বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
মেডিকেলের পড়ালেখা বেশির ভাগই হাতে-কলমে হওয়ায় অনলাইনে আমাদের ক্লাস খুব একটা কার্যকর হয়নি। তাই ক্যাম্পাস খোলার পর পড়ালেখার গতির সঙ্গে তাল মেলাতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছি। ঘড়ির কাঁটা যেন দ্বিগুণ গতিতে ছুটছে, আর আমরা তাকে ধরার চেষ্টা করছি। যদিও মেনে নিয়েছি—দীর্ঘদিনের বন্ধে যে ক্ষতি হয়েছিল, এখন তো তারই ক্ষতিপূরণ দিচ্ছি। ক্যাম্পাসে আনন্দ বলতে যা বোঝায়, মেডিকেলজীবনে তো এমনিতেও আমরা সেটা খুব বেশি পাই না। তবু শেষ সময়ে স্মৃতির ঝোলাটা যতটুকু সম্ভব ভরে নিতে চেষ্টা করব।
বিকনা ঘোষ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ
দুই বছরে সবচেয়ে বেশি মিস করেছি কলা ঝুপড়িতে আড্ডা, সবুজ ক্যাম্পাসে ঘোরাঘুরি। এত দিন পর ফিরে সেই পরিচিত ক্যাম্পাসকে যেন আরও সবুজ, সতেজ মনে হচ্ছিল। যদিও মহামারির কারণে একাডেমিক জীবনে অনেক কিছুই এখন আর আগের মতো নেই, তবু ক্যাম্পাসে পা রেখে মনে হচ্ছে যেন আবার জীবন ফিরে পেলাম।
মেহরার ইকবাল, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের শুরু থেকেই বিভিন্ন ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত। এই বিধিনিষেধের মধ্যে তাই সবচেয়ে বেশি মিস করেছি ক্লাবের অনুষ্ঠানগুলো। ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থেকে-থেকে হাঁপিয়ে উঠেছিলাম। অনলাইন থেকে অফলাইনে ফিরে এলেও ক্যাম্পাসের আগের সেই হইহুল্লোড়গুলো এখনো ফিরে পাইনি। তবে ভালো লাগছে যে সব স্বাস্থ্যবিধি মেনে শেষ পর্যন্ত ধীরে ধীরে হলেও আমরা ক্যাম্পাসজীবনে প্রবেশ করছি।
জেরিন তাসনিম আহসান, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি
করোনার বিশাল বন্ধের সময় একাডেমিক ক্ষতি নিয়ে সবার উদ্বেগ থাকলেও সত্যি বলতে আমার তেমন কোনো মাথাব্যথা ছিল না। হলজীবন ভীষণ মিস করতাম। হলে থাকার অভিজ্ঞতা আমাদের জীবনে একটা গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনে। এখানে নিজের জন্য ভাবার বা নিজেকে নিয়ে কাজ করার সুযোগ থাকে, যা সবাইকে স্বাবলম্বী হতে শেখায়। অনেক দিন পর ক্যাম্পাসে ফিরে ‘ইমিডিয়েট জুনিয়র’ ব্যাচ দেখে নিজেকে ‘বুড়ো বুড়ো’ লাগছে।
সৌভিক রহমান, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
লকডাউন, আইসোলেশন, কোয়ারেন্টিন...অনেক নতুন শব্দের পাশাপাশি বাস্তবতার সঙ্গেও পরিচিত হয়েছি মহামারিকালে। এই দীর্ঘ সময় আমাকে স্বাবলম্বী হওয়ার প্রেরণা জুগিয়েছে। ছোট ছোট ইতিবাচক পরিবর্তনগুলো ধরে রাখার চেষ্টা করছি। তবে এই খারাপ সময় সবচেয়ে বেশি যেটা মনে রাখতে শিখিয়েছে তা হলো, সবকিছুতে নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টা করা এবং সৃষ্টিকর্তার ওপর ভরসা রাখা। কেননা তিনিই ‘উত্তম পরিকল্পনাকারী।’
আফরিন জাহান, পাবনা মেডিকেল কলেজ
প্রায় দেড় বছরের বেশি সময় পর ক্যাম্পাসে গেলাম এনরোলমেন্ট করতে, একদম শেষ দিনে। ভাবলাম এমন অসচেতন, অলস বুঝি আমি একাই। কিন্তু না, আমার মতো আরও অনেক অলসদের দেখে কিছুটা স্বস্তি পেলাম। এক বান্ধবী তার সন্তানসহ ক্যাম্পাসে এসেছে। শুধু সে নয়, আরও অনেকেই এই বন্ধের সময় সংসার জীবন শুরু করেছে। বিশ্ববিদ্যালয় খোলার পর সবার মধ্যেই আনন্দ, উৎসাহ দেখতে পাচ্ছি। ক্যাম্পাসের প্রেমিক যুগলের মধ্যে দূরত্ব ঘুচেছে বটে।
তাজনুর আফরোজ, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে, দিনাজপুর
প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সাধারণত সৃজনশীল, উদ্ভাবনী ভাবনায় ডুবে থাকে। তবে এই শিক্ষার্থীরাই আবার হতাশায় ভোগে। আগে হতাশ থাকত বিনা কারণে। এবার এসে দেখি কারণ আছে। কেউ বিয়ে করতে না পেরে হতাশ, কেউ বিয়ে করে হতাশ। সেশনজটের চোখ রাঙানি তো আছেই। প্রকৌশলী হতে এসে ছেলেমেয়েরা প্রকৌশলী ছাড়া বাকি সবই হয়ে যাচ্ছে—কবি, সাহিত্যিক, ব্লগার, ইউটিউবার, উদ্যোক্তা। বিষয়টা কিন্তু মজার।
মাহমুদ আরেফিন, রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
১৮ মাস পর বিশ্ববিদ্যালয় খুলেছে। মনে হয় এক কারাবাস থেকে মুক্তি পেলাম। এখন প্রায় রাতেই বন্ধুরা মিলে মাঠে শুয়ে আকাশের তারা দেখি। গভীর রাতে চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বেসুরো গলায় গান ধরি। আড্ডা দিতে দিতেই কখনো শুনি ভোরের পাখির ডাক। বিশ্ববিদ্যালয়ে এটিই আমাদের শেষ বর্ষ। তাই কিছু স্মৃতি জমাচ্ছি, যা ভেবে কাটিয়ে দেওয়া যাবে বাকি জীবন।
হাসানুল হক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর
করোনার বন্ধের পর ক্যাম্পাসে গিয়ে প্রথম দেখা হলো গেটম্যান রহিম চাচার সঙ্গে। কথায় কথায় জানলাম, করোনায় তিনি হারিয়েছেন একমাত্র ছেলেকে। সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা ছিল না। এ রকম কিছু খারাপ খবর যেমন আছে, ভালো পরিবর্তনও হয়েছে অনেক। ক্যাম্পাসের প্রকৃতি নতুন করে সেজেছে। হাজারো শিক্ষার্থীর পদচারণে আবার মুখর হচ্ছে এই ঐতিহ্যবাহী ক্যাম্পাস।
মাসউদ রানা, কারমাইকেল কলেজ, রংপুর
আমার ভেতরে যে রন্ধনশিল্পের এক বিরল প্রতিভা লুকিয়ে আছে, তা হয়তো এই করোনার বিধিনিষেধ না এলে জানাই হতো না। শুরুতে শখ করে বাসায় রেঁধেছিলাম নুডলস। আম্মুর প্রশংসা পেয়ে আত্মবিশ্বাস এতই বেড়ে গিয়েছিল যে ঘোষণা দিয়েছিলাম, ঈদুল ফিতরের সমস্ত রান্না আমিই করব। ঈদের আগের দিন ইউটিউব দেখে শিখে নিলাম ‘হানি গ্লেজড চিলি চিকেন’ আর ‘শাহি পোলাও’। শেষমেশ শাহি পোলাওটা ভালো হলেও ‘হানি গ্লেজড চিলি চিকেন’ হয়ে গেছে ‘হানি গ্লেজড চিলি কয়লা’। এমন নতুন অনেক অভিজ্ঞতা নিয়ে আমি, আমরা আবার ফিরেছি ক্যাম্পাসে। ক্যাম্পাস যেমন বদলেছে, বদলে গেছি আমরাও।
ওয়াজেদ আল ইসলাম, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
চিরচেনা ক্যাম্পাসে চেনা মুখগুলো দেখে সত্যিই মনটা ভরে যায়। সবার মধ্যেই আনন্দের আমেজ। বন্ধের শেষ দিকেও ক্যাম্পাসে এসেছিলাম। তবে লুকিয়ে লুকিয়ে। এখন আর কোনো লুকোচুরি নেই। মাঠে বসে জমে উঠেছে আড্ডা। এত দিনের জমানো কথা যেন শেষ হতেই চায় না। শিক্ষকেরাও আগের চেয়ে বেশি আন্তরিক। আগের বিরক্তিকর ক্লাসগুলো করতেও এখন ভালো লাগে। অদ্ভুত!
মো. রুহুল ইসলাম, রংপুর পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, রংপুর
ক্লাস, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা আর লতিফ মামার চা, খাওয়ার পর বিল নিয়ে টানাটানি—এসবই তো বিশ্ববিদ্যালয়জীবন। সবই মিস করছিলাম গত দুই বছর। চতুর্থ সেমিস্টার থেকে চতুর্থ বর্ষে পৌঁছে গেলাম প্রায়। একসঙ্গে ক্লাস করার রোমাঞ্চ এখনো সেই প্রথম বর্ষের মতোই আছে। আশা করি আবার প্রাণ ফিরে পাবে আমাদের প্রিয় প্রাঙ্গণ। মালিহা তাবাস্সুম আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ
মালিহা তাবাস্সুম, আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ
এত দিন অনলাইন ক্লাসে অভ্যস্ত হওয়ার পর অফলাইনে পরীক্ষা দিতে গিয়ে মনে হচ্ছিল সবাই ফেল করব। প্রশাসন এতটাই কঠোর, পরীক্ষার সময় কোনোরকম ডানে-বাঁয়ে তাকানোর উপায় নেই আর। শুধু অফলাইন পরীক্ষাই না, এর ওপর পড়ার এত চাপ—এক সপ্তাহের মধ্যে কুইজ, টার্ম পেপার, প্রেজেন্টেশন, সব দিলাম। দম ফেলারও সময় নেই। অনলাইন পরীক্ষায় সিজিপিএ যা উঠেছিল, সব আবার কমে যাবে মনে হচ্ছে।
মাহীর বিন মেহেদী, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস, ঢাকা
ক্যাম্পাস আমার একটা শ্বাস নেওয়ার জায়গা। জীবনের বেশ কিছু কঠিন সময় ক্যাম্পাস আর ক্যাম্পাসের মানুষগুলো থাকার বদৌলতে পার করে আসতে পেরেছি। স্বভাবতই প্রায় দেড় বছর পর সেখানে ফিরতে পেরে স্বস্তি লাগছে। তবে খুলে দেওয়ার আগে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আরও সুস্পষ্ট ও নির্দিষ্ট একটা পরিকল্পনা সাজিয়ে নিলে হয়তো তাড়াহুড়া করে ক্লাস শেষ করে যেনতেনভাবে পরীক্ষায় বসতে হতো না।
তানজিয়া তাসনীম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
প্রযুক্তির বদৌলতে অনলাইন ক্লাসে বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পুরোনো চেনা মুখগুলো দেখা হয়েছে, তবু সশরীর দেখতে পারার অনুভূতি অনবদ্য। শহরের রুদ্ধ চার দেয়াল ছেড়ে প্রকৃতিঘেরা ক্যাম্পাসে ফিরেছি। ঘুম ঘুম অনলাইন ক্লাস রেখে অফলাইনে ফেরা, বাসার একঘেয়ে দিনের বদলে ব্যস্ত ‘শিডিউল’—এই পরিবর্তনের জন্য মুখিয়ে ছিলাম। আশা করি এ থেকে আসবে নতুন কোনো সম্ভাবনা।
মোহাম্মদ নাফিজুর রহমান, খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট)
কলেজজীবনের শেষ কয়েকটা দিন নিয়ে অনেক স্বপ্ন ছিল। অথচ একটা সময় মনে হচ্ছিল, আর বুঝি কলেজে ক্লাস করাই হবে না। কিন্তু শিক্ষকদের নির্দেশনায় ঠিকঠাকভাবে এইচএসসি পরীক্ষা দিতে পেরেছি। অফলাইনে কয়েকটা ক্লাস করতে পেরেছিলাম বলেই আত্মবিশ্বাস আবার ফিরে এসেছে।
বিনতে ফারুক ফারিয়া, ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ঢাকা
ক্যাম্পাসে ফিরেই পরীক্ষার চাপ, তার ওপর হুট করে হলে ফিরেছি বলে অনেক কাজ জমে গিয়েছিল। তাই শুরুতে ঘাবড়ে গিয়েছিলাম। তবু সেই টংয়ের চায়ের আড্ডা আর কনসার্টে কাঁধে কাঁধ রেখে গান গাওয়ার দিনগুলো ফিরে পেয়ে ভালো লাগছে। সব মিলিয়ে মিশ্র অনুভূতি বলা চলে। বাসায় থাকলে ক্যাম্পাসের ক্লাসরুম মিস করতাম, আর এখন বাসার চায়ে চুমুক দিতে দিতে আয়েশ করে ক্লাস মিস করছি—এটাই হয়তো জীবনের রংবদল।
সিজদা সিনহা, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
ক্যাম্পাস মানে অনেকের কাছে কুইজ, ল্যাব ফাইনালের ঝক্কি। কিন্তু আমার কাছে ক্যাম্পাস মানে লেকচার তুলতে তুলতে ফিসফিস করে গল্প করা, সিনিয়র আপুকে দেখলে দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরা কিংবা বান্ধবীদের সঙ্গে আলুপুরি নিয়ে কাড়াকাড়ি। এত দিন পর বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার পর মনে হলো পরিবেশ অনেকটা বদলে গেছে, কিন্তু মানুষগুলো আগের মতোই আছে। বদলায়নি ম্যাডামের মুখের হাসি, ক্যানটিনে হই–হুল্লোড়, রিডিং রুমে টেনশনে থাকা মুখগুলো।
রাইসা তাবাসসুম চৌধুরী, আহছানউল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা
রচনায় যেমন পড়েছিলাম—বিজ্ঞান দিয়েছে বেগ, কিন্তু কেড়ে নিয়েছে আবেগ; ঠিক তেমনি অফলাইন ক্লাস আমাদের ফিরিয়ে দিয়েছে আবেগ, কিন্তু কেড়ে নিয়েছে বেগ। বন্ধুবান্ধব নিয়ে একসঙ্গে ক্লাস করা, ক্লাসের ব্রেকে আড্ডা, দল বেঁধে ছুটির পর ঘুরতে যাওয়ার আনন্দ যেমন ফিরিয়ে দিয়েছে এই অফলাইন ক্লাস, ঠিক তেমনি আটটার ক্লাসে পাঁচ মিনিট আগে ঘুম থেকে উঠে ঝড়ের বেগে জয়েন করার আনন্দটাও কেড়ে নিয়েছে একইভাবে। তবে দিন শেষে হিসাবের ঘেরাটোপ পেরিয়ে ছাত্র হিসেবে ক্লাসরুমে ফেরার আনন্দটাই মুখ্য।
আবির হাসান ভূঁইয়া, মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, ঢাকা
প্র স্বপ্ন নিয়ে থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন