বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

উম্মে হাবিবার সঙ্গে আলাপের শুরুতেই এল সোহোতে মার্ক্স প্রসঙ্গ। প্রায় দেড় ঘণ্টা একটানা নেচেছেন তিনি। তাঁর পরিবেশনা দেখে দর্শকের হাততালি যেন থামছিলই না। নাটকে অভিনয়ের সবচেয়ে কঠিন অংশ কী ছিল? হেসে হাবিবা বলেন, ‘দেড় ঘণ্টা কথা না বলে থাকা। আমি আবার কথা না বলে বেশিক্ষণ থাকতেই পারি না। নাচ তুলতে কষ্ট হয়নি। আমাদের নির্দেশক নূপুর আপা (নায়লা আজাদ নূপুর) জেনি চরিত্রের জন্য যেমনটা চেয়েছেন, আমি আসলে ও রকমই। আমাকে তাই আলাদা করে কিছু হতে হয়নি। আর সমকালীন ইউরোপীয় নাচ আমার খুব প্রিয়। আমি কোনো কথা না বলে, কেবল নেচে আর শরীর দিয়ে অভিনয় করে জেনির মতো গভীর, বিস্তৃত, শক্তিশালী চরিত্রটা প্রকাশ করতে চেয়েছি।’

কথায় কথায় শোনা হলো নাচের সঙ্গে প্রেমের গল্পটা। উম্মে হাবিবার জন্ম আর বেড়ে ওঠা ঢাকায়। ছোটবেলা থেকেই প্রচণ্ড ছোটাছুটি করতে ভালোবাসেন। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আর খেলাধুলায় নিয়মিত সেরার পুরস্কার ঘরে এনে শোকেসে সাজিয়ে রাখাটা তাঁর জন্য ‘ডাল-ভাত’ হয়ে উঠেছিল। মা–বাবা চেয়েছিলেন, এই মেয়ে হবে ডাক্তার। এদিকে উম্মে হাবিবার ভালো লাগত গণিত আর পদার্থবিজ্ঞান। শেষ পর্যন্ত মাধ্যমিকের রেজাল্ট হলো ৪.৮৮। রাজউক উত্তরা মডেল স্কুল থেকে কলেজে উঠে মানবিক বিভাগ নিয়ে পড়তে গিয়ে তাঁর মনে হলো, বিজ্ঞান থেকে মানবিকের বিষয়গুলো বেশি মজার! কলেজজীবনে মন দিয়ে পড়াশোনা করলেন, ভর্তি হয়ে গেলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। প্রথম বর্ষটা কেটে গেল আলোয় আলোয়। সবকিছুই ভালো লাগে। পড়াশোনা, আড্ডা, প্রেম, ব্রেকআপ, বন্ধুরা মিলে ঘোরাঘুরি, ডেডলাইনের চাপ, পরীক্ষার আগের রাত আর রেজাল্টের দিন সকালের টেনশন, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মহড়া, খেলায় চ্যাম্পিয়ন হওয়া, মঞ্চে দাঁড়িয়ে দর্শকসারি থেকে নিজের নাম শোনা—হাবিবার ভাষায় বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবন তো এমনই হওয়া উচিত!

স্কুলে পড়ার সময় যে কারও নাচ একবার দেখে বাড়ি এসে নিজে নিজেই তুলে ফেলতে পারতেন। ইউটিউবকে নাচের গুরু বানিয়ে দিব্যি দরজা লাগিয়ে নাচতেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েই তাই ঢুকে পড়লেন ক্যাম্পাসের কালচারাল সোসাইটিতে। দ্বিতীয় বর্ষে যখন সোসাইটি থেকে জিজ্ঞেস করা হলো, কারা যাবে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাৎসরিক নাচের অনুষ্ঠানে? সবার আগে হাত তুললেন উম্মে হাবিবা। কুয়েটের মঞ্চে নাচার জন্য জেমসের ‘বাবা’ গানে নিজেই কোরিওগ্রাফি করেছিলেন। কেন? ‘আমি নাচের মাধ্যমে একটা গল্প বলতে চেয়েছি।’

সে সময়ের ‘আনাড়ি’ পরিবেশনার মধ্য দিয়ে এত ভালো সাড়া পেয়েছিলেন যে এরপরই নাচ শেখার পেছনে সময় দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন উম্মে হাবিবা। ঢাকায় ফিরে ফোক ফেস্টে নাচলেন। যে টাকা পেলেন, তা–ই দিয়ে শুরু করলেন নাচ শেখা। তাহনুন আহমেদীর কাছে কনটেম্পোরারি আর অমিত চৌধুরীর কাছে ভরতনাট্যম শিখেছেন। একদিকে পেশাদার নৃত্যশিল্পী হিসেবে নেচেছেন আর সেই সম্মানী কাজে লাগিয়েছেন নাচ শেখার পেছনে। মাছের তেলে মাছ ভাজার মতো নাচের টাকায় নাচ শেখা!

উম্মে হাবিবা বলেন, ‘ঢাকার মধ্যবিত্ত মা–বাবারা যেমন হয়, আমারও ঠিক তা–ই। পড়াশোনা ছাড়া আর কিছুই বোঝেন না। তাঁরা চান আমি যেন বিসিএস দিই। অন্য মা–বাবাদের মতো তাঁদেরও চাওয়া, আমি যেন সেফ জোনে থেকে জীবন কাটাই। আমার আবার সেফ জোনে থাকতে মোটেই ভালো লাগে না। আমার ভালো লাগে ছুটে বেড়াতে। আমি বেশিক্ষণ কোথাও স্থির থাকতে পারি না। আমি প্রতিনিয়ত অনিশ্চয়তায় ঝাঁপিয়ে পড়তে চাই। জীবনটা উপভোগ করতে চাই।’

২০২০ সালে মুজিববর্ষের আয়োজনে উম্মে হাবিবা নেচেছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ কোরিওগ্রাফার আকরাম খানের নির্দেশনায়। সেই নাচের মহড়ার অংশবিশেষ আবার দেখানো হয়েছে নেটফ্লিক্সের প্রামাণ্যচিত্র ‘মুভ’ এ। তাই ইতিমধ্যে নিজেকে নেটফ্লিক্সে দেখে ফেলেছেন তিনি। আকরাম খানের ইউটিউব চ্যানেলের একটা কনটেন্টের জন্য নাচ নিয়ে বাংলায় কথাও বলেছেন। এই মুহূর্তে তিনি পড়াশোনার পাশাপাশি নাচ শিখছেন, একটি স্কুলের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের নাচ শেখাচ্ছেন আর পেশাদার নৃত্যশিল্পী হিসেবেও কাজ করছেন। থিয়েটারের সঙ্গে যুক্ত আছেন। অভিনয় করেছেন একাধিক স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রেও। এরই মধ্যে কলকাতার ড্যান্স ব্রিজ ফেস্টিভ্যালে বৃত্তি নিয়ে নাচের ওপর এক মাসের কর্মশালা করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের সোসাইটিগুলো তো আছেই, প্রথম আলো বন্ধুসভার ঢাকা মহানগরের নারীবিষয়ক সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করছেন। জীবন থেকে কী চাওয়া? এ প্রশ্নের উত্তরে বললেন, ‘আপাতত আমি ইউরোপের কোনো নামকরা ড্যান্স স্কুল থেকে নাচটা ভালোভাবে শিখতে চাই। তবে আমার জীবনের লক্ষ্য একটাই। আমি শান্তিতে মরতে চাই। আমার যেন কোনো আফসোস না থাকে।’

প্র স্বপ্ন নিয়ে থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন