default-image

নত হননি অনত

‘আমি প্রথমে ক্রিকেট খেলতাম। অনূর্ধ্ব সতেরো জাতীয় দলের বাছাই টুর্নামেন্টে খেলার সুযোগ পেলাম যখন, তখন আমার হাত ভেঙে যায়। আমার চাচা জাতীয় দাবাড়ু ছিলেন। বাসায় বসে তাঁর খেলা দেখতাম। এরপর মাঠে ফিরলেও ইনজুরির কারণে ক্রিকেটটা চালিয়ে যাওয়া আর সম্ভব হয়নি। কিন্তু বাসায় বসে তিন মাস যে দাবা খেলা দেখলাম, সেখান থেকেই অনুপ্রাণিত হই,’ ক্রিকেটার থেকে দাবাড়ু হওয়ার গল্প শোনাচ্ছিলেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত ও প্রাকৃতিক বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী অনত চৌধুরী।

নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় পুরোদমে দাবা খেলা শুরু করেছিলেন অনত। জাতীয় পর্যায়ে সর্বশেষ দুটি চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নিয়েছেন—একটিতে হয়েছেন রানারআপ।

অনতর কাছে জানতে চেয়েছিলাম অনলাইনে দাবার প্রতিযোগিতা কেমন লাগল। ‘অনলাইনে প্রতিপক্ষকে সেভাবে দেখা যায় না। যদিও ক্যামেরা অন করা থাকে, কিন্তু সরাসরি যে উন্মাদনা, তা তো আর সম্ভব না।’ তবে করোনাকালে এই অর্জন অনতকে অনুপ্রেরণা দিয়েছে, সে কথা জানালেন হাসিমুখেই।

আক্ষেপও কিন্তু আছে ‘বেস্ট প্লেয়ার অব দ্য টুর্নামেন্ট’–এর ঝুলিতে। নিয়মিত টুর্নামেন্ট না হওয়া, পর্যাপ্ত গ্র্যান্ডমাস্টার এবং ইন্টারন্যাশনাল মাস্টারদের সান্নিধ্য না পাওয়া ব্যথিত করে তাঁকে। ‘আমাদের দেশে অনেক উন্নতির সুযোগ আছে। বিদেশে খেলার সুযোগ পেলেও প্লেন ভাড়ার জন্য অনেকেই অংশ নিতে পারেন না। আরও অনেক সমস্যা আসলে রয়ে গেছে। এই জায়গাগুলো ঠিকভাবে না হওয়ায় শুধু দাবা নিয়েই কিন্তু কেউ ভাবতে পারছেন না। তাঁকে অন্য কোনো পেশার সঙ্গে থাকতে হচ্ছে।’

বিজ্ঞাপন
default-image

প্রতিভার প্রতিভা

ক্লাস সেভেনে পড়ার সময় দাবা খেলায় হাতেখড়ি বগুড়ার মেয়ে উম্মে তাসলিমা প্রতিভা তালুকদারের। ক্লাস নাইনে উঠে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড স্কুল দাবা প্রতিযোগিতা ২০১০–এর চ্যাম্পিয়ন হলেন। এরপর ৩৩তম জাতীয় জুনিয়র দাবা চ্যাম্পিয়নশিপ ২০১২–এর রানারআপ, বগুড়া জেলার মহিলা-পুরুষ দুই বিভাগেই চ্যাম্পিয়ন, কমন ওয়েলথ দাবা চ্যাম্পিয়নশিপ নিউ দিল্লি ২০১৭-তে দশম স্থান, শমসের আলী দাবা প্রতিযোগিতা ২০১৭ তে চ্যাম্পিয়নসহ অন্তত ডজনখানেক পুরস্কার এসেছে তাঁর ঝোলায়।

মুঠোফোনের ওপাশ থেকে প্রতিভা যখন হাতের কড়ি গুনে বিভিন্ন প্রতিযোগিতা জেতার গল্প বলছিলেন, তখন পাশে বসে সহযোগিতা করছিলেন বাবা মোহসিন আলী তালুকদার। বগুড়ার বিভিন্ন দলের হয়ে জাতীয় পর্যায়ে খেলা মোহসিন নিজের স্বপ্ন বুনেছেন মেয়ে প্রতিভার মধ্যে। মেয়েও বাবাকে নিরাশ করেননি। এ মাসেই ডিআইইউ আন্তবিশ্ববিদ্যালয় অনলাইন দাবা প্রতিযোগিতায় সব দলের নারী প্রতিযোগীদের পেছনে ফেলে প্রথম হয়েছেন বগুড়া সরকারি আজিজুল হক কলেজের ব্যবস্থাপনার শিক্ষার্থী প্রতিভা। তাঁর ব্যক্তিগত পয়েন্ট ছিল ২০।

করোনার থমকে যাওয়া সময়ে প্রতিভা নিজেকে প্রস্তুত করছেন পুরোদমে। আর এ যাত্রায় তাঁর সহযোগী বাবা মোহসিন। মোহসিন বলেন, ‘বাড়িতেই নিজেরা প্র্যাকটিস করি। আমি জাতীয় পর্যায়ে খেলেছি, আবার ওর মা–ও খেলতে পারে—নিজেরাই বাড়িতে খেলি। ঢাকায় কোনো প্রতিষ্ঠানে শেখানোর মতো টাকা তো নাই। নিজেরা যতটুকু পারি, শিখতে থাকি।’

প্রতিভাও বাবার মতো স্বপ্ন দেখছেন। দাবায় গ্র্যান্ডমাস্টার হতে চান তিনি। তবে আক্ষেপ আছে পর্যাপ্ত সহযোগিতা না পাওয়ার। দাবা ফেডারেশন থেকে সহযোগিতা পেলে প্রতিভা বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করতে চান বিশ্ব দরবারে—সে স্বপ্নের কথাও জানিয়ে রাখলেন।

মন্তব্য পড়ুন 0