default-image

চট্টগ্রামের যে কিশোর–তরুণেরা বিতর্ক করে, বিজ্ঞান নিয়ে ভাবে, বিভিন্ন অলিম্পিয়াড বা প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়, কোথায় কী সুযোগ আছে তা নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করে, তাদের একটা বড় অংশকেই আপনি পাবেন ‘হোয়াইট বোর্ড’ ক্লাবে। একদল শিক্ষার্থী এই সংগঠনের প্রাণ।

চট্টগ্রামের জামালখানের রাস্তা ধরে একটু সামনে এগোলেই ক্লাবে পৌঁছাবেন আপনি। ছিমছাম–গোছানো ক্লাবটিতে দেখা মিলবে খুদে বিজ্ঞানপ্রেমীদের। এখানে তারা বিজ্ঞানের নানা খুঁটিনাটি নিয়ে নিত্যনতুন প্রবন্ধ পড়ে। কখনোবা নতুন আবিষ্কারের নেশায় দিনরাত কাজ করে। ইতিমধ্যে ক্লাবের বিস্তৃতি ছড়িয়ে পড়েছে শহরজুড়ে। স্কুল, কলেজ মিলিয়ে ৪২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এই ক্লাবের শাখা তৈরি হয়েছে। ক্লাবের সদস্যসংখ্যাও চোখে পড়ার মতো। ১০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী হোয়াইট বোর্ড ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত। এ বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীকে নানাভাবে পরামর্শ দিয়ে পাশে আছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা।

বিজ্ঞাপন

শুরুর গল্প

বছর চারেক আগের কথা। ২০১৭ সালের এক শীতে চট্টগ্রামে বিজ্ঞান উৎসবের আয়োজন হয়েছিল। উৎসবে শামিল হয় সে সময়ে সদ্য মাধ্যমিক পেরোনো সাইদ খান, মাহির আজরফ, নাফিস রায়হান এবং স্কুলপড়ুয়া আয়মান আওসাফ। এদের মধ্যে সাইদ খান, মাহির আজরাফ এখন স্নাতকের শিক্ষার্থী। বাকি দুজন কলেজে পড়েন।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং, বায়োটেকনোলজি, প্রোগ্রামিংয়ের মতো গুরুগম্ভীর বিষয়ের ওপর প্রদর্শনী ছিল ওই বিজ্ঞান উৎসবে। সেই প্রদর্শনীটিই মূলত অনুপ্রেরণা দেয় চার তরুণকে। উৎসবে প্রদর্শনী দেখে তাদের উপলব্ধি হয়, কেবলই গৎবাঁধা পড়াশোনায় আটকে গেলে চলবে না। বিজ্ঞান পৃথিবী পাল্টে দিয়েছে। ক্রিসপার ক্যাস-নাইন (জিনোম এডিটিংয়ে ব্যবহৃত প্রযুক্তি), কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো প্রযুক্তি আমাদের নতুন করে ভাবাচ্ছে। তাই এমন বিজ্ঞান উৎসবে নিয়মিত যোগ দিতে হবে। পাশাপাশি বিজ্ঞান ক্লাবের মতো সংগঠন করে বিজ্ঞানচর্চা এগিয়ে নিতে হবে। এমন ভাবনা থেকে চারজনের হাত ধরে শুরু হয় ক্লাবের যাত্রা।

হরেক রকম কর্মযজ্ঞ

শুরুতে তেমন সাড়া পায়নি ক্লাবটি। টুকটাক বিজ্ঞান আড্ডা আর পাঠচক্রেই সীমাবদ্ধ ছিল কার্যক্রম। এরপর ধীরে ধীরে নানা কর্মশালা, বিজ্ঞান অলিম্পিয়াড, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাবিষয়ক সভা, সেমিনার, প্রোগ্রামিং নিয়ে প্রশিক্ষণের মতো আয়োজন করে পরিচিতি পায় ক্লাবটি। করোনার সময়েও বসে ছিল না ক্লাবের সদস্যরা। অনলাইনেও তারা নিয়মিত বিজ্ঞানবিষয়ক নানা সভা করে। এসব সভায় যোগ দেন বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুল, কলেজের শিক্ষক থেকে শিক্ষার্থীরা।

ক্লাবের কো-অর্ডিনেটর মাহির আজরাফ বলল, এ ক্লাব নিয়ে তাঁদের স্বপ্ন অনেক বড়। করোনার ধকল গেলে তাঁরা বিজ্ঞানের নতুন নতুন আবিষ্কার নিয়ে সেমিনার করবেন।

ক্লাবের পরিচালনা পর্ষদও খুব গোছানো। বর্তমানে ক্লাবের প্রেসিডেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবদুর রহমান। প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে আছেন হালদা নদী গবেষক ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মো. মনজুরুল কিবরিয়া। উপদেষ্টা হিসেবে আছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আদনান মান্নান ও মাহবুব হাসান, চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জুনায়েদ সিদ্দিকী, আমির হোসেনসহ আরও অনেকে।

ক্লাবের কর্মকাণ্ড নিয়ে খুবই উচ্ছ্বসিত প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটির শিক্ষক সাইফুদ্দীন মুন্না। তিনি ক্লাবের মডারেটরও। ক্লাবের সদস্যদের মধ্যে বিজ্ঞানের প্রতি এত আগ্রহ দেখে মুগ্ধ তিনিও। বললেন, বিজ্ঞানের ওপর ভর করে পৃথিবী প্রতিনিয়ত বদলে যাচ্ছে। নতুন এ বিষয় শিক্ষার্থীরা ধারণ করলে উপকৃত হবে। আর হোয়াইট বোর্ড বিজ্ঞান ক্লাবে বৈচিত্র্যময় নানা বিষয়ে শিক্ষার্থীরা কথা বলে। কাজ করে। পাঠচক্র করে।

চমকদার আয়োজনেই পরিচিতি

ক্লাবের সবচেয়ে বড় আয়োজনটি হলো ‘বায়োটেকনোলজি সামার ক্যাম্প’। কয়েক শ শিক্ষার্থী এতে যোগ দেয়। তবে শহরে সাড়া ফেলার মতো আয়োজন হয় ২০১৯ সালে। সায়েন্স সার্কাস নামের সে অনুষ্ঠানে কয়েক হাজার শিক্ষার্থী চলে আসে। বিজ্ঞান কুইজ, প্রকল্প প্রদর্শনী, বিজ্ঞানভাবনা, মুক্ত আলোচনা, বিভিন্ন আবিষ্কার খুঁটিয়ে দেখা—এমন সব বিষয় সায়েন্স সার্কাসে যুক্ত করা হয়। এরপর আরও অনেক অনুষ্ঠান তাদের ডায়েরির পাতায় যোগ হয়। যার সবগুলোই ছিল চমকপ্রদ।

ক্লাবের পরিচালক রক্তিম বড়ুয়া বলেন, ‘বিজ্ঞানের চর্চা করতে হলে সব সময় সক্রিয় থাকতে হয়। নতুন গবেষণার তথ্য সংগ্রহ করতে হয়। এ ক্লাব সে কাজটিই করে। কোথায় কী আবিষ্কার হলো, কোন প্রযুক্তি এল—তা খুদে বিজ্ঞানীদের মধ্যে ছড়িয়ে দেয় ক্লাবটি। আর সদস্যরা এসব নতুন বিষয়ে সঙ্গে পরিচিত হয়ে আনন্দ পায়। তাদের স্বপ্ন, একদিন অনেক বড় কোনো আবিষ্কার করে পৃথিবী বদলে দেবে।’

বিজ্ঞাপন
প্র স্বপ্ন নিয়ে থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন