default-image

ইশরাত জাহানের সঙ্গে দেখা হলো ক্যাম্পাসের মুক্তমঞ্চে। মুখে রাজ্যের দুশ্চিন্তা নিয়ে তিনি মডেল আর আলোকচিত্রীকে নির্দেশনা দিচ্ছিলেন। সাধারণের চোখে ‘ফটোসেশন’ মনে হতে পারে। ইশরাতের কাছে এটাই পরীক্ষা। বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজিতে (বিইউএফটি) প্রায় চার বছরের পাঠ শেষে চূড়ান্ত পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি। ফ্যাশন ডিজাইন অ্যান্ড টেকনোলজি বিভাগের শিক্ষার্থী হিসেবে তাঁকে পোশাকের নকশা, ফেব্রিকসের ধরন, বুননের কৌশল—সবকিছুই শিখতে হয়েছে। নিজের নকশা করা পোশাক শিক্ষকদের সামনে উপস্থাপন করার জন্য ক্যাম্পাসের অনুজদের মডেল বানিয়ে ছবি তুলছিলেন এই শিক্ষার্থী।

ইশরাতের সঙ্গে কী আলাপ হলো, সে প্রসঙ্গে পরে আসছি। আগে বিইউএফটির ক্যাম্পাস সম্পর্কে একটু বলে নেওয়া যাক।

বিজ্ঞাপন

বিশেষায়িত পড়ালেখার জন্য তৈরি

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) অনুমোদনক্রমে কাগজে-কলমে বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজির জন্ম হয়েছিল ২০১২ সালে। তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির ইতিহাস আরও পুরোনো। শুরুতে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজি (বিআইএফটি) নামে যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০০০ সালে। ধীরে ধীরে পরিসর বড় হয়েছে। এখন উত্তরা ১৪ নম্বর সেক্টরে তুরাগ নদঘেঁষা নিশাতনগর এলাকায় ছয় একর জায়গা নিয়ে বিইউএফটির বিশাল ক্যাম্পাস।

১০ তলা ভবনের সামনে বিশাল মাঠটাই মন ভালো করে দেওয়ার মতো। সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়ালে তৈরি ম্যুরালটাই বুঝিয়ে দেয়, এটি আর দশটা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মতো নয়। এখানে পড়ালেখার সঙ্গে প্রযুক্তি ও সৃজনশীলতার একটি নিবিড় যোগাযোগ আছে। তৈরি পোশাকশিল্পের জন্য উপযোগী উচ্চশিক্ষিত, দক্ষ ও কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন জনশক্তি তৈরি এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য। তাই ক্লাসরুমের পাশাপাশি মেকানিক্যাল ওয়ার্কশপ, নিটিং ল্যাব, ডায়িং অ্যান্ড প্রিন্টিং ল্যাব, ফটোগ্রাফি স্টুডিও, ফ্যাশন ইলাস্ট্রেশন স্টুডিওর মতো জায়গাগুলোতে অনেকটা সময় কাটে শিক্ষার্থীদের। আছে বিশাল মিলনায়তন, ৫২টি ল্যাবসহ নানা সুবিধা। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. এস এম মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘ভিনদেশের ১৭টি বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আমাদের এমওইউ আছে। শিক্ষকদের বিভিন্ন গবেষণা জার্নালে প্রকাশ পাচ্ছে, শিক্ষার্থীরাও তাঁদের সঙ্গে গবেষণায় যুক্ত হচ্ছে। দেশীয় ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে যেন এক হয়ে গবেষণা করতে পারি, সেই লক্ষ্যে আমরা কাজ করছি।’ ফ্যাশন ডিজাইন, টেক্সটাইল প্রকৌশলের মতো বিষয়গুলো পাশাপাশি ব্যবসায় প্রশাসন (বিবিএ) ও ইংরেজি পড়ার সুযোগও আছে এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে।

সবকিছু ঠিক থাকলে ক্যাম্পাসের নোটিশ বোর্ড হয়তো ছেয়ে থাকত রঙিন সব পোস্টারে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি সেখানে চোখ পড়ল সাদামাটা কাগজ, তাতে লেখা, ‘নো মাস্ক, নো এন্ট্রি প্লিজ’। আর সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মতো বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজিতেও (বিইউএফটি) করোনাভাইরাসের কারণে সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী ক্যাম্পাসে ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ আছে প্রায় এক বছর হলো। তবে অনলাইনে ক্লাস চলছে পুরোদমে। বিভিন্ন প্রজেক্ট, পরীক্ষা, অ্যাসাইনমেন্ট কিংবা দাপ্তরিক কাজে ইশরাতের মতো জনা কয়েক শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছিলেন সেদিন। ঘুরেফিরে তাঁদের সঙ্গে কথা হলো।

অনলাইন ক্লাসে এগিয়ে

একেবারেই ভিন্ন এক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন টেক্সটাইল প্রকৌশলের ছাত্র তৌহিদুজ্জামান। বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের মাত্র এক বছর কেটেছে। বছরজুড়েই ক্যাম্পাসে আসার সুযোগ হয়নি বললেই চলে। অনলাইনে যেসব সহপাঠীর সঙ্গে ক্লাস করছেন, অনেকের সঙ্গে এখনো দেখা হয়নি। কোনো একটা দাপ্তরিক কাজে বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছিলেন, সেই সুবাদে আমাদের সঙ্গে দেখা হলো।

প্রকৌশলের ছাত্র হিসেবে অনলাইনে ক্লাস করতে সমস্যা হচ্ছে না? জানতে চেয়েছিলাম তৌহিদুজ্জামানের কাছে। বললেন, ‘একটু তো হচ্ছেই। কিন্তু শেখার বেলায় কোনো ছাড় নেই। পড়ালেখার অংশ হিসেবে আমাদের অনেক জ্যামিতিক হিসাব–নিকাশ করতে হয়, ড্রয়িং জমা দিতে হয়। এক-দুই মিলিমিটার এদিক-ওদিক হলেও শিক্ষকেরা অ্যাসাইনমেন্ট গ্রহণ করেন না। আবার নতুন করে জমা দিতে হয়।’ তাঁর কথার প্রমাণ পাওয়া গেল বিশ্ববিদ্যালয়ের চিফ ফাইন্যান্সিয়াল অফিসার এম নাজমুল হোসেনের বক্তব্যেও। তিনি জানালেন, বাংলাদেশ রিসার্চ অ্যান্ড এডুকেশন নেটওয়ার্কের এক হিসাব অনুযায়ী, সম্প্রতি ক্লাসের সংখ্যা ও মোট সময় বিবেচনায় দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে শীর্ষস্থান অর্জন করেছে বিইউএফটি।

শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, সরাসরি পোশাকশিল্পের সঙ্গে যুক্ততা এই বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় শক্তি। কর্মক্ষেত্রের চাহিদা অনুযায়ী এখানে পাঠ্যক্রম সাজানো হয়েছে। পাশাপাশি পাস করার পর কর্মজীবন শুরু করার ক্ষেত্রেও শিক্ষার্থীরা সব রকম সহায়তা পায়। বিইউএফটির সহ–উপাচার্য অধ্যাপক ড. আইয়ুব নবী খান বলছিলেন, ‘দেশের গার্মেন্টসগুলোতে বিদেশি বিশেষজ্ঞদের প্রতি নির্ভরতা কমিয়ে আমাদের শিক্ষার্থীদেরই যেন সে রকম দক্ষভাবে গড়ে তোলা যায়, সেই উদ্দেশ্যেই এই বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করা হয়েছিল। এরই মধ্যে আমরা সুফল পেতে শুরু করেছি।’

বিজ্ঞাপন

কর্মমুখী শিক্ষা

ফ্যাশন ডিজাইন বিভাগের প্রধান রায়েদ বারকাত জানালেন, শিক্ষার্থীদের নকশা করা পোশাক নিয়ে প্রতিবছর বড় পরিসরে একটি ফ্যাশন শো আয়োজন করা হয়। কাপড় তৈরি থেকে শুরু করে নকশা করা, ফটোশুটের জন্য অত্যাধুনিক স্টুডিও—সব ব্যবস্থাই আছে ক্যাম্পাসে। পোশাক তৈরির ক্ষেত্রে দেশীয় ঐতিহ্য ও ভিনদেশের চলতি ফ্যাশন—দুটি দিকেই লক্ষ রাখেন তাঁরা। তাই তো শেষ বর্ষের ছাত্রী ইশরাত জাহান তাঁর নকশার থিম হিসেবে বেছে নিয়েছেন ‘টেপা পুতুল’। বললেন, ‘শেষ বর্ষের পড়ালেখা মোটামুটি শেষ। শিগগিরই আমি ইন্টার্নশিপের জন্য আবেদন করা শুরু করব।’

ইশরাত নিশ্চয়ই একটি বিষয় জেনে খুশি হবেন। ক্যাম্পাসে তাঁর অগ্রজ সুমনা ইয়াসমিনের সঙ্গে আমাদের দেখা হয়েছিল। ফ্যাশন ডিজাইন অ্যান্ড টেকনোলজি বিভাগ থেকেই বছর দেড়েক আগে পাস করেছেন তিনি। শেষ বর্ষে এসে সুমনাও শিক্ষানবিশ হিসেবে কাজ করার জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আবেদন করেছিলেন। কিন্তু শিক্ষানবিশ নয়, সরাসরি চাকরির প্রস্তাবই পেয়েছিলেন তিনি।

প্র স্বপ্ন নিয়ে থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন