default-image

এইচএসসি: সময় বেশি পাচ্ছ, সেটাই কাজে লাগাও

সুদীপা বড়ুয়া

সহযোগী অধ্যাপক, রাজউক উত্তরা মডেল কলেজ, ঢাকা

এ বছর উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা নিয়ে অনেক রকম সম্ভাবনা বা আশঙ্কার কথাই হয়তো প্রিয় শিক্ষার্থী, তোমাদের মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। ক্লাসে না গিয়ে ল্যাপটপ বা স্মার্টফোনের পর্দায় দূরশিক্ষণে কি কলেজে গিয়ে ক্লাস করার আনন্দ পুরোপুরি পাওয়া যায়?

যত যা-ই হোক, ক্লাসের পড়ানো আর চারকোনা বাক্সের ভেতর ঢুকে বহু দূর থেকে পড়ানো কি কখনো এক হয়? ছেলেমেয়েদের পড়া ধরব, বকুনি দেব, কাছে গিয়ে কুশল জিজ্ঞাসা করব, চোখের চাহনি দেখে ধরে ফেলব পড়া শিখেছে না শেখেনি, তবেই না পড়িয়ে আনন্দ!

পৃথিবী আবার তার পুরোনো সময়ে ফিরতে শুরু করেছে। আমরা ক্রমেই আশ্বস্ত হচ্ছি, স্বাভাবিক জীবনে পুরোপুরি ফিরে যেতে চাইছি। যা চাইছি তার সবটুকু হয়তো একসঙ্গে পাব না। কিন্তু আমাদের প্রস্তুতি নেওয়ার ঘণ্টা কিন্তু বেজে গেছে।

প্রস্তুতি নাও এখনই

এ বছরের মাঝামাঝি যদি পরীক্ষা হয়, তবে তোমরা যারা এবারের যোদ্ধা—তৈরি হয়ে নাও রণসাজে। একটি বোর্ড পরীক্ষা তোমরা ইতিমধ্যেই পার হয়েছ। তাই পরীক্ষাভীতি অনেকটাই কাটাতে পেরেছ বলে আমার বিশ্বাস। মনে রাখতে হবে, এই উচ্চমাধ্যমিক বা এইচএসসি পরীক্ষাটা কিন্তু জীবনের একটা বড় সোপান, যার ওপর ভর করে তোমাদের ভবিষ্যতের শক্ত জমিটা কিছুটা হয়তো তৈরি হবে। তাই এই পরীক্ষা নিয়ে মোটেই হেলাফেলা করা যাবে না।

আগামী ফেব্রুয়ারি বা মার্চ থেকে যদি স্কুল-কলেজগুলোতে সীমিত পরিসরে ক্লাস শুরু হয়, তাহলেও তোমাদের হাতে যথেষ্ট সময় আছে। বাড়িতে বসে অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম চালাতে আমরা ও তোমরা—উভয়ই কিন্তু সমান চেষ্টা করেছি। তারপরও এই চেষ্টা শতভাগ সফল হতে পারেনি। প্রত্যন্ত অঞ্চলে তো নয়ই। তাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলুক বা না-ই খুলুক, প্রত্যেকে যার যার সাধ্যমতো লড়ার জন্য প্রস্তুতি নাও।

হাল আগেই ছেড়ো না

আমি বলছি না জিপিএ-৫ই জীবনের একমাত্র লক্ষ্য। তবু চেষ্টা তো করতেই হবে। চেষ্টা করেও যদি না পারো, তাতে কোনো দুঃখ নেই। কিন্তু নাবিক যদি আগেই তার হালটা ছেড়ে দেয়, তবে সেই নৌকা কূলে ভিড়বে কী করে? ভালো ফল করতে চাওয়ার ইচ্ছাটা খুব জরুরি। যেকোনো সাফল্যই কিন্তু তোমাদের মনোবল বাড়িয়ে দেবে।

যেকোনো পরিস্থিতি যদি কাজে লাগাতে শেখো, দেখবে জীবনটা সহজ হয়ে যাচ্ছে। এবার তোমরা অন্যবারের চেয়ে অনেক বেশি সময় পাচ্ছ। এ সুযোগ হেলায় হারিয়ো না। যারা কোচিং মুখাপেক্ষী ছিলে, অথচ কোচিং করতে পারছ না, তাতেও ভয়ের কিছু নেই। তোমাদের কলেজে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক যাঁরা আছেন, তাঁদের কাছে সাহায্য চাও। যতবার খুশি। যতক্ষণ না বুঝবে, অবশ্যই তাঁদের কাছে বুঝতে চাইবে। একজন শিক্ষক হিসেবে আমি বলতে পারি, কখনোই কোনো শিক্ষক তাঁর ছাত্রের প্রশ্নে বিরক্ত হন না। বরং যে ছাত্রটি বারবার তাঁর কাছে ছুটে আসে, তার প্রতি অন্য রকম ভালোবাসা তৈরি হয়।

ঝালিয়ে নাও পড়ার বিষয়গুলো

যে যেই অবস্থায় আছ, সেখান থেকেই পাঠ্যবিষয়গুলো ঝালিয়ে নিতে শুরু করো। পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, গণিত, ভূগোল, ইতিহাস, অর্থনীতি, হিসাববিজ্ঞান, কম্পিউটার বিজ্ঞান, বাংলা কিংবা ইংরেজি—কোনোটিই কিন্তু ‘রকেট সায়েন্স’ নয়। পাঠ্যবিষয়গুলো যদি বারবার এবং প্রতিটি লাইন যত্ন করে মনোযোগ দিয়ে পড়ো, সেগুলো মাথায় এক্কেবারে ছাপ ফেলে যাবে। ধরো গদ্য কিংবা পদ্য, হিসাববিজ্ঞান বা ভূগোল—রোজ যদি একবার একটুখানি করেও পড়ো, দ্বিতীয়বার রিভিশনের সময় সেটা আরেকটু সহজ লাগবে। আর তৃতীয়বার সেটা মাথায় খুব সহজেই বসে যাবে। আমাদের বুড়ো মাথায় কোনো কিছু ঢোকাতে এবং মনে রাখতে যে কী কষ্ট! তোমাদের কচি মাথায় তো সেই ঝামেলা নেই। কাজেই তোমরা রুটিন করে নাও। সময় ভাগ করে নাও। দিন হিসাব করে নাও। আটঘাট বেঁধে যদি এখনই লেগে পড়ো, সাফল্য ধরা দেবেই।

তোমাদের আছে অদম্য ইচ্ছাশক্তি

যারা প্রত্যন্ত অঞ্চলে নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও লড়াই চালিয়ে যাচ্ছ, তোমাদের অগ্রিম অভিবাদন। তোমাদের অদম্য ইচ্ছাশক্তিই পারবে সাফল্যকে হাতের মুঠোয় ধরে দিতে। সারা দিন পরের বাড়িতে হাড়ভাঙা খাটুনির পর হ্যারিকেনের অনুজ্জ্বল আলোয় পড়তে বসে যে কিশোরীর চোখে বিশ্বজয়ের স্বপ্ন ঝিলিক দিয়ে ওঠে, সে যদি পারে তবে তুমিও পারবে। পারতে তোমাকে হবেই।

বিজ্ঞাপন

এসএসসি: রুটিন ধরে চর্চা করো

মোহাম্মদ মুরাদ হোসেন সরকার

সিনিয়র শিক্ষক, ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ঢাকা

২০২১ সালের এসএসসি পরীক্ষার্থীরা যারা, তোমরা জীবনের খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা পরীক্ষা দিতে যাচ্ছ। তোমাদের জানাই শুভেচ্ছা। আশা করছি তোমাদের প্রস্তুতি প্রায় শেষ।

অনেক শিক্ষার্থী আছে, যাদের একদিন পড়লে আরেক দিন পড়তে ইচ্ছা করে না। সঙ্গে যোগ হয়েছে করোনাকালে ঘরে বসে থাকা অলস জীবন!

কী পড়ব? সবই তো পারি, পড়তে হবে না। অথবা কিছুই পারি না, কোনটা রেখে কোনটা পড়ব? পরীক্ষা হবে কি? এ ধরনের নানান প্রশ্ন তোমাদের মনে। মনে রেখো, এ বছর তোমাদের এসএসসি পরীক্ষা হবে, এ নিয়ে এখন আর কোনো সংশয় নেই। রুটিন করে সিলেবাস ও মানবণ্টন অনুযায়ী পড়ালেখার চর্চা যদি চালিয়ে যাও, নিশ্চয়ই প্রত্যাশা পূরণ হবে।

ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারবে সহজে

করোনাভাইরাস সংক্রমণের কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ বলে যতটুকু ক্ষতি হয়েছে বা হচ্ছে, তা পুষিয়ে নেওয়া তোমাদের জন্য মোটেও কঠিন কিছু নয়। প্রথমেই বলব যে সময় তোমাদের হাতে আছে, এটিকে পরিপূর্ণ কাজে লাগাও। একটি রুটিন বানিয়ে নাও। যেখানে তোমার সব কটি বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকবে, আর সমান গুরুত্ব পাবে।

রুটিনে একটি নির্দিষ্ট সময় রাখো ইন্টারনেটে কিশোর বাতায়ন এবং সংসদ টেলিভিশনের ক্লাসগুলোর জন্য। কারণ, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর এবং অ্যাকসেস টু ইনফরমেশনের (এটুআই) সহযোগিতায় এসএসসি পরীক্ষার্থীদের জন্য কিশোর বাতায়ন ফেসবুক পেজে বিশেষ লাইভ ক্লাসের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তোমরা এসব ক্লাস থেকে উপকৃত হবে বলে আমি মনে করি।

বেশি রাত জেগে পড়ার দরকার নেই। ঘুম ভালো হলে তোমার মাথা ভালো কাজ করবে, ভোরের সময়টাতে গণিতসংক্রান্ত বিষয়গুলোতে বেশি গুরুত্ব দেবে। ৪০ মিনিট বা ১ ঘণ্টা পর একটু বিশ্রাম, হাঁটাহাঁটি বা বিনোদনও দরকার।

নিজের পড়ার দায়িত্ব এখন নিজেরই

মনে রেখো, করোনাকালে তোমার পড়ার দায়িত্ব তোমাকেই নিতে হবে। কোনো জিজ্ঞাসা বা প্রশ্ন মনে এলে, ফোনে বা অনলাইনে শিক্ষকদের সাহায্য নিতে পারো। স্কুল খুললে তখনো শিক্ষকদের সাহায্য নিতে পারবে। তোমরা জানো যে তোমাদের পরীক্ষাপদ্ধতি হচ্ছে সৃজনশীল। তোমাদের সৃজনশীল ও নৈর্ব্যক্তিক প্রশ্নের জন্য মূল বইটির প্রতিটি পৃষ্ঠা বারবার অনুশীলন করো। কারণ, মূল বইয়ের বিকল্প নেই। তবে হাতের সময় কাজে লাগানোর আরেকটি দিক হচ্ছে রুটিন অনুযায়ী টেস্ট পেপার অনুশীলন করা। বিভিন্ন বোর্ড ও গুরুত্বপূর্ণ স্কুলগুলোর প্রশ্ন বারবার অনুশীলন করে তা বাসায় বসে নির্দিষ্ট সময়ে পরীক্ষা দিয়ে বোর্ড পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত হতে হবে।

যেসব বিষয়ে সাতটি সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর করতে হবে, সেসব বিষয়ে প্রতিটি সৃজনশীল প্রশ্নের জন্য ২০ মিনিট ধরে বাসাতেই রুটিন অনুযায়ী বারবার খাতায় লিখে অনুশীলন করতে হবে। তুমি বাসায় বসে জ্ঞানমূলক (ক)-তে ২ মিনিট, অনুধাবনমূলক (খ)-তে ৪ মিনিট, প্রয়োগমূলক (গ)-তে ৬ মিনিট এবং উচ্চতর দক্ষতা (ঘ)-তে ৮ মিনিটের মধ্যে অনুশীলন সম্পন্ন করো।

গণিতে প্রশ্নপত্রের সহজ স্তরের বহুনির্বাচনী (এমসিকিউ) প্রশ্নের জন্য ১০ থেকে ৪০ সেকেন্ড এবং সৃজনশীল প্রশ্নে ১ থেকে ৩ মিনিট সময় ধরে উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করবে। মধ্যম স্তরের এমসিকিউর উত্তর দেওয়ার জন্য ৪০ থেকে ৬০ সেকেন্ড ও সৃজনশীল প্রশ্নে ৪ থেকে ৭ মিনিট; কঠিন স্তরের এমসিকিউর জন্য ৬০ থেকে ৯০ সেকেন্ড ও সৃজনশীল প্রশ্নে ৮ থেকে ১০ মিনিট সময় ব্যয় করে উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করবে। এভাবে অনুশীলন করলে রিভিশনের জন্যও ১০ মিনিট থাকবে।

মনে রেখো

১. টেস্ট পেপার–এর বিগত বছরের বোর্ডের প্রশ্নের সমাধান করো।

২. প্রতি রাতে ঘুমানোর আগে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট বা সূত্রগুলো এক নজরে দেখে নাও।

৩. দৈনিক সাত ঘণ্টা ঘুমাতে হবে, তবেই মস্তিষ্ক সক্রিয় থাকবে।

৪. সম্ভব হলে দুধ, ডিম, কলা, সবজিসহ পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে।

৫. শরীর সুস্থ রাখতে হবে, পড়ায় মন বসবে।

৬. রুটিন অনুযায়ী দৈনিক ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা পড়ালেখা করতে হবে।

৭. যে বিষয়টি কঠিন ও জটিল মনে হয়, সে বিষয়টি বেশি বেশি অনুশীলন করতে হবে।

৮. অপ্রয়োজনে টিভি, মোবাইল, ফেসবুক ও ইউটিউব থেকে দূরে থাকতে হবে।

প্র স্বপ্ন নিয়ে থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন