default-image

হাজার ব্যস্ততার ভিড়ে কখনো কি মনে হয়, ‘নিজের জীবন’—বলে আপনার কিছু নেই? অন্যের দেওয়া কাজ করে করে সময় চলে যাচ্ছে? পরিবারকে সময় দিতে পারছেন না, অবসরে প্রিয় বই পড়া হয় না, বুঝতে পারছেন না কোন কাজে আপনি মনোযোগ দেবেন? দিন শেষে কি মনে হয়, জীবনটা একটা অগোছালো, দিকভোলা জাহাজ?

ব্যবস্থাপনা পরামর্শক ও পাবলিক স্পিকার গ্রেগ ম্যাকিওনের একটা বই পড়ে ফেলতে পারেন। নাম এসেনশিয়ালিজম: দ্য ডিসিপ্লিনড পারস্যুট অব লেস। লেখক জানান, কীভাবে আমরা অপ্রয়োজনীয় বিষয়গুলো ঝেড়ে ফেলে যেগুলো সত্যিকারের অর্থ তৈরি করে আমাদের জীবনে, সেগুলোর প্রতি মন দিতে পারি। যে ব্যক্তি এই অপ্রয়োজনীয় ঝঞ্ঝাট থেকে নিজেকে আলাদা করতে পারেন, ম্যাকিওনের মতে—তিনি হলেন একজন এসেনশিয়ালিস্ট। অন্যদিকে যিনি সব বিষয়ে মন দেন, অথচ কোনোটিতেই মনোযোগ ধরে রাখতে পারেন না, তিনি হলেন একজন নন-এসেনশিয়ালিস্ট।

বিজ্ঞাপন

আজকের পৃথিবীতে ‘এসেনশিয়ালিস্ট’ হওয়ার গুরুত্ব

আমাদের চারপাশে প্রচুর সুযোগের খোলা দুয়ার। হাতের স্মার্টফোনে ‘সার্চ’ করলেই পাওয়া যায় হাজারো তথ্য। সামাজিক চাপে, পাওয়ার অতি আকাঙ্ক্ষায় অনেক সময় আমরা এমন সব কাজে জড়িয়ে যাই, যা আমাদের জীবনে সত্যিকারের অর্থ তৈরি করে না, বরং সুখকে কেড়ে নেয়। তাই আজকের এই পৃথিবীতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে গতানুগতিক ও তুচ্ছ বিষয়াদি থেকে আলাদা করাটা শুধু গুরুত্বপূর্ণই নয়, অপরিহার্যও।

কীভাবে ‘এসেনশিয়ালিস্ট’ হব?

এসেনশিয়ালিস্ট হওয়ার জন্য আমাদের প্রথমে বুঝতে হবে একজন এসেনশিয়ালিস্ট কীভাবে চিন্তা করেন। তিনি মনে করেন, আমাদের জীবনে প্রায় সবকিছুই অগুরুত্বপূর্ণ; অল্প কিছু বিষয়ই সত্যিকারের অর্থ বহন করে। একজন ব্যক্তির জন্য সব সুযোগ সমান নয়। কোনো কোনো সুযোগ বা কাজ আমাদের জীবনে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আমাদের প্রত্যেকেরই বাছাই করার ক্ষমতা আছে; যদিও অনেক সময়ই আমরা সেটি ভুলে যাই। একজন এসেনশিয়ালিস্ট তাঁর বাছাই করার ক্ষমতাকে কাজে লাগান এবং সিদ্ধান্ত নেন। তিনি কাজের গুণগত মান রক্ষায় সচেষ্ট হন।

অপর দিকে একজন নন-এসেনশিয়ালিস্ট বাছাই বা সিদ্ধান্ত গ্রহণে খুব বেশি সময় নেন না। অনেক সময়ই তাঁকে নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে প্রচুর অপ্রয়োজনীয় কাজ করতে হয়। ফলে তিনি তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোয় পর্যাপ্ত মনোযোগ দিতে পারেন না।

লেখকের মতে একজন এসেনশিয়ালিস্ট মূলত তিন ধাপে কাজ করেন।

১. মুখোমুখি হওয়া

প্রথম ধাপে তিনি নানা নতুন বিষয়ের মুখোমুখি হন। সেগুলো বোঝার চেষ্টা করেন। তিনি অপরের কথা শোনেন, প্রশ্ন-বিতর্ক করেন, চিন্তাভাবনা করেন। সামনে থাকা নানা বিকল্প থেকে সঠিক বিষয়টিকে আলাদা করেন। ফলে সময়ের হুজুগে বা ট্রেন্ডে অন্ধভাবে গা ভাসিয়ে দেন না।

তিনি নিয়মিত আলাদা সময় নিয়ে চিন্তাভাবনা ও পড়াশোনা করেন। এ সময়টাতে মনোযোগ কেড়ে নেয় এমন ব্যক্তি, বস্তু ও পরিবেশ থেকে দূরে থাকেন। নতুন সুযোগকে ভিন্ন আলোয় দেখার চেষ্টা ও সেটি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন একজন এসেনশিয়ালিস্ট। বিগ পিকচার বা বড় চিত্রটি সব সময় মাথায় রাখেন তিনি। ফলে তুচ্ছ বিষয় তাঁকে মূল পথ থেকে সরাতে পারে না সহজে। ঘুম বা বিশ্রামকে তিনি সময় নষ্ট বলে মনে করেন না, বরং তিনি বিশ্বাস করেন, পর্যাপ্ত ঘুম কাজের গতি ও সৃজনশীলতা বৃদ্ধি করে।

২. ছাঁটাই করা

প্রয়োজনীয় বিষয়ে মন দিতে হলে দরকার অপ্রয়োজনীয় বিষয়গুলো সরিয়ে ফেলা। তাই সঠিক বিষয়টি খুঁজে বের করার পর দ্বিতীয় ধাপে একজন এসেনশিয়ালিস্ট অপ্রয়োজনীয় বিষয়গুলোকে সরিয়ে ফেলেন। একজন নন-এসেনশিয়ালিস্টের লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য অস্পষ্ট। অপর দিকে একজন এসেনশিয়ালিস্টের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও কর্মপরিকল্পনা সরল ও স্পষ্ট। এই স্পষ্ট লক্ষ্য অনেক অপ্রয়োজনীয় বিষয়কে সহজেই আলাদা করে ফেলে। ‘না’ বলতে পারা একটি গুণ। বিনয়ের সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় সুযোগ বা অনুরোধের ক্ষেত্রে না বলার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় বিষয়ে মন দেন একজন এসেনশিয়ালিস্ট। এটি অনেক সময় ক্ষণিকের জন্য অপ্রস্তুত মুহূর্ত তৈরি করলেও পরবর্তী সময়ে মানুষের শ্রদ্ধা পেতে সহায়তাই করে। কারণ অন্যরা জানে, একজন এসেনশিয়ালিস্ট সেই কাজগুলোতেই মন দেন, যেগুলো তিনি কার্যকরভাবে সম্পন্ন করতে পারেন। তিনি নিজের ভুল স্বীকার করেন। অপ্রয়োজনীয় ও গতানুগতিক কোনো প্রকল্পে জড়িয়ে পড়লেও চিহ্নিত করার পর সেটি থেকে বেরিয়ে আসেন। তিনি সময়কে কার্যকরভাবে ব্যয় করতে চান। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে স্পষ্ট সীমারেখা তৈরি করেন তিনি। এ কারণে সর্বোপরি তাঁর স্বাধীনতা বৃদ্ধিই পায়।

৩. বাস্তবে রূপ দেওয়া

তৃতীয় ধাপে তিনি তাঁর কর্মপরিকল্পনাকে বাস্তবায়ন করেন, বাধা দূর করেন। এমন একটি পরিবেশ বা ব্যবস্থা তৈরি করতে সময় বিনিয়োগ করেন, যেখানে স্বল্প আয়াসে, সহজে ও কার্যকরভাবে তিনি কাজ সম্পন্ন করতে পারেন। তিনি জানেন জীবনে অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে। তাই শুরুতেই কিছুটা বেশি সময় বরাদ্দ করে ফেলেন। একজন এসেনশিয়ালিস্ট পথের বাধা দূর করার মাধ্যমে কাজের গতি বাড়ানোর চেষ্টা করেন। তিনি ক্ষুদ্র থেকে শুরু করেন, এগিয়ে যাওয়ার পথে ছোট ছোট জয়কে উদ্‌যাপন করেন। এমন রুটিন তৈরি করেন, যার কারণে যেকোনো কাজ স্বল্প পরিশ্রমে করা যায়। তিনি বর্তমানকে উপভোগ করেন, অনাগত ভবিষ্যৎ বা ফেলে আসা অতীত নিয়ে অযাচিত চিন্তা করে সময় নষ্ট করেন না।

এসেনশিয়ালিস্ট জানেন, এই পথ মাঝেমধ্যে অবলম্বন করার মতো কিছু নয়; বরং তাঁর জীবনের সিংহভাগজুড়েই থাকবে প্রয়োজনীয় ও অর্থপূর্ণ সব বিষয়। প্রয়োজনীয় বিষয়কে স্পষ্টভাবে আলাদা করার মাধ্যমে তিনি তাঁর জীবনের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন, উপভোগ করেন একটি সত্যিকারের অর্থপূর্ণ জীবন।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন