default-image

‘উফ্‌! একবার শুধু ভার্সিটিতে উঠে নিই!’ মনে মনে বারবার নিজেকে এ কথা বলে স্কুল-কলেজের ‘ইঁদুরদৌড়’টা পার করেছিলাম। বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে কত রকম প্রত্যাশা নিয়ে ক্যাম্পাসে পা রেখেছি। ইচ্ছা ছিল একঝাঁক বন্ধুর সঙ্গে আড্ডা, ভোরের বাসে চড়ে ক্যাম্পাসের সকাল দেখা, সবুজ চত্বরে এক কাপ চা আর কোনো একটা বই নিয়ে বিকেল পার করে দেওয়া, টার্ম পেপারের ঝক্কি নিয়ে শ্যাডোতে, নীলক্ষেতে ছোটাছুটি, বৈশাখ বা ফাল্গুনের অনুষ্ঠানের জন্য ধুমধাম করে মহড়া, ফ্ল্যাশমব, টিএসসিতে গানে সন্ধ্যা পেরোনো, কখনো ভিসি চত্বরে বৃষ্টিবিলাস বা টং ঘরে দল বেঁধে খাওয়া। এমনকি মাঝেমধ্যে এটা-ওটা ভুল করে সিনিয়রদের গাট্টা খাব, আবার সুযোগ পেলেই ‘ট্রিট’ আদায় করব—এসব নিয়েও ছিল কত আকাশ-পাতাল কল্পনা।

কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, সেসব আশার গুড়ে বালি। গুনে গুনে ৫৮ দিনের অফলাইন ক্লাসই এখন আমার কাছে সত্যিকার ‘বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের অভিজ্ঞতা’, সেটাও কেটে গিয়েছিল পড়া আর পরীক্ষায়। এক বসন্ত পরেই স্থগিত হয়ে গেল আমার বিশ্ববিদ্যালয়জীবন। জীবনের কয়েকটা মাত্র বছর এই রোমাঞ্চকর সময়ের স্বাদ পাওয়া যায়। সেই সময় কিন্তু পেরিয়ে যাচ্ছে ঠিকই। বিশ্ববিদ্যালয়ের রং, উৎসব, বিস্তর পরিচিত একটা জগৎ তৈরির প্রক্রিয়া স্থগিত হলেও ক্লাস, অ্যাসাইনমেন্ট, মিড—কিছুই থেমে নেই। ফাইনালটা বাদ রেখে সেমিস্টার ঠিকই পালে হাওয়া লাগিয়ে শাঁ শাঁ করে এগোচ্ছে। লাগাম ধরতে গিয়ে রীতিমতো হিমশিম খেয়ে যাচ্ছি আমরা। যখন মনে হচ্ছে, ‘আমি ক্লান্ত প্রাণ এক, চারদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন’—তখন আমিও দুদণ্ড শান্তির জন্য নিজের মতো করে ‘বনলতা সেন’ খুঁজে নিয়েছি। আর তা হলো আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাবগুলো।

default-image
বিজ্ঞাপন

সত্যি বলতে, ক্লাবগুলো আছে বলেই মনে হয় পড়া আর টিউশনের বাইরেও জীবন বলে কিছু একটা আছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাবজীবন শুরু হয় স্পার্টানস কমিউনিকেশন ক্লাব দিয়ে। অনলাইনে এই নানা কাজ, অনুষ্ঠান, আয়োজন মিলিয়ে এখানে একটা হুলুস্থুল লেগেই থাকে। স্থবির সময়টাতেও প্রাণ খুঁজে পাই। এরপর যোগ দিই ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের সংগঠন এফবিএস ড্যান্স স্কোয়াডে। সত্যি বলতে, এটা আমার বড্ড প্রশান্তির জায়গা। একদল মানুষ যার যার জীবনের সব সমস্যা, দুর্ভাবনা ঝেড়ে ফেলে নিজেদের তাগিদে কোরিওগ্রাফি করে, অনলাইনে বা সুযোগ পেলে অফলাইনেও অনুষ্ঠান আয়োজন করে। এই তো কিছুদিন আগে এফবিএস ড্যান্স স্কোয়াডের সুবাদে অনেক দিন পর ক্যাম্পাস গেলাম, কিছু সিনিয়রের সঙ্গে দেখা হলো, সারা দিন মহড়া হলো, টিএসসি-মল চত্বর-ভিসি চত্বরে শুট হলো, আড্ডা হলো। সবচেয়ে বড় ব্যাপার—মনে হলো কোথাও একটা এখনো আছে আমার ক্যাম্পাসজীবন। ওই কয়েক দিনের আনন্দ জ্বালানি হিসেবে কাজে লাগিয়েই হয়তো আরও কয়েক মাসের বন্দিজীবন মেনে নেওয়ার শক্তি পাবে মন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগের ক্লাব—ন্যাকনেশনও আমার আরেক শান্তির জায়গা। কিছুদিন আগেই আমরা ঢাকায় যারা আছি, কোভিড-১৯-এর সব রকম সতর্কতা মেনে দেখা করলাম, আনন্দ-হইচই-আড্ডাও হলো অল্পবিস্তর। মনটাই ভালো হয়ে গেল। মনে হলো এই তো আমার সিনিয়র আছে, সহপাঠী আছে। কথা বলার, গাট্টা দেওয়ার মানুষ আছে। কেবল কিছুদিনের অপেক্ষা। সব ঠিক হলে এদের সঙ্গে নিশ্চয়ই দারুণ একটা সময় কাটবে।

সত্যি বলতে, এই দুঃসময়ে ক্লাবগুলো আমার খরার জীবনে একটুখানি শান্তির সুবাতাস। ক্লাবের জন্য অনেক কাছের বন্ধু পেয়েছি, ভরসা করা যায়—এমন বড় ভাইয়া-আপু পেয়েছি। অনেক কিছু শিখেছি, একটা মঞ্চ পেয়েছি নিজেকে উপস্থাপন করার জন্য। এসবের জন্য আমি সত্যিই ক্লাবগুলোর কাছে কৃতজ্ঞ। ঘরবন্দী জীবনে ক্লাবগুলোই আমাকে মনে করিয়ে দিয়েছে—আমারও একটা ক্যাম্পাস আছে।

বিজ্ঞাপন
প্র স্বপ্ন নিয়ে থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন