default-image

কোভিড-১৯ বিষয়ে জাতিসংঘের মহাসচিবের সর্বশেষ প্রতিবেদনে একটা শরীর ঠান্ডা করে দেওয়া বক্তব্য আছে। তিনি বলছেন, মহামারির কারণে ‘জেন্ডার সমতায় যা কিছু অর্জন ছিল, তা প্রায় কয়েক দশক পেছনে ফিরে গেছে’। সংখ্যাগুলো আমাদের সামনে একটা ভীতিকর চিত্র তুলে ধরে—২০৩০ সালের মধ্যে সারা বিশ্বে নারীর যৌনাঙ্গ কর্তন ২০ লাখ বাড়ার আশঙ্কা আছে, বাল্যবিবাহের শিকার মেয়ের সংখ্যা বাড়বে ১ কোটি ৩০ লাখ, লকডাউনের প্রতি ৩ মাসে ১ কোটি ৫০ লাখ নারী ও মেয়ে লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার শিকার হতে পারে, সেই সঙ্গে আরও ৪ কোটি ৭০ লাখ নারী চরম দারিদ্র্যের মুখে পড়বেন।

কয়েক দশকে নারী অধিকারের ক্ষেত্রে যে উন্নতি হয়েছে, মহামারির কারণে তা আবার আগের অবস্থায় ফিরে যাবে, এটা ভাবতেই পারছি না। প্রায় অর্ধশতাব্দী হলো, জাতিসংঘ নারীর জন্য সমঅধিকার নিশ্চিত করার ঘোষণা দিয়েছে, তা–ও কেবল মৌলিক অধিকার। নারীর সুরক্ষা ও স্বাধীনতা এখনো অনেক দেশে অনুপস্থিত। অন্যান্য দেশ এত ভঙ্গুর কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে, মহামারিই যেন এত দিনের অর্জন মুছে দিয়েছে।

বিজ্ঞাপন
আমাদের পৃথিবীতে গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে একটা আস্ত হাসপাতাল আছে কেবল নৃশংসভাবে ধর্ষণের শিকার হওয়াদের জন্য, যাদের মধ্যে শিশু ও কিশোরীরাও আছে, আর আমরা এটা খুব স্বাভাবিক বলে ধরে নিয়েছি।

সব সমস্যার দায় কিন্তু করোনাভাইরাসের নয়। ভাইরাসের কারণে সমাজে অসমতা বেড়েছে, কিন্তু এই অসমতা ভাইরাসের তৈরি নয়। অন্যায় ও অনিয়ম, জাতিগত ও সামাজিক অসমতার জন্য দায়ী মানুষ, কোনো অসুখ নয়। নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকার জন্য করোনাভাইরাস স্রেফ নতুন এক ছুতা।

এমনকি মহামারির আগেও পারিবারিক সহিংসতা ভয়ানকভাবে বেড়ে গিয়েছিল। কেবল যুক্তরাষ্ট্রেই প্রতিদিন গড়ে তিনজনের বেশি নারীর মৃত্যু হয়েছে তাঁদের স্বামী অথবা প্রেমিকের হাতে। সারা বিশ্বে প্রতি তিনজনে একজন নারী তাঁর জীবদ্দশায় কখনো না কখনো মার খান, ধর্ষণ কিংবা নির্যাতনের শিকার হন এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সেটি হয় পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে। ২০১৭ সালে সন্ত্রাসবাদের শিকার হয়ে যত মানুষ মারা গেছে, তার চেয়ে তিন গুণ বেশি নারীকে ইচ্ছাকৃতভাবে খুন করা হয়েছে এবং তাঁদের মধ্যে অর্ধেকের বেশির খুনি তাঁর পরিবারেরই সদস্য।

আমরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ের যুগে বাস করছি। অথচ এখনো নারীর শিক্ষার মৌলিক অধিকার, ভোটাধিকার, শরীরের ওপর নিয়ন্ত্রণ, আইন অনুযায়ী সমান সুরক্ষা, সমান হারে মজুরি এবং সমাজে পরিপূর্ণ প্রতিনিধিত্ব করা নিয়ে বিতর্ক আছে। আমাদের পৃথিবীতে গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে একটা আস্ত হাসপাতাল আছে কেবল নৃশংসভাবে ধর্ষণের শিকার হওয়াদের জন্য, যাদের মধ্যে শিশু ও কিশোরীরাও আছে, আর আমরা এটা খুব স্বাভাবিক বলে ধরে নিয়েছি।

বিজ্ঞাপন

আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তার ১ শতাংশের কম বরাদ্দ আছে যৌন ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা রোধ প্রকল্পের জন্য, এতেই পরিষ্কারভাবে বোঝা যায়, এ ধরনের অপরাধ সরকারগুলোর কাছে খুব একটা গুরুত্ব পায় না। এর আগে ইবোলা মহামারিতেও আমরা দেখেছি, যত নারী এই রোগের কারণে মারা গেছেন, তাঁর চেয়ে বেশি নারী মৃত্যুবরণ করেছেন সহিংসতার শিকার হয়ে যথাযথ সেবা না পেয়ে। এরপরও ঝুঁকিতে থাকা নারীদের প্রয়োজন মেটানোর জন্য আন্তর্জাতিক প্রকল্পগুলো যথাযথ তহবিল পায়নি, রাজনৈতিক মারপ্যাঁচের শিকার হয়েছে।

এত কিছুর পরও আমরা নারী অধিকারের উন্নতি নিয়ে নিজেদের বাহবা দিই, যে উন্নয়নের গতি খুব ধীর এবং যা খুব সহজেই নিম্নগামী হয়। তরুণ প্রজন্ম, বিশেষ করে যারা যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন নির্বাচনে প্রথমবারের মতো ভোট দিতে যাচ্ছে, তাদের অন্তত এত সহনশীল হওয়া বা আপস করা ঠিক হবে না।

বিজ্ঞাপন

সারা বিশ্বে নারী অধিকারের ওপর যে ধাক্কা লেগেছে, তা থেকে রাগ আর উদ্বেগের এক প্রবল ঢেউ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছি। এই ঢেউ সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগ করবে, তারা যেন এই অন্যায় ও ভয়াবহতা বন্ধের নিশ্চয়তা দেয়। ক্রমাগত দমন করা হলে কিংবা নারী অধিকারের জায়গায় আমরা পিছিয়ে গেলে পৃথিবী হবে আরও অনিরাপদ, বিভক্ত। শরণার্থীর সংখ্যা ও দ্বন্দ্ব বাড়বে আরও। এটি আমাদের অধিকারের ওপর যতটা হুমকি, ঠিক ততটাই মূল্যবোধের লাঞ্ছনা। এই লড়াইয়ে নারীদের কণ্ঠস্বরই মূল হলে চলবে না। পুরুষকে রুখে দাঁড়াতে হবে। (সংক্ষেপিত)

ইংরেজি থেকে অনুদিত

মন্তব্য পড়ুন 0