default-image

১৯৫০-এর কথা। আমি ফজলুল হক হলের পশ্চিম-দক্ষিণ পাশে ব্যারাকে একটি চায়ের দোকানে বসে আছি। আমার পাশের টুলে বসা সেক্রেটারিয়েটের দুজন কর্মচারীর কথোপকথন আমার কানে ভেসে আসে। তাঁরা একজন আরেকজনকে বলছেন, ‘ছাত্রদের আন্দোলন থেমে গেল, বাংলা আর রাষ্ট্রভাষা হচ্ছে না, উর্দুই রাষ্ট্রভাষা হয়ে যাবে। আমরা উর্দু পড়তে-লিখতে পারি না। উর্দু রাষ্ট্রভাষা হলে আমাদের কতই না অসুবিধা হবে। কী আর করি! আমরা চাকরি করে খাই। আমরা কী করে আন্দোলন করি? আন্দোলনে গেলে সরকার আমাদের চাকরি খাবে। আন্দোলনে নামা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। ছাত্ররা ছিল আশা-ভরসা। তারাও ঠান্ডা হয়ে গেল।’ এ কথাগুলো আমার পছন্দ হলো। কথাগুলো একেবারে সত্য, সমকালীন সমাজের জনমতের প্রতিধ্বনি। এই বর্ণনা আমার মনের মধ্যে প্রথিত হয়ে গেল। সরকারি কর্মচারীর এই মূল্যবান বক্তব্য আমার ভবিষ্যৎ চলার পথে আলোকবর্তিকা হিসেবে কাজ করে।

১৯৫১ সালের ১১ মার্চ পালন উপলক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের সামনে আমতলায় এক ছত্রসভা চলছে। সভার এক কোণে বসে ছাত্রনেতাদের বক্তৃতা শুনছি। কোনো বক্তার বক্তৃতাই আমার ভালো লাগছে না। একপর্যায়ে আমি দাঁড়িয়ে সভার সভাপতির উদ্দেশে বললাম, ‘আমি কিছু বলতে চাই।’ সভাপতি আমাকে বলার অনুমতি দিলেন। সেক্রেটারিয়েটের সেই কর্মচারীর রাষ্ট্রভাষা করা যাবে না। আপনারা আজ যা কিছু করছেন আর বলছেন, তা সবই আনুষ্ঠানিকতামাত্র। এতে কোনো কাজ হবে না। যদি বাংলা ভাষার দাবিকে প্রতিষ্ঠিত করতে চান, তবে রাস্তায় আন্দোলনে নামুন। আন্দোলন করতে হলে চাই সংগঠন। আপনারা সংগঠন গড়ে তুলুন। আমার এই বক্তব্য শ্রোতাদের মধ্যে সাড়া জাগাতে সমর্থ হলো। তারা করতালি দিয়ে আমার বক্তৃতাকে স্বাগত জানায়। উপস্থিত শ্রোতাদের চাপে সভার উদ্যোক্তারা তাৎক্ষণিকভাবে ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি’ গঠন করেন। সভামঞ্চ থেকে শ্রোতাদের কাছে কমিটির কর্মকর্তা ও সদস্যদের নাম ঘোষণা করা হলে দেখা গেল, তাতে আমাকে একজন সাধারণ সদস্য হিসেবেও রাখা হয়নি। ফলে সভায় উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। সভার শ্রোতারা আমাকে সংগ্রাম কমিটিতে নেওয়ার জন্য দাবি তোলে। তাদের শান্ত করার জন্য কমিটির সদস্য হিসেবে আমাকে নেওয়া হয়। এতেও সভার শৃঙ্খলা ফিরে এল না। শ্রোতারা আমাকে কমিটির প্রধান কর্মকর্তারূপে পেতে চায়। তাদের দাবি অগ্রাহ্য করার মতো সাহস সেদিন ওই সভার কর্মকর্তাদের ছিল না। শ্রোতাদের চাপে সভার উদ্যোক্তারা আমাকে ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটির’ আহ্বায়ক করেন।

বিজ্ঞাপন

একদিন সংগ্রাম কমিটির নামে আমি নিজে একটি প্রস্তাব গ্রহণ করি। প্রস্তাবটি হলো, বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার দাবিতে ঢাকায় পতাকা দিবস উদ্‌যাপনের কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। প্রস্তাবটি নিয়ে আমি অবজারভার অফিসে যাই। প্রস্তাবটি পত্রিকার যুগ্ম সম্পাদক মাহবুব জামাল জাহেদীর হাতে দিয়ে আমি তাঁকে সেটি ছাপানোর জন্য অনুরোধ জানাই। জাহেদী ভাই প্রস্তাবটি একবার পড়লেন। তারপর আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘মিটিং ঠিক হয়েছে তো?’ আমি উত্তর দিলাম, ‘জি, হ্যাঁ।’ সভা হয়নি, আহূত সভায় কমিটির কোনো সদস্যই যোগ দেননি। প্রস্তাবটি যাতে পত্রিকায় ছাপানো হয়, সে জন্য সভা হয়েছে বলে চাতুরীর আশ্রয় নিয়েছিলাম। জাহেদী ভাই আমার অনুরোধ রক্ষা করেছিলেন। পরের দিন প্রস্তাবটি বক্স করে অবজারভার-এর প্রথম পৃষ্ঠায় ছাপানো হয়। পত্রিকায় সংবাদটি পাঠ করে আমি শাঁখারীবাজারে যাই। সেখানকার একটি দোকান থেকে কয়েকটি টিনের কৌটা কিনি। এরপর একটি প্রেসে যাই। প্রেসের অফিসে বসে এক টুকরা সাদা কাগজে একটি ব্যাজের খসড়া তৈরি করলাম। কাগজে মোটা অক্ষরে লিখলাম, ‘বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করতে হবে’। নিচে লিখলাম, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি’। খসড়া ব্যাজটির ৫০০-৬০০ ছাপিয়ে দেওয়ার জন্য প্রেস ম্যানেজারকে অনুরোধ জানাই। তিনি ঘণ্টাখানেকের মধ্যে সেগুলো ছাপিয়ে দেন। ব্যাজগুলো ছাপার খরচ পড়েছিল ৩০-৩৫ টাকার মতো। টিনের কৌটাগুলোর গায়ে বড় অক্ষরে লিখলাম, ‘বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার জন্য সবাই সাধ্যমতো সাহায্য করুন।’

১০-১৫ জন ছাত্রসহ ব্যাজ ও কৌটাগুলো নিয়ে সেক্রেটারিয়েটের গেটে যাই। আমরা সেক্রেটারিয়েটের কর্মচারীদের ব্যাজ পরিয়ে দিয়ে আর্থিক সাহায্যের জন্য কৌটাগুলো তাঁদের সামনে তুলে ধরি। তাঁরা সবাই কৌটার ভেতরে টাকাপয়সা গুঁজে দিলেন। সেদিন সেক্রেটারিয়েটের কর্মচারীদের কাছ থেকে ৯০০ টাকার ওপরে সাহায্য পাই। সিকি, আধুলি, ১ টাকা, এমনকি ৫ ও ১০ টাকার নোটও কৌটার ভেতরে পড়েছিল। নেতাদের সাহায্য ব্যতীত সাধারণ ছাত্রদের সাহায্য ও সহযোগিতায় ১৯৫০-এ এমনিভাবে আমি প্রথম পতাকা দিবস পালন করি। এই দিবস পালন করার ফলে আমি বহু কর্মী পেয়ে যাই এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংগ্রাম কমিটির ফান্ডও তৈরি হয়ে যায়। এবার আমি সম্পূর্ণ হতাশামুক্ত হয়ে ভাষা আন্দোলনকে সক্রিয় করে তোলার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করি। (সংক্ষেপিত)

বিজ্ঞাপন
প্র স্বপ্ন নিয়ে থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন