default-image

‘কারিগরি শিক্ষা নিলে দেশ-বিদেশে কর্ম মিলে।’

দেশের সরকারি-বেসরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটগুলোর ক্যাম্পাসের নানা জায়গায় এ রকম কিছু স্লোগান সাঁটানো আছে। মূলত কর্মমুখী শিক্ষার প্রতি আগ্রহী হয়েই এসএসসি পাসের পর হাজার হাজার শিক্ষার্থী প্রতিবছর পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে ভর্তি হয়। সরকারি ৪৯টি ও বেসরকারি ৫০৬টি ইনস্টিটিউটে বর্তমানে আসন রয়েছে ১ লাখ ৭০ হাজার। চার বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা কোর্সে বিভাগ আছে ৩৪টি। কম্পিউটার, তড়িৎ (ইলেকট্রিক্যাল), যন্ত্রকৌশল (মেকানিক্যাল), পুরকৌশল (সিভিল) থেকে শুরু করে খাদ্য, পর্যটন, চিকিৎসাপ্রযুক্তি—এমন কোনো প্রায়োগিক বিষয় নেই, যা পলিটেকনিকে পড়ানো হয় না।

ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে সরকারের নানা পরিকল্পনা ও উদ্যোগের পরও ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের মুখে বেকারত্বের কথা শোনা যায়। এ প্রসঙ্গে ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশের (আইডিইবি) চাকরিবিষয়ক সম্পাদক আবদুল কুদ্দুস বলেন, ‘শুধু যে এই খাতে বেকারত্ব, তা তো নয়। বেকারত্ব আমাদের জাতীয় সমস্যা। ডিপ্লোমাধারীদের জন্য যথাযথ চাকরির বাজার এখনো তৈরি হয়নি। তবে এটা ঠিক, পলিটেকনিক থেকে পাস করার পর চাকরি না পেলেও আত্মকর্মসংস্থানের অনেক সুযোগ থাকে। আত্মকর্মসংস্থানের জন্য আইডিইবি থেকে আর্থিক সুবিধাসহ প্রয়োজনীয় সহায়তাও দেওয়া হয়।’

বিজ্ঞাপন

তাঁদের কথা

ইমরুল শাহেদ ২০১১ সালে বাংলাদেশ সুইডেন পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট (কাপ্তাই) থেকে পাস করে বেরিয়েছেন। তাঁর বিভাগ ছিল পুরকৌশল (উড)। তিনি এখন ম্যাক ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেডের উপমহাব্যবস্থাপক। কাজের বাইরে ভ্রমণ, ফটোগ্রাফি আর বই পড়ার নেশায় বুঁদ হয়ে থাকেন। তাঁর জীবনযাত্রা দেখলে বোঝা যায়, নিজের পড়াশোনা আর কাজকে রীতিমতো উপভোগ করছেন।

একই ইনস্টিটিউট থেকে পাস করেছেন নূর আলম। চাকরির পেছনে না দৌড়ে নিজেই হয়ে গেছেন উদ্যোক্তা। কনস্ট্রাকশন বিভাগ থেকে পড়াশোনা শেষ করে তিনি একে একে গড়ে তুলেছেন তিনটি প্রতিষ্ঠান। কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় আড়াই শ কর্মীর।

বিপরীত চিত্রও আছে। অনন্ত মাহমুদ (ছদ্মনাম) গরিব পরিবারের সন্তান। ডিপ্লোমা পাসের পর স্নাতক করতে পারেননি। চাকরিও পাননি। শেষে এমন একটা কাজ বেছে নিতে বাধ্য হয়েছেন, যা কোনোভাবেই তাঁর পঠিত বিষয়োপযোগী নয়। এ নিয়ে অনন্তের আক্ষেপের অন্ত নেই। এই আক্ষেপের বিপরীতে আশার বাণী ব্যক্ত করেছেন শিক্ষা-গবেষক ও চট্টগ্রাম টিচার্স ট্রেনিং কলেজের সহকারী অধ্যাপক শামসুদ্দিন শিশির। তিনি বলেন, ‘ডিপ্লোমায় এমন সব বিষয় অন্তর্ভুক্ত আছে, যা পড়লে বেকার থাকাটাই কঠিন। যেমন ধরুন, কেউ একজন খাবারের ব্যবসা করতে চায় বা জুতার দোকান দিতে চায়, সেটার জন্যও কিন্তু ডিপ্লোমা কোর্সে আলাদা বিভাগ আছে। অর্থাৎ দেশের প্রায় সব কর্মসংশ্লিষ্ট বিষয়ই ডিপ্লোমা কোর্সে পড়ানো হয়। সুতরাং উদ্যোগ থাকলে পলিটেকনিক থেকে পাস করে বেকার থাকার কথা নয়।’

উচ্চশিক্ষার সুযোগ

কর্মমুখী শিক্ষা হলেও পলিটেকনিক থেকে পাস করে কেউ যদি উচ্চশিক্ষায় আগ্রহী হন, তাঁর জন্যও সুযোগ রাখা হয়েছে। ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (ডুয়েট) শুধু পলিটেকনিক থেকে পাস করা শিক্ষার্থীদেরই ভর্তি করানো হয়। অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়েও ভর্তি হওয়ার সুযোগ আছে। উচ্চশিক্ষায় গিয়ে তাঁরা ভালোও করছেন। বিভিন্ন ক্ষেত্রে মেধার স্বাক্ষর রাখছেন। কথা হলো ডুয়েটের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিকস প্রকৌশল বিভাগের ষষ্ঠ পর্বের ছাত্র সিদরাত মুনতাহার সঙ্গে। পড়াশোনার পাশাপাশি কাজ করছেন রোবট নিয়ে। ডুয়েট রোবোটিকস ক্লাবের গভর্নিং কমিটির এই সদস্য সম্প্রতি জিপিএইচ ইস্পাত এসো রোবট বানাই প্রতিযোগিতায় ডুয়েট রাউন্ডে বিজয়ী হয়েছেন। কাজ করেছেন ভারতের আইআইটি টেকফেস্টের দূত হিসেবে।

করোনাকালের চিত্র

করোনা সংক্রমণের কারণে ১৭ মার্চ থেকে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ আছে। দীর্ঘ ছুটির ভিন্ন রকম প্রভাব পড়েছে পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটগুলোর শিক্ষার্থীদের ওপর। অনলাইন ও সংসদ টেলিভিশনে কিছু ক্লাস পরিচালিত হলেও ঘরে বসে পড়াশোনা খুব একটা এগিয়ে নিতে পারছেন না শিক্ষার্থীরা। কারণ, পলিটেকনিকের বেশির ভাগ ক্লাসই ব্যবহারিক।

কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দীর্ঘ সময় ঘরে বসে থাকার কারণে পরিবার থেকে বলা হচ্ছে চাকরি খোঁজার জন্য। সহজে চাকরি পাওয়ার আশায় পলিটেকনিকে ভর্তি করানোর পর পরিবারগুলো এই অনিশ্চয়তা ঠিক মেনে নিতে পারছে না। কয়েকজন শিক্ষার্থী তাঁদের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।

তবে বেশির ভাগ শিক্ষার্থীই এই নতুন স্বাভাবিককে মেনে নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন। মো. আশিকুর রহমান পড়ছেন মেকানিক্যাল বিভাগে। আবৃত্তি ও উপস্থাপনা তাঁর নেশা। করোনার সময়ে পাশাপাশি সাংবাদিকতাও করছেন। ‘এখন সৃজনশীল কাজে ব্যস্ত থাকাই মঙ্গল, নইলে হতাশা ভর করবে’—বললেন বাংলাদেশ বেতারের তালিকাভুক্ত এই উপস্থাপক।

কুমিল্লা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষ মোহাম্মদ রিহান উদ্দিন বলেন, ‘ডিপ্লোমা-ইন-ইঞ্জিনিয়ারিং পরীক্ষা যেহেতু একটা কোর্সের সর্বশেষ পরীক্ষা, তাই এ ক্ষেত্রে অটো পাসের সুযোগ নেই। তবে আশা করা যায়, শিগগিরই পরীক্ষার বিষয়ে আমরা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানতে পারব।’ ছাত্রছাত্রীদের অধৈর্য না হয়ে পারিবারিক ও সামাজিক কাজে সময় ব্যয় করার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, ‘নতুন স্বাভাবিককে মেনে নিলেই আমাদের শিক্ষার্থীরা সুদিনের নাগাল পাবে। হতাশাকে কোনোভাবেই প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না।’ এ ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্য ও শিক্ষকদের আন্তরিক সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।

লেখক: শিক্ষক, চট্টগ্রাম পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন