default-image

করোনাকালে আপনি কানাডা থেকে অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি দিয়েছেন। যোগ দিয়েছেন ইউনিভার্সিটি অব ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়ার উপাচার্য হিসেবে। নতুন ক্যাম্পাস, নতুন দায়িত্ব কেমন উপভোগ করছেন?

অমিত চাকমা: আমি একজন শিক্ষাবিদ। শিক্ষাসেবার প্রতিই নিজের পেশাগত জীবন নিবেদিত করেছি। বেশ কয়েকটি কানাডীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করার ও নেতৃস্থানীয় ভূমিকায় থাকার সুযোগ হয়েছে। প্রায় এক দশক কানাডার ইউনিভার্সিটি অব ওয়েস্টার্ন অন্টারিওর প্রেসিডেন্ট ও উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। উপাচার্য হিসেবে আমার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর কিছুদিনের জন্য ছুটি নিয়েছিলাম। সে সময় পৃথিবীর নানা প্রান্তে ঘুরেছি। এই নির্বিঘ্ন, নিরুদ্বেগ সময়টা উপভোগ করা সত্ত্বেও ভেতরে-ভেতরে আমি আমার কর্মব্যস্ত জীবনটাকে মিস করছিলাম। কারণ বহু বছর ধরে এই কর্মব্যস্ততাই ছিল জীবনের অংশ। তাই যখন উপাচার্য হিসেবে ইউনিভার্সিটি অব ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়ার নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ এল; নতুন উদ্যম, নতুন শক্তিতে আমি সেটা লুফে নিলাম। নতুন দায়িত্বে আছি মাত্র চার মাস পেরোল। একটা নতুন দেশ, নতুন পরিবেশ নিঃসন্দেহে বেশ রোমাঞ্চকর। তার ওপর বিশ্ববিদ্যালয় নানা রকম চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যা আমার জন্য নেতৃত্বদানের অভূতপূর্ব সুযোগ। নিশ্চয়ই এই চ্যালেঞ্জ উপভোগ করছি এবং কম সময়ের মধ্যেই বিশ্ববিদ্যালয়ে একটা ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পেরেছি।

প্রথম আলোর স্বপ্ন নিয়ে পাতায় ধারাবাহিকভাবে আপনার ৬টি লেখা ছাপা হয়েছে। পাঠকদের কাছ থেকে আমরা দারুণ সাড়া পেয়েছি। আপনি কেমন সাড়া পেলেন? দেশ থেকে কেউ কি আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল?

অমিত চাকমা: হ্যাঁ, পাঠকের কাছ থেকে আমিও কিছু প্রতিক্রিয়া পেয়েছি। যেহেতু আমার ই–মেইল ঠিকানা খুব সহজলভ্য নয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অস্ট্রেলিয়া ও কানাডার বাংলাদেশিদের কাছ থেকেই বেশির ভাগ সাড়া পেয়েছি। শিক্ষাবিদসহ অনেক তরুণ পেশাজীবী তাঁদের সঙ্গে আমার জীবনের অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করে নেওয়ার জন্য ধন্যবাদ জানিয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

ধরুন, আপনাকে একটা ছোট্ট চিঠি লিখতে অনুরোধ করা হলো। যে চিঠি আপনার হয়ে আমরা সারা দেশের তরুণদের হাতে পৌঁছে দেব। আপনি কী লিখবেন?

অমিত চাকমা: তোমার মেধার সেরাটা দাও। আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক—দুধরনের শিক্ষার মাধ্যমেই নিজের জ্ঞানের পরিধি বাড়ানোর সব রকম সুযোগ কাজে লাগাও। মন খুলে সত্যিকার শিক্ষিত হও। সমাজ-সংস্কৃতির একপেশে ধারণা যেন তোমার নিজের মনকে আড়াল করে না দেয়। বাধা, প্রতিকূল পরিবেশ যেন তোমার সামনে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়। ইচ্ছা থাকলে উপায় হয়। অন্যের ওপর নির্ভর কোরো না। নিজেই নিজের সহায়ক হতে পারলে সেটাই সর্বোত্তম। তুমি তোমার লক্ষ্য নির্ধারণ করো। মনে রেখো, পরিশ্রম, অধ্যবসায় আর প্রচেষ্টার কোনো বিকল্প নেই। নিজের ওপর বিশ্বাস রাখো। বড় স্বপ্ন দেখো, ছোট করে শুরু করো, তারপর ধীরে ধীরে সামনে এগোও। নিশ্চয়ই তোমার স্বপ্ন পূরণ হবে।

প্রথম আলোয় আপনার লেখা পড়ে জেনেছি, ছোটবেলা থেকে আপনি কখনো পরিশ্রম করতে ভয় পাননি। বাবার উৎসাহে রাস্তার পাশে বসে আনারস বিক্রি করেছেন, বেবিট্যাক্সি চালিয়ে হাতখরচ উপার্জন করেছেন, আবার বিদেশে পড়তে যাওয়ার পর গ্রীষ্মের ছুটিতে হোটেলের বেয়ারা হিসেবেও কাজ করেছেন। সেই সময়ে দাঁড়িয়ে ভবিষ্যতে নিজেকে কোথায় দেখতে পেতেন? পশ্চিমা বিশ্বের দুটি বড় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হবেন, এমন কি কখনো ভেবেছিলেন?

অমিত চাকমা: আমার ভবিষ্যতের স্বপ্ন সময়ে–সময়ে বদলেছে। একটা লক্ষ্য ছিল ঠিক, কিন্তু আমি জানতাম না কীভাবে সেই লক্ষ্যে পৌঁছাব। যেমন আমার ইচ্ছা ছিল পৃথিবীটা ঘুরে দেখব। তাই যখন বৃত্তি নিয়ে আলজেরিয়ায় পড়তে যাওয়ার সুযোগ হলো, আমি সুযোগটা ছাড়িনি। আলজেরিয়ায় প্রকৌশলে পড়ার সময় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেওয়ার কোনো অভিপ্রায় আমার ছিল না। ভেবেছিলাম মধ্যপ্রাচ্যে প্রকৌশলী হিসেবে কাজ করব। কিন্তু কোনো উপযুক্ত চাকরি পাইনি। তখন গ্র্যাজুয়েট স্কুলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। স্নাতকোত্তর শেষ হওয়ার পর কানাডায় কাজ করতে চেয়েছিলাম। সেখানেও চাকরি পাইনি, তাই এরপর ডক্টরেট ডিগ্রির জন্য পড়তে শুরু করলাম। অধ্যাপনা শুরু করার পরও দুটি বড় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হব, এমন ভাবনা কখনো মাথায় আসেনি। যখন যা ভালো লেগেছে, আমি শুধু সেই ভালো লাগাই অনুসরণ করেছি। বাস্তবের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছি আর মনটা খোলা রেখেছি। যখনই সুযোগ এসেছে, লুফে নিয়েছি। চাকরি না পাওয়া আমার জন্য একরকম সৌভাগ্য ছিল! এটিই আমাকে একটা একেবারে ভিন্ন, অসাধারণ পেশার দিকে ঠেলে দিয়েছে।

২০২০ সাল প্রায় শেষের পথে। এই একটা বছর সম্ভবত সামগ্রিকভাবেই সারা বিশ্বের মানুষের চিন্তাধারায় বড় প্রভাব ফেলেছে। কী প্রত্যাশা বা লক্ষ্য নিয়ে ২০২১ সাল শুরু করা উচিত বলে আপনি মনে করেন?

অমিত চাকমা: মহামারি আমাদের থামিয়ে দিয়েছে, নিজেদের দিকে তাকানোর সুযোগ করে দিয়েছে। প্রকাশ করে দিয়েছে আমাদের দুর্বলতা। বুঝিয়েছে, কোনো বয়স, অর্থনৈতিক অবস্থান, লিঙ্গ, জাতি বা ধর্মের মানুষই এই অসুখ থেকে নিরাপদ নয়। মনে করিয়ে দিয়েছে, আমরা সবাই মানুষ, আর মৌলিকভাবেই আমরা সবাই সমান। আরও শিখিয়েছে, এই দুর্যোগে আমরা সবাই এক, ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়তেও হবে একসঙ্গে। ব্যক্তির, কোনো জনগোষ্ঠীর বা কোনো জাতির লড়াই এটা নয়। এখানে সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। মহামারি থেকে আমাদের শিক্ষা খুব সহজ এবং শক্তিশালী, মানুষ হিসেবে আমাদের সবার ভালো থাকা নির্ভর করছে সবার একসঙ্গে কাজ করার সক্ষমতার ওপর।

করোনার কারণে এখনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ। অনলাইনে ক্লাস হচ্ছে, কিন্তু ছেলেমেয়েরা কতটুকু শিখছে, সে ব্যাপারে শিক্ষক-শিক্ষার্থী উভয়েই সংশয়ে আছেন। এই এক বছরে পড়ালেখায় যে ঘাটতি তৈরি হলো, সেটা কীভাবে আমরা পূরণ করতে পারি? আপনি কী মনে করেন?

অমিত চাকমা: ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষমতা মানুষের সহজাত। শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রেও এ কথা প্রযোজ্য। আমি বিশ্বাস করি, দ্রুত অনলাইন কোর্স চালু করতে গিয়ে যেসব ত্রুটি রয়ে গেছে, তা ধীরে ধীরে কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে। এ ক্ষেত্রে শিক্ষক-শিক্ষার্থী উভয়ের সদিচ্ছা প্রয়োজন।

আপনি কি নিয়মিত পত্রিকা পড়েন? অনলাইনে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখন সহজেই সব খবর পাওয়া যায়। তবু, আপনি কি তরুণদের পত্রিকা পড়তে উৎসাহিত করবেন?

অমিত চাকমা: ছোটবেলায় যখন লেখাপড়া শিখেছি, সেই তখন থেকেই পত্রিকা পড়তাম। সকালবেলায় পত্রিকা পড়ার অভ্যাস আমার বাবাই আমার মধ্যে গড়ে দিয়েছিলেন। আমরা দুটি পত্রিকা রাখতাম—একটা বাংলা, একটা ইংরেজি। এখনো পত্রিকা পড়ি। তবে অনলাইনে, পিডিএফে। বাংলাদেশের প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারসহ বিশ্বের নানা দেশের পত্রিকা আমি পড়ি। পুরোটা পড়া হয় না। যেগুলো বিশেষভাবে আমার আগ্রহের বিষয়, সেই কলামগুলো পড়ি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সাহায্যে আমিও নানা খবর পাই, তখন ওয়েবসাইটে গিয়ে পুরো খবরটা পড়ে নিই।

হ্যাঁ, হোক অনলাইনে বা ছাপা কাগজে, আমি তরুণদের পত্রিকা পড়তে উৎসাহ দেব। পত্রিকা শুধু খবর দেয় না। ভালো পত্রিকাগুলো খবরের বিশ্লেষণ, সাম্প্রতিক ঘটনা, ইত্যাদি আমাদের সামনে তুলে ধরে। ‘ফেক নিউজ’ অথবা পক্ষপাতদুষ্ট খবরের যুগে স্বাধীন সংবাদপত্র থাকা খুব জরুরি। তা ছাড়া পড়ার অভ্যাস তো সব সময়ই ভালো।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0