default-image

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ। ক্যাম্পাসে ফেরা হয় না অনেকদিন হলো। কীভাবে কাটছে শিক্ষার্থীদের সময়? সেটাই ছাত্রছাত্রীরা লিখে জানাচ্ছেন ‘এ সময়ের দিনলিপি বিভাগে’। আপনিও লেখা পাঠাতে পারেন এই ইমেইলে: [email protected]। অথবা যোগাযোগ করুন স্বপ্ন নিয়ের ফেসবুক পেজে

তখন প্রথম বর্ষে পড়ি। ক্যাম্পাসে রসায়ন বিভাগের চতুর্থ বর্ষের এক বড় ভাইয়ের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। বলছিলাম, ‘আপনাদের তো স্নাতক শেষ হয়ে যাচ্ছে, মুক্তি পেলেন। আমাদের সামনে তো এখনো পাহাড়ের মতো বেশ কয়েকটা বছর দাঁড়িয়ে আছে।’ শুনে তিনি বলেছিলেন, ‘এখনই ভালো আছ, ভাই। চতুর্থ বর্ষে উঠলে দেখবে রাতের ঘুম হারাম হয়ে যাবে। কোর্স ফাইনালের চিন্তায়, ভবিষ্যতের চিন্তায়, জীবিকার চিন্তায়।’

সেদিন কথাগুলো তেমন বুঝে উঠতে পারিনি। হেসে পার করে দিয়েছিলাম। আজ এত দাম দিয়ে বুঝতে হবে, কল্পনাও করিনি। চতুর্থ বর্ষের চূড়ান্ত পরীক্ষা চলছে যখন, তখনই হানা দিল সময়ের সবচেয়ে অপ্রিয় শব্দ করোনা। পরীক্ষাগুলো বন্ধ হলো। এরপর দফায় দফায় বাড়ল ছুটি, আর আমাদের হতাশা। ওদিকে ব্যস্তানুপাতিক হারে কমতে থাকে আমাদের মনোবল।

দেখতে দেখতে কতটা সময় পার হয়ে গেল। অনেক বিশ্ববিদ্যালয় অনলাইনে ক্লাস, প্রেজেন্টেশন বা অ্যাসাইনমেন্টসহ নানা মূল্যায়নপ্রক্রিয়ায় শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে কারও কোনো নজর নেই। পুরোদমে স্থগিত ক্লাস, পরীক্ষা।

২০২১ সালের শুরুতে স্থগিত পরীক্ষাগুলোর রুটিন প্রকাশিতে হলো। পরীক্ষা শুরুও হলো। খাতায় লিখছিলাম ‘পরীক্ষা-২০১৯’, তাতেও দুঃখ ছিল না। ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি অবস্থা। এভাবে লিখিতগুলো শেষ হলো। বাকি ছিল শুধু ভাইভা, আর বিজ্ঞান অনুষদের ল্যাব, ব্যবহারিক। হঠাৎ করেই নোটিশ এল—আবারও স্থগিত। কিন্তু এর মধ্যেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধিভুক্ত কলেজগুলোর শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা নেওয়া হলো। আমরা হতবাক হয়ে চেয়ে থাকলাম কর্তৃপক্ষের শুভদৃষ্টির আশায়। সময় গড়াচ্ছে, কিন্তু কোনো সুরাহা নেই।

বিজ্ঞাপন

২০১৯ থেকে শুরু করে ২০২১ সাল পর্যন্ত এই তিন বছরই আছি চতুর্থ বর্ষে, জানি না আর কত দিন থাকতে হবে। এই টানাপোড়েনের মধ্যে ভাঙা মন নিয়ে না হয় একাডেমিক পড়াশোনা, না নিতে পারছি চাকরির প্রস্তুতি। দক্ষতা অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ যেমন কম্পিউটার বা যোগাযোগের দক্ষতা, এগুলোও নেওয়া হচ্ছে না। সব তো চলছে অনলাইনে। প্রান্তিক গ্রামপর্যায়ে এটা যে সম্ভব হয়ে ওঠে না, সেটা বোধ হয় সবাই জানেন। চাকরির জন্য যে একটা সিভি তৈরি করব, সেই মানসিকতাও হারিয়ে ফেলেছি। কী লিখব সিভিতে? সেই বছর সাতেক আগের এইচএসসি পাস, আর দক্ষতার তলাবিহীন ঝুড়ি!

এখন আর এসব নিয়ে অতশত ভাবি না। বাড়িতে সময় কাটে টুকটাক গল্প-সাহিত্য পড়ে আর শখের কাজগুলো করে। গ্রামের পিছিয়ে পড়া অবহেলিত শিশুদের নিয়ে গড়ে তুলেছি আইসিটি স্কুল ‘ওরাও শিখবে’। বিনা মূল্যে শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছি কম্পিউটার ও তথ্যপ্রযুক্তির খুঁটিনাটি। অন্য কোনো পেশা বা জীবিকার মাধ্যম বেছে নেওয়া হয়ে ওঠেনি পরিবেশ–পরিস্থিতি আর অর্থের বিবেচনায়। ঘুরেফিরে–ঘুমিয়েই কাটাচ্ছি। ঘুমন্ত স্বপ্নরা একদিন জেগে উঠবে বলে।

আরাফাত হোসাইন

স্নাতক (সম্মান) চতুর্থ বর্ষ, হিসাববিজ্ঞান বিভাগ, সরকারি এডওয়ার্ড কলেজ, পাবনা

প্র স্বপ্ন নিয়ে থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন