default-image

রোজ সকালে কুয়াশার চাদর ভেদ করে, লাল ইটের ভবনের মাথায় উঁকি দেয় সকালের সূর্য। জেগে ওঠে সুদূর সাইবেরিয়া থেকে আসা অতিথি, পরিযায়ী পাখির দল। তাদের কোলাহল হার মানে যেকোনো সংগীত। ছড়িয়ে–ছিটিয়ে কিংবা দল বেঁধে থাকা নিস্তব্ধ গাছেরা নির্বাক দাঁড়িয়ে অস্তিত্বের জানান দেয়। গাছপালার ফাঁকে ফাঁকে শেয়াল, বেজি বা গুইসাপের হাঁটাচলায় বেজে ওঠে শুকনো পাতার মর্মরধ্বনি।

সুবর্ণজয়ন্তী উদ্‌যাপন করা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনো এর সবই আছে। কিন্তু এ নগরের প্রাণ—শিক্ষার্থীরা নেই। নেই বটতলায় রোজ সকালে পরোটা-ডিম ভাজার হিড়িক। নেই মুরাদ চত্বর, মুন্নী চত্বর, পরিবহন চত্বরে চায়ের কাপের টুংটাং আওয়াজ। শহীদ মিনার বা সমাজবিজ্ঞান অনুষদ চত্বরে রোদ পোহানোর ছুতোয় শিক্ষার্থীদের হাসি-গান আর আড্ডাও নেই। তবে শীতের মাঝামাঝি সময়ে অনলাইনে স্নাতক চতুর্থ বর্ষের চূড়ান্ত পরীক্ষা নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য, ইন্টারনেটের ঝামেলা এড়াতে শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসের আশপাশের এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে থাকছেন। তাঁদের হুটহাট পদচারণ মাঝেমধ্যে তারুণ্যের জানান দেয়।

আগের মতোই প্রাণ আছে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃতিতেও। প্রকৃতি বরং আগের চেয়ে একটু বেশি মেলে দিয়েছে। তাকে স্বাগত জানানোর কেউ নেই। শিক্ষার্থীরা জানালেন সেই আফসোসের কথাই।

বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের শামীম মিয়া সদ্য স্নাতক সম্মান পরীক্ষা শেষ করলেন। ক্যাম্পাসের পাশের গেরুয়া এলাকায় থেকে পরীক্ষা দিয়েছেন তিনি। শামীম বললেন, ‘অতিথি পাখিরা আগের মতোই এসেছে। ক্যাম্পাসের জলাশয়গুলো জুড়ে লাল শাপলার ফাঁকে ফাঁকে ঘুরে বেড়িয়ে শোভাও বাড়াচ্ছে। কিন্তু প্রতিদিন এই সৌন্দর্য দেখে মন ভালো করার উপায় নেই। সন্ধ্যার পর চিরচেনা ক্যাম্পাসে হাঁটলে ভয়ে গা ছমছম করে। অথচ শীতের রাত-দুপুরে গলা খুলে গান গাইতাম আমরা।’

বিজ্ঞাপন
default-image

জাহাঙ্গীরনগর সব সময় সরব থেকেছে সংস্কৃতিচর্চায়। আর শীত এলে তো কথাই নেই। সুনির্দিষ্ট কোনো স্থানের প্রয়োজন হয় না। সেলিম আল দীন মুক্তমঞ্চ, জহির রায়হান মিলনায়তন, পুরোনো কলা অনুষদের সামনের মৃত্তিকা মঞ্চ, পরিবহন চত্বর, বটতলায় সুযোগ পেলেই শিক্ষার্থীরা মঞ্চনাটক, পথনাটক, আবৃত্তির আসর, গানের আড্ডা, দল বেঁধে সিনেমা দেখার আসর বসান। ছাত্র–শিক্ষক কেন্দ্রের (টিএসসি) একেকটি ঘরে চলে সংস্কৃতিচর্চার মহড়া। এবার জনশূন্য সেই টিএসসিও।

জাহাঙ্গীরনগর সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি দীপঙ্কর দীপ বলেন, ‘জাহাঙ্গীরনগরের প্রাকৃতিক পরিবেশ, এখানকার আড্ডা শিক্ষার্থীদের মধ্যকার সাংস্কৃতিক প্রতিভাকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে বের করে দেয়। এ জন্য এখানে সারা বছর, বিশেষ করে শীতে নানা ধরনের উৎসব লেগেই থাকে। দর্শক-অভিনয়শিল্পী, সংগীতশিল্পীদের আপন করে একাত্ম করে দিতে পারে এই ৭০০ একরের ক্যাম্পাস। করোনার কারণে এই শীতে সেই জায়গাটি আমরা পাইনি। তারপরও সংস্কৃতিকর্মীরা অনলাইনে সবাইকে এক করে রাখার চেষ্টা করেছেন।’ তিনি জানান, ক্যাম্পাস সচল হওয়ার অপেক্ষায় মুখিয়ে আছেন সংস্কৃতিকর্মীরা। আবার পুরোনো সাংস্কৃতিক ছন্দেই ফিরে আসবে সংস্কৃতির এই রাজধানী।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষক মামুন অর রশীদ এই ক্যাম্পাসেরই শিক্ষার্থী ছিলেন। তিনি বললেন, ‘এমন শৈত্যপ্রবাহের শীত এর আগেও অনেকবার দেখেছি। কিন্তু শিক্ষার্থীবিহীন শীতের ক্যাম্পাস দেখিনি কখনো। শিক্ষার্থীদের জন্যই শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নিয়োজিত। শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসের প্রাণ। শীত তো যাচ্ছে চলে, আশা করছি ফাল্গুন এলে ক্যাম্পাসেও সত্যিকারের ফাল্গুন আসবে।’ বিশ্ববিদ্যালয়ের সুবর্ণজয়ন্তী এল, চলেও গেল। ৫০ বছর পূর্তিতে জাহাঙ্গীরনগর উৎসবে মুখর থাকার কথা। সেই উৎসবও অনলাইনে সীমিত পরিসরে সম্পন্ন করতে হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে। প্রায় সব বিভাগের চতুর্থ বর্ষের চূড়ান্ত পরীক্ষাও শেষ হলো গত বৃহস্পতিবার। বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য (শিক্ষা) নুরুল আলম বলেন, ‘স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে অনলাইনে চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে। শিক্ষার্থীরা যেন কোনো ধরনের ঝুঁকির মধ্যে না পড়ে সে জন্য আবাসিক হলগুলো খোলা হয়নি।’ শিগগিরই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দিয়ে ক্যাম্পাসে প্রাণ ফেরানোর সিদ্ধান্ত নেবে সরকার—এমন প্রত্যাশা নুরুল আলমের।

বিজ্ঞাপন
প্র স্বপ্ন নিয়ে থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন