়ার্ক। মানুষের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার চেষ্টা করুন। হয়তো সঠিক মানুষটির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সৌভাগ্য আপনার হবে। সেই সঠিক মানুষ হতে পারেন কোনো বন্ধু, শিক্ষক, অভিভাবক, প্রতিবেশী বা যে কেউ। কে যে আপনাকে সামনে এগোতে সাহায্য করবেন, আপনি জানেন না।

সুতরাং কাউকে কখনো উপেক্ষা করবেন না। আপনাদের স্বপ্নগুলো কোনো দিন ছাড়বেন না।

মন্তব্য পড়ুন 0