বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

গবেষণায় বাড়ছে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি

২০২০-২১ সালজুড়েই আন্তর্জাতিক মঞ্চে চুয়েটের শিক্ষক–শিক্ষার্থীদের সাফল্য ছিল চোখে পড়ার মতো। গত বছরের শুরুতে ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্স অন সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং ফর সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্টে (আইসিসিইএসডি ২০২০) ৫টি ‘বেস্ট পেপার অ্যাওয়ার্ড’–এর মধ্যে তিনটিই জিতেছিলেন চুয়েটের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।

গত বছরের নভেম্বরে ভারতের পুনেতে অনুষ্ঠিত ‘দ্য ড্রইং বোর্ড’ শীর্ষক স্থাপত্য নকশাভিত্তিক আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় রানার্সআপ হয় চুয়েটের স্থাপত্য বিভাগের পঞ্চম বর্ষের শিক্ষার্থী ফয়সাল হোসেন, সুমাইয়া সুলতানা ও সাদমান আলী।

এ বছরের শুরুতে আমেরিকান সোসাইটি অব মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার্স (এএসএমই) ই-ফেস্ট ডিজিটাল ২০২১ এনভায়রনমেন্টাল সিস্টেম ডিভিশন প্রতিযোগিতায় বৈশ্বিক চ্যাম্পিয়ন হয় ‘এনভি-চুয়েট’ নামের দলটি। এ ছাড়া চলতি বছরের জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক পেশাজীবী সংগঠন আমেরিকান কনক্রিট ইনস্টিটিউটের (এসিআই) উদ্যোগে আয়োজিত কনক্রিট প্রজেক্টস প্রতিযোগিতায় বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের ১৫ ব্যাচের তিনটি দল সব কটি পুরস্কার অর্জন করেছে। এর আগে ৩০ মার্চ ২৫০টি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে আয়োজিত এসিআই কংক্রিট সলিউশনস নামের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় গ্লোবাল হায়েস্ট স্কোর ক্যাটাগরিতে তৃতীয় স্থান অর্জন করেছে পুরকৌশল বিভাগের চুয়েটএক্স দল। গত ১৯ অক্টোবর এসিআইয়ের ইকো কংক্রিট প্রতিযোগিতায়ও চুয়েটের একটি দল চ্যাম্পিয়ন হয়। এ নিয়ে এসিআইয়ের টানা তিনটি প্রতিযোগিতায় চুয়েটের শিক্ষার্থীরা সাফল্য পেলেন।

দেশের গণ্ডিতেও এসেছে বেশ কিছু সফলতা। করোনার শুরুতে নগরবাসীকে সুরক্ষিত রাখতে চুয়েটের শিক্ষার্থীরা নিজস্ব অর্থায়নে স্বয়ংক্রিয় হ্যান্ড স্যানিটাইজার মেশিন উদ্ভাবন করেন, শহরের বিভিন্ন প্রান্তে তা স্থাপন করেন। গবেষণার জন্যই এ বছরের নভেম্বরে প্রধানমন্ত্রী স্বর্ণপদকের জন্য মনোনীত হয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক রিয়াজ আক্তার মল্লিক।

default-image

প্রাক্তনেরাও সাফল্যে উজ্জ্বল

গুগল, মাইক্রোসফট, আমাজন, অ্যাপল, টেসলাসহ বিশ্বের নামীদামি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছেন চুয়েটের প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা। এ বছরও ১২ জন শিক্ষার্থী এসব ‘টেক জায়ান্ট’ প্রতিষ্ঠানে চাকরি পেয়েছেন। মাইক্রোসফটে যোগ দিয়েছেন রাজীব দাস ও তানবীর উদয়; গুগলে শুভ্র দত্ত, শাহরিয়ার ও আক্কাস উদ্দিন; ইন্টেলে ঠাকুর উজ্জ্বল কুমার ও দীপ্ত সরকার; আমাজনে তৌহিদুল ইসলাম ও দীপ্ত দাশ; টেসলাতে শুভ দাশ; অ্যাপলে নূর্শেদুল মামুন এবং ফেসবুকে খোরশেদুল আলম।

উন্নয়ন চলছে

১৯৬৮ সালে ১৮৩ একর জায়গা নিয়ে চট্টগ্রাম প্রকৌশল কলেজ হিসেবে যাত্রা শুরু করেছিল আজকের চুয়েট। সেই থেকে একটু একটু করে বেড়েছে পরিধি। বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ক্যাম্পাসের আয়তন শিগগিরই আরও ২০০ একর বাড়ানো হবে।

বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪৫০০ শিক্ষার্থীর মধ্যে ছাত্রদের জন্য পাঁচটি হল ও ছাত্রীদের দুটি হল আছে। ভবিষ্যতে শিক্ষার্থী বাড়ানোর পরিকল্পনায় আরও দুটি হল নির্মাণাধীন রয়েছে। বর্তমানে ৩২০ কোটি ও ৬৯ কোটি টাকার দুটি প্রকল্প চালু আছে। এসব প্রকল্পের অধীনে বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন প্রবেশদ্বার, শেখ কামাল বিজনেস আইটি ইনকিউবেটর, শিক্ষকদের বাসভবন, প্রাধ্যক্ষদের আবাসিক ভবন, শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য আবাসিক টাওয়ার, শিক্ষার্থীদের জন্য ব্যায়ামাগার ও হাসপাতাল নির্মাণাধীন আছে।

সংস্কৃতিচর্চা

প্রকৌশলের পড়াশোনা একটু খটমটে হলেও সংস্কৃতিচর্চায় দারুণ উৎসাহী বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার৷ বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগঠন জয়ধ্বনি এবং চুয়েট ডিবেটিং সোসাইটি (চুয়েট ডিএস) মূলত এই ক্যাম্পাস সরব রাখে সব সময়। করোনাকালে জয়ধ্বনি অনলাইনে ১০টি ভিন্ন ভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজন করেছিল। করোনাকালের বন্ধের সময়ে সব প্রতিকূলতা কাটিয়ে শিক্ষার্থীরা কীভাবে অগ্রযাত্রা অব্যাহত রেখেছেন, তা ফুটিয়ে তুলতে গত ১২ মার্চ আয়োজন করা হয়েছিল মূকাভিনয়। ‘ক্লাসগুলো লকডাউনে’ শিরোনামের এই অনুষ্ঠান আয়োজিত হয় ভার্চ্যুয়াল মাধ্যমে।

অনলাইনে চুয়েটের চমকপ্রদ আয়োজন ছিল আরও। যেমন গানের অনুষ্ঠান—আরশিনগর, অডিও থিয়েটার লর্ড ভানু, ঈদে প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের নিয়ে দুদিনব্যাপী অনুষ্ঠান—আবর্তন এবং প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের নিয়ে আয়োজিত ‘বৃত্তাল্পনা’।

এখন যেহেতু আবার ক্যাম্পাস খুলেছে, অনলাইনের ‘চারকোনা’ গণ্ডি থেকে বেরিয়ে চুয়েটের ক্লাবগুলো আবার সশরীর অনুষ্ঠান আয়োজনের পরিকল্পনা শুরু করেছে। যেমন জয়ধ্বনির সদস্যরা আগামী জানুয়ারি মাসে বাঁধনহারা ও আইইউসিএফ নামে দুটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করবেন। এখন চলছে প্রস্তুতি। অন্যদিকে চুয়েট ডিবেটিং সোসাইটি আগামী জানুয়ারি মাসে আন্তবিভাগ বিতর্ক প্রতিযোগিতা (আইডিডিসি) ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ‘তারুণ্য উৎসব’ আয়োজন করবে।

default-image

প্রাণ জাগে ভ্রমণে

অবস্থানগত কারণেই চুয়েট থেকে সহজে ঘুরে আসা যায় কাপ্তাই, সেন্ট মার্টিন, কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে। এই সুযোগ কাজে লাগাতে দ্বিধা করেন না চুয়েটের শিক্ষার্থীরা। প্রতিবছর চতুর্থ বর্ষের সব বিভাগের শিক্ষার্থীরা তাঁদের সমাপনী অনুষ্ঠানের অংশ হিসেবে বেরিয়ে পড়েন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। এ বছরও ব্যতিক্রম হয়নি। গত ২৩ নভেম্বর চুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের ৭১ জন শিক্ষার্থী ঘুরে এসেছেন সেন্ট মার্টিন। শিক্ষার্থীদের একজন শাহরিয়ার ইবনে বাশার বলেন, ‘চার বছরের এই পথচলায় বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে অসংখ্য স্মৃতি জমেছে। প্রিয় ক্যাম্পাসকে ছেড়ে যাওয়াটা বেশ কষ্টের। কিন্তু কবি কাজী নজরুল ইসলাম তো বলেছেন, “আজো তবে শুধু হেসে যাও, আজ বিদায়ের দিন কেঁদো না।” তাই তো আমরা ৭১ জন শিক্ষার্থী বেরিয়ে পড়েছিলাম নারিকেল জিঞ্জিরার (সেন্ট মার্টিন) উদ্দেশে।’

দীর্ঘদিনের অবসাদ কাটিয়ে আবার নিজেদের ফিরে পেতে নানা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। প্রশাসনও নিজেদের মতো করে উদ্যোগ নিচ্ছে। জানা গেল, শিক্ষার্থীদের চাঙা রাখতে শিগগিরই মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক অধিবেশন চালু হবে।

default-image

উপাচার্য: বিশ্ববিদ্যালয় মানে নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করা

করোনায় শিক্ষার্থীদের পড়ালেখায় যে ঘাটতি তৈরি হলো, এই ঘাটতি কমিয়ে আনতে কী পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ভাবছেন?

অধ্যাপক ড. রফিকুল আলম : একাডেমিক ক্যালেন্ডার এগিয়ে নিতে আমরা করোনাকালীন অনলাইন পরীক্ষার ব্যবস্থা করেছি। সামনে শীতকালীন ছুটিসহ বিভিন্ন ছুটি কমিয়ে এনে পাঠদান সম্পন্ন করার চেষ্টা থাকবে। শিক্ষার্থীরা যেন সেশনজটে না পড়ে।

বিদেশে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে কিংবা গুগল, মাইক্রোসফটের মতো বড় বড় প্রতিষ্ঠানে চুয়েটের শিক্ষার্থীদের সাফল্য দেখা যাচ্ছে। গবেষণায়ও আগ্রহী হচ্ছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। ভবিষ্যতে এই ধারা বজায় রাখতে কি কোনো উদ্যোগ নেবেন?

রফিকুল আলম: কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যদি নিয়মমাফিক চলে, তাহলে সব ক্ষেত্রেই সাফল্য দেখা দেয়। একাডেমিক ক্যালেন্ডার অনুসরণ করে ক্লাস, ল্যাব—সবকিছু হলে এবং শিক্ষার্থীরা এতে শৃঙ্খলা মেনে যথাযথভাবে অংশগ্রহণ করলে সাফল্য আসবেই। বিশ্ববিদ্যালয় মানেই নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করা। নতুন জ্ঞান সৃষ্টির জন্য মূল কারিগর হলেন শিক্ষক। গবেষণার সঙ্গে তাঁদের ব্যাপক সম্পৃক্ততা দরকার। এর জন্য আমি শিক্ষকদের নির্দেশনা দিয়েছি। প্রতিবছর চুয়েটের নিজস্ব অর্থায়নে সেরা ৫ জন শিক্ষককে বেস্ট পেপার অ্যাওয়ার্ড দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া বহির্বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের বিভিন্ন বিভাগের সিলেবাস পরিবর্তন করা হয়েছে। নতুন নতুন প্রযুক্তি ও তথ্যের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পরিচয় করানো হচ্ছে। এ ছাড়া প্রায় সব বিভাগে বিশ্বমানের ল্যাব তৈরি করা হয়েছে।

পুরকৌশল বিভাগে গবেষণায় যেমন সাফল্য দেখা যাচ্ছে, অন্য বিভাগগুলো সে তুলনায় কিছুটা পিছিয়ে আছে। এ বিষয়ে আপনার কী মনে হয়?

রফিকুল আলম: আমি সুযোগ-সুবিধা দিয়েছি, সেটা সবাইকে কাজে লাগাতে হবে। আমি উৎসাহ দিচ্ছি, গবেষণা বাড়লে বিভাগগুলোর পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানেরও সুনাম হবে। সর্বোপরি বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে।

প্র স্বপ্ন নিয়ে থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন