default-image

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের চশমা থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে তৈরি হচ্ছে একটি বাংলা ফন্ট। শুনে একটু অবাকই হয়েছিলাম। এই লিপি বা ফন্টের নকশাকার তৌহিদুল ইসলাম হোয়াটসঅ্যাপে কিছু নমুনা পাঠালেন। দেখে বলতেই হলো—বাহ!

ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে শেষ বর্ষে পড়েন তৌহিদুল ইসলাম। তাঁর বন্ধু, সহপাঠী অনেকেই তাঁর সঙ্গে বাংলা ফন্ট তৈরির কাজ করছেন কয়েক বছর ধরে। বেঙ্গল ফন্টস নামের একটি ওয়েবসাইটের মাধ্যমে ফন্টগুলো ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন তাঁরা। বাংলা ফন্টের এমন আরও কয়েকটি ওয়েবসাইট আছে। যেমন লিপিঘর, অক্ষর ৫২। এই ওয়েবসাইটগুলো থেকে নেওয়া ব্যতিক্রম, দৃষ্টিনন্দন ফন্টে লেখা বাংলা আজকাল সাইনবোর্ড, বিজ্ঞাপন, পোস্টারসহ নানা জায়গায় চোখে পড়ে। প্রতিটি ফন্টের পেছনেই যে কোনো না কোনো শিল্পীর অক্লান্ত পরিশ্রম আর ভালোবাসার গল্প জড়িয়ে আছে, সেটা কি জানেন?

বিজ্ঞাপন

যেভাবে আবির্ভাব

তৌহিদুল ইসলামের তৈরি করা প্রথম বাংলা ফন্টের নাম ছিল আবির্ভাব। ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির মাল্টিমিডিয়া অ্যান্ড ক্রিয়েটিভ টেকনোলজি বিভাগের ছাত্র তিনি। পড়ালেখার অংশ হিসেবে ‘টাইপোগ্রাফি’ কোর্স করেছিলেন প্রথম বর্ষে। কোর্সের শিক্ষক মিজানুর রহমানের কাছ থেকে হাতেখড়ি নিয়ে আবির্ভাব ফন্টটি তৈরি করেন তৌহিদুল। বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে সেটি উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। তারপর?

‘ফন্টটা অনলাইনে ছাড়ার পরপরই দারুণ সাড়া পেলাম। এক মাসের মধ্যে সেটি প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ নামালেন (ডাউনলোড)। একদিন দেখি ঢাকা সিটি কলেজের সামনে একটা সাইনবোর্ড, সেখানে আবির্ভাব ফন্টে লেখা। দেখে কেন যেন খুব ভালো লাগল। সঙ্গে এটাও বুঝলাম, বাংলা ফন্টের বেশ চাহিদা আছে,’ বলছিলেন তৌহিদুল।

ধীরে ধীরে বিভাগের আরও কয়েকজন শিক্ষার্থী যুক্ত হলেন তৌহিদুলের সঙ্গে। একসঙ্গে তাঁরা তৈরি করেছেন বেশ কয়েকটি ফন্ট। এখন তাঁদের ওয়েবসাইট—বেঙ্গল ফন্টসে ১২টি বাংলা ফন্ট আছে। নামগুলোও চমকপ্রদ। যেমন মৃদুল, অব্যয়, বসন্ত, দুর্বার...প্রতিটি নামের পেছনেই কোনো না কোনো গল্প আছে। আজ একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে ‘দীঘল’ নামে একটি ফন্ট উন্মুক্ত করার কথা। আর বঙ্গবন্ধু নামের ফন্টের উদ্বোধন হবে আগামী মার্চ মাসে।

তৌহিদুল বলছিলেন, ‘বঙ্গবন্ধু সব সময় আমাকে ভীষণ অনুপ্রাণিত করেন। তাঁর চশমাটা বেশ আইকনিক। তাই চশমার নকশা আদর্শ ধরে আমি বাংলা বর্ণমালার নকশা করেছি। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে এটা বিনা মূল্যে অনলাইনে উন্মুক্ত করে দেওয়ার ইচ্ছা আছে।’

অনলাইনে ৯৯ টাকা পরিশোধ করে বেঙ্গল ফন্টসের একটি অ্যাপ (অ্যাপ্লিকেশন) নামিয়ে নিলে একসঙ্গে সব কটি ফন্ট পাওয়া যাবে। তৌহিদুলদের শিক্ষক, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির জ্যেষ্ঠ প্রভাষক মিজানুর রহমান বলছিলেন, ‘যেকোনো সৃজনশীল কাজই আসলে বিনা মূল্যে দিয়ে দেওয়াটা ঠিক নয়। তাহলে একসময় শিল্পীরা উৎসাহ হারিয়ে ফেলেন। আমাদেরও আসলে নির্দিষ্ট ওয়েবসাইট থেকে ফন্ট কিনে ব্যবহার করার চর্চা করা উচিত। তাহলে বাংলা ফন্টের এই সমৃদ্ধি অব্যাহত থাকবে, ছেলেমেয়েরা আগ্রহী হয়ে উঠবে।’

মিজানুর রহমানের কাছেই জানলাম, তাঁর আরেক ছাত্র ইমরুল কায়েস গুগলের বাংলা ফন্ট নিয়ে কাজ করছেন। বিস্তারিত ইমরুলের মুখ থেকেই শোনা হলো। বললেন, ‘বেঙ্গল ফন্টসে কয়েক বছর ধরে কাজ করছি। অব্যয়, অনির্বাণ, শরৎ নামে তিনটি ফন্ট তৈরি করেছি। ফন্ট নিয়ে কাজ করতে করতেই দেখলাম, গুগল ডকে বাংলা ফন্টে লেখা নিয়ে কিছু সমস্যা আছে। নির্দিষ্ট কিছু ফন্ট ছাড়া লেখা যায় না, অনেক ফন্ট ভেঙে যায়। তাই গুগল ডকের উপযোগী একটি ফন্ট বানানোর চেষ্টা করছি আমি। ইচ্ছা আছে, এই ফন্টটা গুগলের কাছে পৌঁছে দেব।’

সীমানা পেরোনো লিপিঘর

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ থেকে পাস করে বেশ কয়েক বছর ধরেই বাংলা ফন্ট নিয়ে কাজ করছেন তৌফিকুর রহমান। লিপিঘর নামের ওয়েবসাইটে পাওয়া যাবে তৌফিকুরদের করা বাংলা ফন্টগুলো। তিনি বলেন, ‘আমাদের এই প্রচেষ্টা ভৌগোলিক সীমানা পেরিয়ে গেছে। ভারত ও বাংলাদেশের শিল্পীরা মিলে আমরা লিপিঘরের জন্য ফন্ট তৈরি করছি। এখন আমাদের ওয়েবসাইটে ৪৬টি বাংলা ফন্ট পাবেন।’

একুশে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে একটি বিশেষ প্রকল্প হাতে নিয়েছে লিপিঘর। ভাষাশহীদদের নামে পাঁচটি ফন্ট তৈরি করেছেন তাঁরা। ফন্টগুলোর পেছনে বাংলাদেশ ও ভারতের গ্রাফিক ডিজাইনাররা কাজ করেছেন। তৌফিকুর জানালেন, লিপিঘরেরই একটি উদ্যোগের নাম ‘অক্ষর ৫২ ’। অক্ষর ৫২ ওয়েবসাইটের সব ফন্টই বিনা মূল্যে পাওয়া যায়।

লিপিঘর দলের সর্বকনিষ্ঠ সদস্যের নাম নূরুল আলম, ডাকনাম আদর। ঢাকার মোহাম্মদপুর প্রিপারেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র সে। এরই মধ্যে পাঁচটি ফন্ট তৈরি হয়েছে তার হাতে—আদর সুরভি, আদর বাক্স, আদর স্বদেশ, আদর ইস্পাত ও আদর নোয়াখালী। আরও বেশ কয়েকটি ফন্ট তৈরির কাজ শুরু করেও শেষ করা হয়নি, কারণ সামনে এইচএসসি পরীক্ষা। এখন পড়ালেখার বেশ চাপ। আদর বলছিল, ‘আমার সমবয়সী অনেকেই দেখা যায় অবসরে পাবজি বা ফ্রি ফায়ারের মতো গেম খেলে সময় কাটায়। আমি সময়টা ফন্ট তৈরির পেছনে ব্যয় করি। একটা ফন্টের পেছনে অনেক শ্রম দিতে হয়, সময় দিতে হয়। ভবিষ্যতেও আমি ফন্ট নিয়ে কাজ করতে চাই।’

যে যত কথাই বলুক না কেন, ফন্ট ভাষার জন্য বৈচিত্র্য আনে। অ্যাডোবির হাজার হাজার ফন্ট আছে। এর মধ্যে কোনো কোনো ফন্ট হয়তো বছরে একবার কেউ ব্যবহার করে, কিন্তু সে ফন্টটি আছে—এটাই স্বাধীনতা। আমাদের যে প্রবণতা তাতে কাগজের পত্রিকা, বই অর্থাৎ মুদ্রিত মাধ্যমেই শুধু বৈচিত্র্যময় ফন্ট ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। অন্যান্য জায়গায় মানে ডিজিটাল মাধ্যমে বিচিত্র রকমের ফন্ট ব্যবহার করতে পারি না। মুদ্রিত নকশায় যে স্বাধীনতা আছে, ইন্টারনেট বা ডিজিটাল মাধ্যমে তা নেই। ফন্টে বৈচিত্র্য বা সৃজনশীলতা আনতে গেলে আসকি ঘরানার ফন্ট বানাতে হবে। ইউনিকোডে ফন্ট বানানো হয় বেশি, কিন্তু সেখানে বৈচিত্র্য আসে না। আমাদের বিজয় বাংলা সফটওয়্যারের সঙ্গে ১০৮টি ফন্ট আমরা এখন বানিয়েছি। বিজয়ের নতুন সংস্করণের সঙ্গে এগুলো পাওয়া যায়। তরুণেরা যে বাংলা ফন্ট তৈরি করছেন, সেই উদ্যোগকে আমি স্বাগত জানাই। বাংলার মতো ভাষার জন্য অনেক অনেক ফন্ট থাকা প্রয়োজন। আমাদের এখানে একটা ভুল ধারণা রয়েছে, ভাষার জন্য কোনো কাজ করলে সেটা বিনা মূল্যে দিতে হবে। এটা আমি মনে করি না। যিনি বা যাঁরা ফন্ট বানাচ্ছেন, তাঁদের পেশাদারত্বের মূল্য দিতে হবে। কিনে নেওয়া বা গ্রাহক হয়ে ব্যবহার করা—এই দুই নিয়ম থাকা উচিত। এতে ফন্ট তৈরিতে অনেকে এগিয়ে আসবেন। বাংলা ভাষা লেখার ক্ষেত্রেও বৈচিত্র্য যোগ হবে।
মোস্তাফা জব্বার, বিজয় বাংলা সফটওয়্যারের নির্মাতা এবং ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী
বিজ্ঞাপন
প্র স্বপ্ন নিয়ে থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন